সাদাস্রাব এর কারনে সালাত ভেঙে ওযু করতে হবে কিনা

Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 6233
Questioner: Fatema Hossain Muna
Question Asked: 02 Oct 2026, 11:31 AM
Reviewed & Published: 02 Oct 2026, 02:56 PM
Views: 6
Tokens: 7,672
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার অনেক বছর ধরেই সাদা স্রাবের সমস্যা। যখন আমি শুয়ে বসে থাকি, তখন সাদা স্রাব আসে না। কিন্তু যখন আমি ঘরের কাজ করি, বাহিরে বের হই, হাটাহাটি করি কিংবা সালাত আদায় করি, তখনই শুধুমাত্র সাদা স্রাব বের হয়। আমি এই সমস্যার জন্য, নামাজ ঠিকভাবে আদায় করতে পারি না। সালাত আদায়ের আগে আমি সবসময় নিজেকে পরিষ্কার করে নেই। কিন্তু এরপরেও সালাত আদায়ের সময় সাদাস্রাবের জন্য ওযু চলে যায়। যার কারনে সালাত শেষ করে কোনো এক্সট্রা নফল ইবাদত করতে পারিনা। এসব কারণে আমি খুবই বিরক্ত। আমি কি মাজুর বলে গণ্য হব?
দ্বিতীয়তঃ যেই দিনগুলোতে আমি রোজা রাখি, সেই দিন সারাদিন সাদাস্রাব যায় না। কিন্তু ইফতার করার পর যখন পানি খাই, তখন সাদা স্রাব আসে। আমি এর জন্য চেষ্টা করি ইফতার করার পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার যাতে সাদা স্রাব বের হয়ে গেলে পরিষ্কার করে ওযু করে সালাত আদায় করতে পারি। কিন্তু এভাবেও তেমন লাভ হয় না কারণ দেখা যায়, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেও সাদাস্রাব আসে না। এরপর যখন অজু করে সালাতে দাঁড়াই তখনই সাদা স্রাব আসে এবং আমি নামাজ শেষ করে যখন চেক করি তখন দেখি সাদা স্রাব এসেছে। এতে কি সেই সালাত আবার কাজা করতে হবে? আমি তো যথাসাধ্য সময় দেই কিন্তু শুধুমাত্র যখন আমি কোনো ফিজিক্যাল মুভমেন্ট করি তখনই সাদা স্রাব আসে যেমন সালাত। আমি অনেক ডক্টর দেখিয়েছি, কিন্ত কাজ হয় না।
এখন কি আমাকে বার বার ওযু করতে হবে নাকি আল্লাহ আমার জন্য বিষয় টা সহজ করবেন? আমি কি মাযুর বলে গন্য হবো?

Answer

সাদা স্রাবের কারণে ওযু ও সালাত: ফিকহি বিধান

উত্তর:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته


১. আপনি 'শরয়ী মাযূর' (معذور) হিসেবে গণ্য হবেন কি না?

  • মাযূর হওয়ার শরয়ী মূলনীতি:
    ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি তখনই 'শরয়ী মাযূর' গণ্য হন, যখন নামাযের একটি পুরো ওয়াক্তজুড়ে (যেমন: যোহরের ওয়াক্ত শুরু হওয়া থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত) এমন অবিরত ওযর (স্রাব/রক্ত/প্রস্রাব) চালু থাকে যে, ওযূ করে শুধুমাত্র ফরয নামাযটুকু আদায় করার মতো সময়ও ওযর বা নাপাকী থেকে মুক্ত থাকা যায় না [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫; নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৮৮; দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৮৫]।

  • আপনার অবস্থার ফিকহী প্রয়োগ:

    • প্রথম সুরত (যদি মাযূর হন): কোনো নামাযের ওয়াক্তের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটা সময় যদি এমন হয় যে—বসা, দাঁড়ানো বা নড়াচড়া সব অবস্থাতেই ধারাবাহিকভাবে সাদা স্রাব আসতে থাকে এবং ওযূ করে শুধু ফরয নামাযটুকু নিঃসংকোচে পড়ে নেওয়ার মতো সামান্য সময়ও স্রাব মুক্ত পাওয়া যায় না, তবে আপনি ফিকহের দৃষ্টিতে 'শরয়ী মাযূর' হিসেবে সাব্যস্ত হবেন [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭৯]।
    • দ্বিতীয় সুরত (যদি মাযূর না হন): কিন্তু আপনার বিবরণ অনুযায়ী—শুয়ে বা বসে স্থির থাকলে স্রাব আসে না, কেবল হাঁটাচলা বা শারীরিক নড়াচড়ার সময় আসে। তাই যদি ওয়াক্তের ভেতরে এমন কোনো উপায় বা সময় বের করা সম্ভব হয় (যেমন: ওযূ করে সাথে সাথে বসে বা স্থির হয়ে নামায পড়া), যাতে স্রাব নির্গত হওয়া ছাড়াই শুধু ফরয নামাযটুকু পড়ে নেওয়া যায়, তবে কারিগরি সংজ্ঞানুযায়ী আপনি 'শরয়ী মাযূর' হবেন না [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫; দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৮৫, ৩৮৬]।

২. আপনার জন্য সালাত ও ওযূর সহজ শরয়ী সমাধান:

ক) যদি আপনি 'শরয়ী মাযূর' সাব্যস্ত হন (মাযূরের সহজ নিয়ম):

১. ওযূর নিয়ম: প্রতিটি নামাযের ওয়াক্ত শুরু হলে আপনি একবার ওযূ করে নেবেন [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৮৮; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫]।
২. ইবাদতের সুযোগ: এই এক ওযূ দিয়েই ওই ওয়াক্তের ভেতর ফরয, সুন্নাত, নফল নামায এবং কুরআন তিলাওয়াতসহ যত ইচ্ছা ইবাদত করতে পারবেন। নফল ও অতিরিক্ত ইবাদত ছেড়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
৩. স্রাব বের হওয়ার হুকুম: ওয়াক্ত চলাকালীন আপনার সালাত আদায়ের সময় বা হাঁটাচলায় যতবারই সাদা স্রাব বের হোক না কেন, আপনার ওযূ ভাঙবে না এবং সালাতও নষ্ট হবে না [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫]।
৪. সালাত পুনরায় ক্বাযা করতে হবে কি না: সালাত শেষে স্রাব দেখতে পেলেও উক্ত সালাত সম্পূর্ণ সহীহ হয়ে যাবে; ক্বাযা বা দোহরানোর কোনো প্রয়োজন নেই [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫]।
৫. ওযূ কখন ভাঙবে: উক্ত নামাযের ওয়াক্ত শেষ হয়ে পরবর্তী নামাযের ওয়াক্ত প্রবেশ করলে আপনার এই ওযূ ভেঙে যাবে। তখন পরবর্তী ওয়াক্তের জন্য নতুন করে একবার ওযূ করে নিতে হবে।

খ) যদি আপনি 'শরয়ী মাযূর' না হন (সাধারণ অবস্থায় বিরক্তি ও কষ্ট দূর করার উপায়):

যদি ওয়াক্তের কোনো এক অংশে স্রাব বন্ধ রাখা সম্ভব হয়, তবে বারবার ওযূ করার কষ্ট থেকে বাঁচতে আপনি নিচের শরয়ী ছাড়গুলো গ্রহণ করতে পারেন: ১. তুলা বা প্যাড ব্যবহার করা: ওযূ করার পর যোনিদ্বারের প্রবেশমুখে তুলা বা প্যান্টিন্যাপকিন/প্যাড সুন্দরভাবে আটকে সালাতে দাঁড়াবেন। ইসলামি ফিকহের নিয়ম হলো—পবিত্র তুলা আটকে রাখার পর যতক্ষণ না স্রাব তুলা ভিজিয়ে বাইরের অংশে ছড়িয়ে পড়ে, ততক্ষণ ওযূ ভঙ্গ হয় না [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৭২; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৫৫, ১৩৫]।
২. বসে বা ইশারায় নামায পড়া: নড়াচড়া বা রুকূ-সেজদা করলে যদি স্রাব বের হয়ে যায়, কিন্তু বসে বা ইশারায় নামায পড়লে স্রাব বের হয় না বা বন্ধ থাকে, তবে সালাতের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে আপনার জন্য বসে বা ইশারায় সালাত আদায় করা সম্পূর্ণ বৈধ ও জায়েয [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫; নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৮৮]।


ইফতারের পরের সালাতের ফায়সালা:

রমযান বা নফল রোজার দিনে ইফতারির পর যখন আপনি সালাতে দাঁড়ান, তখন উপরে উল্লিখিত নিয়ম মেনে চলবেন:

  • আপনি মাযূর হলে অথবা সালাতের পূর্বে তুলা/প্যাড ব্যবহার করলে—সালাত শেষে কাপড়ে বা টিস্যুতে স্রাব দেখা গেলেও আপনার সালাত সম্পূর্ণ সহীহ হয়ে যাবে, তা ক্বাযা করতে হবে না [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫]।
  • অনাবশ্যক মানসিক চাপ ও বিরক্তি এড়াতে ইফতারের পর তুলা দিয়ে আটকে ওযূ করে নামায পড়ে নেবেন। এতে সালাত শেষ করে আবার চেক করার বা সালাত দোহরানোর কোনো পেরেশানি থাকবে না।

সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:

১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ৫৫: (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত, ৫ম পরিচ্ছেদ — যোনিদ্বার দিয়ে নির্গত রতূবত ও ওযূ ভঙ্গের মাসআলা) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৫৫]।
  • পৃষ্ঠা: ১৩৫: (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত, ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ: মাযূরের বয়ান — মাযূর হওয়ার শর্তাবলী, ওয়াক্তিয়া ওযূর নিয়ম এবং ওযর থাকা সত্ত্বেও সালাত সহীহ হওয়ার বর্ণনা) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫]।

২. নূরুল ঈযাহ:

  • পৃষ্ঠা: ৮৮: (পরিচ্ছেদ: মাযূরের আহকাম — মাযূর ব্যক্তির ওযূ, ইবাদত ও সালাত আদায়ের নিয়ম) [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৮৮]।

৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ৭২: (অধ্যায়: বাবুল ওযূ — তুলা বা পোটলা ব্যবহারের মাধ্যমে রতূবত আটকে রাখা ও ওযূ না ভাঙ্গার ফতোয়া) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৭২]।
  • পৃষ্ঠা: ১৭৯: (অধ্যায়: বাবুল ওযূ — মাযূর ব্যক্তির সালাত ও ওযূর বিধান) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭৯]।

৪. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ৩৮৫–৩৮৬: (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত — মাযূরের ফিকহী সংজ্ঞা, শর্তাবলী ও আধুনিক চিকিৎসা ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ) [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৮৫, ৩৮৬]।

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.