হাসব্যান্ড কি স্ত্রীর হয়ে কুরবানি আদায় করতে পারবে যদি তাঁর নিজের নিসাব পরিমান সম্পদ উপস্থিত না থাকে, নাকি আগে নিজেরটা আদায় করে তারপর স্ত্রীর ওয়াজিব কুরবানি আদায় করতে হবে?
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
আসসালামুয়ালাইকুম,
কুরবানির দেওয়ার ক্ষেত্রে দেখলাম, যাদের নিসাব পরিমান সম্পদ আছে তাদের জন্যেই কুরবানি ওয়াজিব। অর্থ উপার্জন করলেই কুরবানি দিতে হবে এরকম কোনো নিয়ম কোথাও খুজে পাইনি।
এখন আমার যে পরিমান আলাদা আলাদা সম্পদ আছে, সেগুলো একত্র করলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমপরিমান হচ্ছে, সেই অনুযায়ী আমার উপর কুরবানী ওয়াজিব হয়েছে। কিন্তু কুরবানী আদায় করার মতো অর্থ আমার নিজের কাছে নেই, এবং বর্তমানে আমি আয় রোজগারও করছি না। এক্ষেত্রে, আমার হাসব্যান্ড আমার কুরবানী আদায় করে দিতে চাচ্ছে, কিন্তু তাঁর ইনকাম লিমিটেড এবং তাঁর এমন কোন অর্থ সম্পদ জমানো নেই যে তাঁর উপর কুরবানি ওয়াজিব। কিন্তু আশেপাশের অনেকেই এই কথা তুলছে, সে যেহেতু তাঁর স্ত্রী এর কুরবানি আদায় করে দিবে, সেক্ষেত্রে তাঁর নিজের কুরবানি তো সবার আগে আদায় করতে হবে, তাঁর স্ত্রী এর হিসাব তো পরের কথা।
আমার প্রশ্ন এক্ষেত্রে কি তাহলে স্বামির নিজের কুরবানি আগে আদায় করতে হবে যদিও তাঁর উপর ওয়াজিব হয়নি নেসাব এর হিসাব অনুযায়ী? নাকি তাঁর উপর ওয়াজিব না হয়েও শুধু তাঁর স্ত্রীর কুরবানি আদায় করে দিতে পারবে, যেহেতু স্ত্রীর উপর কুরবানি ওয়াজিব এবং স্ত্রি নিজে সেটা আদায় না করতে পারলে কারও না কারও আদায় করতে হবে?
Answer
উত্তর: হাসব্যান্ড কি স্ত্রীর হয়ে কুরবানি আদায় করতে পারবে?
ভূমিকা
প্রশ্নকারী মহিলা জানিয়েছেন যে, তাঁর কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ আছে (সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমমূল্য), তাই তাঁর উপর কুরবানি ওয়াজিব হয়েছে। কিন্তু তাঁর নিকট নগদ অর্থ নেই এবং তিনি বর্তমানে আয়-রোজগার করছেন না। অন্যদিকে, তাঁর স্বামীর কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই, তাই তাঁর উপর কুরবানি ওয়াজিব নয়। স্বামী তাঁর স্ত্রীর ওয়াজিব কুরবানি নিজের অর্থ দিয়ে আদায় করে দিতে চান। কিন্তু আশেপাশের লোকেরা বলছে, স্বামীকে আগে নিজের কুরবানি আদায় করতে হবে, তারপর স্ত্রীর কুরবানি দিতে পারবেন।
প্রশ্ন: স্বামী কি নিজের উপর কুরবানি ওয়াজিব না হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রীর পক্ষ থেকে কুরবানি আদায় করতে পারবেন? নাকি তাঁর নিজের কুরবানি আগে আদায় করতে হবে?
উত্তর
প্রথমত: ইসলামী শরিয়তে কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত হলো নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। নেসাব হলো সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা সাড়ে সাত তোলা সোনা অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য। যে ব্যক্তির কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই, তার উপর কুরবানি ওয়াজিব নয়। (সূরাহ আল-কাওসার: ২, সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৬৫; ফাতাওয়া আলমগীরি, ৫/২৯৮; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩১২)
দ্বিতীয়ত: স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জন্য কুরবানি ওয়াজিব হওয়া স্বাধীন। স্ত্রীর নেসাব থাকলে তার উপর কুরবানি ওয়াজিব, স্বামীর নেসাব না থাকলে তার উপর ওয়াজিব নয়। একে অপরের উপর কুরবানি ওয়াজিব হওয়া নির্ভর করে নিজ নিজ সম্পদ ও নেসাবের উপর। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৫২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৭০)
তৃতীয়ত: যেহেতু স্বামীর উপর কুরবানি ওয়াজিব নয়, তাই তাঁর নিজের কুরবানি আদায় করা আবশ্যক নয়। তিনি চাইলে নফল কুরবানি করতে পারেন, কিন্তু তা তাঁর জন্য ওয়াজিব নয়। তাই এই ক্ষেত্রে ‘স্বামীকে আগে নিজের কুরবানি আদায় করতে হবে’—এমন কথা সঠিক নয়। বরং তিনি যদি চান, তবে নিজের নগদ অর্থ দিয়ে স্ত্রীর পক্ষ থেকে কুরবানি আদায় করতে পারেন। তবে এর জন্য স্ত্রীর অনুমতি বা অন্তত তার পক্ষ থেকে নিয়ত করা জরুরি, কারণ এটি স্ত্রীর ওয়াজিব কুরবানি পূরণের জন্য করা হচ্ছে। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৫৪; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৫)
চতুর্থত: স্বামী যদি নিজের অর্থ দিয়ে স্ত্রীর পক্ষ থেকে কুরবানি করেন, তাহলে তা জায়েজ হবে এবং স্ত্রীর ওয়াজিব কুরবানি আদায় হয়ে যাবে। এতে স্বামী সওয়াব পাবেন। তবে যদি স্বামীর নেসাব থাকত, তাহলে তাঁর নিজের কুরবানি আগে ওয়াজিব হতো, এবং স্ত্রীর কুরবানি দেওয়ার আগে নিজের কুরবানি আদায় করা জরুরি হতো। কিন্তু যেহেতু তাঁর নেসাব নেই, তাই এই শর্ত প্রযোজ্য নয়। (আল-হিদায়া, ৪/৩১২; শারহু মাআনি আল-আসার, ৪/২৫০)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
- স্বামীর নিজের উপর কুরবানি ওয়াজিব না থাকায় তাকে আগে নিজের কুরবানি আদায় করতে হবে না।
- তিনি সরাসরি স্ত্রীর পক্ষ থেকে (স্ত্রীর অনুমতি ও নিয়তে) কুরবানি আদায় করতে পারেন।
- স্ত্রীর কুরবানি ওয়াজিব হওয়ায় তা আদায় করা জরুরি, এবং স্বামী তা সম্পাদন করে দিলে স্ত্রীর দায়িত্ব পালিত হবে।
সুতরাং, প্রশ্নে উল্লিখিত পরিস্থিতিতে স্বামী তাঁর স্ত্রীর পক্ষ থেকে কুরবানি আদায় করতে পারবেন।
রেফারেন্স
- কুরআন: سورة الكوثر (১০৮:২) - فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
- হাদিস: সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৬৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৬৬
- ফাতাওয়া আলমগীরি: ৫/২৯৮-২৯৯
- রদ্দুল মুহতার: ৬/৩১২, ৬/৩২৫
- ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩৫২-৩৫৪
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/২৭০-২৭১
- আল-হিদায়া: ৪/৩১২
- শারহু মাআনি আল-আসার: ৪/২৫০