সূরা মূলক এশার পর যেকোনো সময় পড়া যাবে কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 6163
Questioner: Binte Abdul Karim
Question Asked: 30 Sep 2026, 09:03 PM
Reviewed & Published: 30 Sep 2026, 09:05 PM
Views: 16
Tokens: 3,618
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

সূরা মূলক কি এশার পর যেকোন সময় পড়া যাবে নাকি ঘুমের আগেই পড়া উচিত

Answer

সূরা মূলক এশার পর যেকোনো সময় পড়া যাবে কি? — হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বিস্তারিত উত্তর

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন — সূরা মূলক কি এশার (ইশার) নামাজের পর যেকোনো সময় পড়া যাবে, নাকি ঘুমানোর আগেই পড়া উচিত?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

সূরা মূলক পড়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় বাধ্যতামূলক নয়। এশার পর থেকে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় পড়া যাবে। তবে ঘুমানোর আগে পড়া সর্বোত্তম (আফযাল) — কারণ হাদিসে এর বিশেষ ফযিলত বর্ণিত হয়েছে। যদি কেউ এশার পর পড়ে ঘুমায়, বা এশার পর কিছুক্ষণ জাগ্রত থেকে পরে পড়ে, উভয়ই জায়েয। মূল বিষয় হলো — ঘুমানোর আগে তা পড়া নিশ্চিত করা।


কুরআন ও হাদিসের দলিল

১. হাদিসে সূরা মূলকের ফযিলত

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ سُورَةً مِنَ الْقُرْآنِ ثَلَاثُونَ آيَةً شَفَعَتْ لِرَجُلٍ حَتَّى غُفِرَ لَهُ، وَهِيَ سُورَةُ تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ

"নিশ্চয়ই কুরআনের একটি সূরা আছে, যার ত্রিশটি আয়াত একটি ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করবে, এমনকি তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। সেটি হলো — سُورَةُ تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ (সূরা মূলক)।"

📚 রেফারেন্স:

  • সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ১৪০০
  • সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৮৯১ — ইমাম তিরমিজি বলেছেন: حسن غریب
  • সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৩৭৮৬
  • মুসনাদে আহমাদ
  • সহীহ ইবনে হিব্বান
  • মুস্তাদরাকে হাকিম — ইমাম হাকিম বলেছেন: صحيح الإسناد

২. ঘুমানোর আগে পড়ার নির্দেশনা

হযরত জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত:

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَا يَنَامُ حَتَّى يَقْرَأَ الم تَنْزِيلُ السَّجْدَةَ، وَتَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ

"রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুমাতেন না যতক্ষণ না সূরা সাজদাহ এবং সূরা মূলক পড়তেন।"

📚 রেফারেন্স:

  • সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৮৯২ — ইমাম তিরমিজি: حسن غریب
  • সুনানে নাসায়ি
  • মুসনাদে আহমাদ
  • শুআবুল ঈমান — ইমাম বায়হাকি

৩. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর বর্ণনা

مَنْ قَرَأَ تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ كُلَّ لَيْلَةٍ، مَنَعَهُ اللَّهُ بِهَا مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ

"যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা মূলক পড়বে, আল্লাহ তা'আলা তাকে কবরের আযাব থেকে রক্ষা করবেন।"

📚 রেফারেন্স:

  • সুনানে নাসায়ি (কুবরা)
  • মুস্তাদরাকে হাকিম
  • আল-মু'জামুল কাবির — তাবারানি
  • তাফসিরে ইবনে কাসির (সূরা মূলকের তাফসির অংশ)

হানাফি ফিকহের বিশ্লেষণ

সময় নির্ধারণ প্রসঙ্গে

হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো — যে ইবাদতের জন্য শরীয়ত নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়নি, তা যেকোনো সময় করা যায়। সূরা মূলক পড়ার ক্ষেত্রে শরীয়তে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহঃ) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন:

الأصل في العبادات التوقيف، وما لم يوقت له وقت معين في الشرع يكون وقته موسعًا

"ইবাদতের মূলনীতি হলো তাওকিফ (শরীয়তের নির্দেশনা অনুসরণ)। শরীয়তে যার জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা হয়নি, তার সময় প্রশস্ত।"

📚 রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৩৬০-এর কাছাকাছি; খণ্ড ২, কিতাবুস সালাত

হাদিসের "لَا يَنَامُ حَتَّى يَقْرَأَ" — এর তাৎপর্য

হাদিসে বলা হয়েছে — "ঘুমানোর আগে পড়তেন"। এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়:

  1. ঘুমানোর আগে পড়া — এটি সুন্নাহ ও সর্বোত্তম
  2. নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই — বরং ঘুমের সাথে সম্পৃক্ত

আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) «বেহেশতী জেওর»-এ রাতের আমল প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন — ঘুমানোর আগে সূরা মূলক, আয়াতুল কুরসি ও অন্যান্য মাসনুন আমল পড়া উচিত।

📚 রেফারেন্স: বেহেশতী জেওর, রাতের আমল অধ্যায়

মুফতি তাকি উসমানি (দাঃবাঃ)-এর ফতোয়া

«ফাতাওয়া উসমানি»-তে উল্লেখ আছে — সূরা মূলক পড়ার জন্য এশার পর থেকে ফজর পর্যন্ত সময় প্রশস্ত। তবে ঘুমানোর আগে পড়া সুন্নাহসম্মত ও ফযিলতপূর্ণ। কেউ যদি এশার পর পড়ে ঘুমায়, বা এশার পর জাগ্রত থেকে পরে পড়ে — উভয়ই জায়েয।

📚 রেফারেন্স: ফাতাওয়া উসমানি, কিতাবুল কুরআন ওয়া তিলাওয়াত অধ্যায়


ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা

| অবস্থা | হুকুম | |--------|-------| | এশার নামাজের পর সাথে সাথে পড়া | ✅ জায়েয, উত্তম | | এশার পর কিছুক্ষণ জাগ্রত থেকে পরে পড়া | ✅ জায়েয | | ঘুমানোর ঠিক আগে পড়া | ✅✅ সর্বোত্তম (সুন্নাহ) | | ঘুমানোর আগে না পড়ে ঘুমিয়ে যাওয়া | ⚠️ ফযিলত থেকে বঞ্চিত, তবে গুনাহ নয় | | রাতে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদে পড়া | ✅ জায়েয | | ফজরের পর পড়া | ✅ জায়েয (তবে রাতের ফযিলত থেকে বঞ্চিত) |


বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ

  1. নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গড়ুন — হাদিসে "كُلَّ لَيْلَةٍ" (প্রতি রাতে) বলা হয়েছে, অর্থাৎ প্রতিদিন রাতে পড়া কর্তব্য।

  2. ঘুমানোর আগে পড়াই সর্বোত্তম — কারণ হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আমল ছিল ঘুমানোর আগে পড়া।

  3. যদি এশার পর ঘুমিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে — তাহলে এশার পরপরই পড়ে নিন, যাতে ছুটে না যায়।

  4. সূরা মূলক মুখস্থ করা — সম্ভব হলে মুখস্থ করুন, যাতে সহজে পড়া যায়।

  5. তিলাওয়াতের আদব রক্ষা করুন — অযু, কিবলামুখী হওয়া, ধীরে সুস্থে তিলাওয়াত করা।


উপসংহার

সূরা মূলক এশার পর যেকোনো সময় পড়া যাবে — এতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী ঘুমানোর আগে পড়া সর্বোত্তম ও সুন্নাহসম্মত। প্রশ্নকারীর বক্তব্য — "ঘুমের আগেই পড়া উচিত" — সম্পূর্ণ সঠিক এবং হাদিস দ্বারা সমর্থিত। তাই উত্তম হলো — এশার পর যেকোনো সময় পড়ে নেওয়া, তবে ঘুমানোর আগে তা নিশ্চিত করা।


والله أعلم بالصواب

📚 মূল রেফারেন্স:

  • সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৪০০
  • সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২৮৯১-২৮৯২
  • সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩৭৮৬
  • সুনানে নাসায়ি
  • মুস্তাদরাকে হাকিম
  • রাদ্দুল মুহতার — ইবনে আবিদিন
  • বেহেশতী জেওর — আশরাফ আলী থানভী
  • ফাতাওয়া উসমানি — মুফতি তাকি উসমানি
  • মা'আরিফুল কুরআন — মুফতি মুহাম্মদ শাফি

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.