ছোট ভাইকে ফোনে ফ্রি ফায়ার গেম খেলতে দেওয়া কি গুনাহ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি ফোন না দিলেও সে তার বন্ধুদের ফোন দিয়ে গেমস খেলে।কিন্তু আমি ফোন না দিলে সে আমার সাথে আরও তেরামি করে,আমার কোন কথাই শুনতে চায় না।
এখন আমি মনে মনে এই নিয়তে যদি তাকে ফোন দেই যে,''ফোন দিলে তাকে মাঝে মাঝে দ্বীনের কথা বুঝাইলে শুনবে আমার কথা।" তাহলে কি ফোন দিলে আমার গুনাহ হবে?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: আপনার ১৫ বছর বয়সী ছোট ভাই আপনার ফোনে ফ্রি ফায়ার গেম খেলে। না দিলে সে রাগ করে, খারাপ ব্যবহার করে, সম্পর্ক নষ্ট হয়। দিলে মাঝে মাঝে আপনার কথা শোনে, নামাজ পড়ে। আপনি মনে মনে নিয়ত করছেন যে, ফোন দিলে তাকে দ্বীনের কথা বোঝাতে পারবেন। এমতাবস্থায় ফোন দিলে কি আপনার গুনাহ হবে?
১. ফ্রি ফায়ার জাতীয় গেমের শরয়ী হুকুম
আধুনিক ফিকহবিদগণের মধ্যে ফ্রি ফায়ার, পাবজি, প্লেস্টেশন ইত্যাদি যুদ্ধ-ভিত্তিক ভিডিও গেম নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। মূলত এগুলোতে সাধারণত নিম্নোক্ত কারণগুলো পাওয়া যায়:
- প্রাণীর ছবি/মূর্তি ও অ্যানিমেশন: শরীয়তে জীবন্ত প্রাণীর ছবি তৈরি ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধ। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২২২৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১১০)
- সময়ের অপচয়: যা ইবাদত ও দ্বীনি শিক্ষা থেকে গাফেল করে।
- নেশা/আসক্তি: যা বাস্তব দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে।
- হিংস্রতা ও অশ্লীলতার সংমিশ্রণ: অনেক গেমে থাকে।
- অনেক ক্ষেত্রে জুয়া বা ইন-অ্যাপ পারচেজের সংশ্লিষ্টতা।
ফিকহের মূলনীতি হলো: "যে কাজে দ্বীন ও দুনিয়ার কোনো উপকার নেই, বরং ক্ষতিই predominant, তা নিষিদ্ধ বা অন্ততপক্ষে মাকরূহ তাহরীমী।" (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবন নুজাইম, পৃ. ৭৮)
ফতোয়া ওসমানীতে (২/৬৪১-৬৪২) এবং ইমদাদুল ফতোয়ায় (৪/৩৯০) উল্লেখ আছে যে, এমন গেম যা সময় নষ্ট করে, নামাজ-ইবাদত থেকে গাফেল করে এবং যুদ্ধ-হিংস্রতার প্রতি আসক্তি তৈরি করে—তা খেলা জায়েজ নয়।
২. গুনাহের কাজে সহযোগিতা প্রসঙ্গে
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"তোমরা নেকী ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো, আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"যে ব্যক্তি কোনো গুনাহের কাজে সাহায্য করে, সে তাতে অংশীদার।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২২৩০৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৩৩৩—মর্মানুযায়ী)
সুতরাং যদি ফ্রি ফায়ার খেলা শরীয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ হয়, তবে কাউকে তা খেলতে দেওয়া বা তার জন্য ফোন সরবরাহ করা—সেটি গুনাহের কাজে সহযোগিতা হওয়ার আশঙ্কা রাখে।
৩. "দ্বীনের কথা শোনানোর নিয়ত" কি বৈধতা দেবে?
না। ইসলামে নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম, তবে নিয়ত কখনো হারাম কাজকে হালাল করে না। যেমন কেউ মনে করে "আমি চুরি করে গরিবকে দান করব"—এটি কখনো জায়েজ নয়। তেমনি "ফোন দিলে সে আমার কথা শুনবে, দ্বীনের কথা বোঝাতে পারব"—এই নিয়ত ফ্রি ফায়ার খেলার হারাম দিকটি দূর করে না।
ইমাম ইবন আবিদীন শামী (রহ.) রাদ্দুল মুহতারে (৬/৩৯১) উল্লেখ করেন:
"নিয়ত ফাসিদ (দূষিত) হলে আমলও ফাসিদ হয়ে যায়।"
তবে হ্যাঁ, যদি ফোনে গেম ছাড়া অন্য কোনো হালাল কাজ (যেমন: দ্বীনি ভিডিও, কুরআন শিক্ষা, প্রয়োজনীয় যোগাযোগ) হয়, তাহলে নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাওয়া যাবে।
৪. আপনার করণীয় (ব্যবহারিক পরামর্শ)
আপনার ভাইয়ের বয়স ১৫—সে বালেগ হওয়ার কাছাকাছি। তার উপর নামাজ ফরজ। তার দ্বীনি শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের দায়িত্ব পরিবারের সবার উপর বর্তায়। নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নিতে পারেন:
- কঠোরভাবে গেম নিষিদ্ধ করুন: ফোনে গেম ইনস্টল না রাখুন, পাসওয়ার্ড দিন। তাকে স্পষ্টভাবে বলুন এটি হারাম।
- বিকল্প বিনোদন দিন: খেলাধুলা, সাইক্লিং, দ্বীনি বই।
- সময় ভাগ করে দিন: ফোন ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় দিন—শুধু পড়াশোনা, যোগাযোগ ও দ্বীনি কনটেন্টের জন্য।
- ভালোবাসা ও সংলাপ বাড়ান: রাগ না করে ধৈর্য ধরে বুঝান। রাসূল ﷺ বলেছেন: "নম্রতা যেখানে থাকে, সেখানে সৌন্দর্য বাড়ে।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৯৪)
- নামাজের অভ্যাস গড়ুন: জামাতে নামাজ পড়ার পরিবেশ তৈরি করুন, নিজে আদর্শ হোন।
- দুআ করুন: আল্লাহর কাছে তার হেদায়েতের জন্য দুআ করুন। রাসূল ﷺ বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের উপকার করতে পারে, সে যেন তা করে।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১৯৯)
- প্রয়োজনে অভিভাবকের সহায়তা নিন: বাবা-মায়ের সাথে আলোচনা করে পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নিন।
৫. সরাসরি আপনার প্রশ্নের জবাব
- যদি আপনি ফোন দেন শুধু এই নিয়তে যে "সে আমার কথা শুনবে, দ্বীনের কথা বোঝাতে পারব"—কিন্তু ফোনে সে ফ্রি ফায়ার খেলবে, —তাহলে আপনার গুনাহ হবে, কারণ আপনি হারাম কাজে সহযোগিতা করছেন।
সারকথা: ফোন দেওয়া বা না দেওয়া নিজে গুনাহ নয়; কিন্তু ফ্রি ফায়ার খেলতে দেওয়া—সহযোগিতা করা গুনাহের কাজ। "দ্বীনের কথা শোনানোর নিয়ত" এটি বৈধতা দেয় না।
বরং আপনার উচিত হবে তাকে ধীরে ধীরে গেম থেকে বিরত রাখা, বিকল্প হালাল বিনোদন দেওয়া, এবং ভালোবাসা ও ধৈর্যের সাথে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া। আল্লাহ আপনার ভাইকে হেদায়েত দান করুন। আমীন।
মূল রেফারেন্স
- আল-কুরআন: সূরা মায়িদা, আয়াত ২
- সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২২২৫, ৫২৭২
- সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১১০, ২৫৯৪
- সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৩৩৩
- মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২২৩০৮
- রাদ্দুল মুহতার (ইবন আবিদীন শামী), খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯১
- ফতোয়া ওসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ৬৪১-৬৪২
- ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ৩৯০
- আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবন নুজাইম, পৃ. ৭৮
- বাহিশতী জেওর, খণ্ড ১ (বিনোদন ও সময়ের ব্যবহার প্রসঙ্গ)