ফজরের সালাতে সূরা ফাতিহা পুনরায় পড়া ও সাহু সিজদা এবং দাঁতের ক্ষত থেকে রক্ত নির্গত অবস্থায় সালাত আদায়ের বিধান।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২// আমার দাঁত ফেলা হয়েছে। ক্ষত স্থান থেকে রক্ত বের হতেই থাকে।এক্ষেত্রে কিভাবে সালাত আদায় করব?
Answer
ফজরের সালাতে সূরা ফাতিহা পুনরায় পড়া ও সাহু সিজদা এবং দাঁতের ক্ষত থেকে রক্ত নির্গত অবস্থায় সালাত আদায়ের বিধান
প্রশ্ন ১: ফজরের সালাতে সূরা ফাতিহার তিন আয়াত পড়ার পর হালকা ঘুমের ঝাঁকি আসলে, পুনরায় প্রথম থেকে সূরা ফাতিহা পড়ে শেষে সাহু সিজদা দেওয়া — নামাজ হয়েছে কি? নাকি আবার পড়তে হবে?
উত্তর:
সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার নামাজ হয়ে গেছে, আবার পড়তে হবে না। তবে আপনার সাহু সিজদা দেওয়ার পদ্ধতিটি সঠিক হয়নি; বরং এমতাবস্থায় সাহু সিজদা দেওয়াই উচিত ছিল না, বরং যেখানে ঘুমের ঝাঁকি এসেছে সেখান থেকে সূরা ফাতিহা পুনরায় শুরু না করে যেখানে ছিলেন সেখান থেকেই পড়া উচিত ছিল। তবে যেহেতু আপনি পুনরায় পড়েছেন এবং শেষে সাহু সিজদা দিয়েছেন, এতে নামাজ বাতিল হয়নি; নামাজ হয়ে গেছে।
বিস্তারিত:
১. ঘুমের ঝাঁকি (নিদ্রালু অবস্থা) কি নামাজ ভঙ্গ করে?
হানাফি মাযহাবে নামাজে ঘুমানো বা ঝিমানো সম্পর্কে বিধান হলো:
- যদি এমন ঘুম আসে যে, দাঁড়ানো অবস্থায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা হয় বা বসা অবস্থায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা হয়, তাহলে নামাজ ভঙ্গ হয়ে যায়।
- আর যদি হালকা ঝাঁকি আসে যা কেবল মুহূর্তের জন্য হয় এবং ইচ্ছাকৃত নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো না হয়, তাহলে নামাজ ভঙ্গ হয় না।
দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنتُمْ سُكَارَىٰ حَتَّىٰ تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা যা বলছ তা বুঝতে পারো।"
(সূরা আন-নিসা: ৪৩)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا نَعَسَ أَحَدُكُمْ فِي الصَّلَاةِ فَلْيَرْقُدْ حَتَّى يَذْهَبَ عَنْهُ النَّوْمُ
"তোমাদের কেউ যদি নামাজে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তবে সে যেন ঘুমিয়ে যায়, যতক্ষণ না ঘুম চলে যায়।"
(সহিহ বুখারি: ২১২, সহিহ মুসলিম: ৭৮৬)
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, নামাজে ঘুম এলে যদি কথা বলা বা বাহ্যিক কাজের মতো অবস্থা হয়, তবে ওযু ভঙ্গ হয় এবং নামাজও ভঙ্গ হয়। কিন্তু হালকা ঝাঁকি যা মুহূর্তের জন্য এবং ইচ্ছা-নিয়ন্ত্রণ বাকি থাকে, তা নামাজ ভঙ্গ করে না।
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৯৪; আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ৫০)
২. সূরা ফাতিহা পড়ার মাঝখানে ঘুমের ঝাঁকি এলে করণীয় কী?
যদি হালকা ঝাঁকি আসে এবং আপনি সূরা ফাতিহার তিন আয়াত পড়ার পর সচেতন হয়ে যান, তাহলে পুনরায় শুরু থেকে পড়ার প্রয়োজন নেই; বরং যেখানে ছিলেন সেখান থেকে (অর্থাৎ চতুর্থ আয়াত থেকে) পড়া চালিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কারণ সূরা ফাতিহা একটি অবিচ্ছিন্ন সূরা হিসেবে পড়া ওয়াজিব, তবে মাঝখানে সামান্য বিরতি বা ঝাঁকি আসলে পুনরায় শুরু করা আবশ্যক নয়।
তবে আপনি যেহেতু পুনরায় প্রথম থেকে পড়েছেন, এতে সূরা ফাতিহা দুইবার পড়া হয়েছে। এটা নামাজ ভঙ্গের কারণ নয়; বরং এটি একটি অতিরিক্ত কাজ (যায়েদ) হিসেবে গণ্য হবে।
৩. সাহু সিজদা দেওয়ার বিধান:
সাহু সিজদা দেওয়ার কারণ হলো নামাজে ভুলবশত কোনো ওয়াজিব ছুটে যাওয়া বা বিলম্বিত করা। এখানে আপনার ক্ষেত্রে:
- সূরা ফাতিহা পুনরায় পড়া কোনো ওয়াজিব ছুটে যাওয়া নয়; বরং এটি অতিরিক্ত কাজ।
- অতিরিক্ত কাজ (যায়েদ) করার কারণে সাহু সিজদা ওয়াজিব হয় না। বরং সাহু সিজদা ওয়াজিব হয় ওয়াজিব ছুটে গেলে বা বিলম্বিত হলে।
হানাফি ফিকহের নিয়ম:
সাহু সিজদা ওয়াজিব হয় নিম্নলিখিত কারণে:
- কোনো ওয়াজিব ছুটে গেলে।
- কোনো ওয়াজিব বিলম্বিত হলে।
- কোনো ওয়াজিব আগে-পরে হলে।
আর অতিরিক্ত কাজ (যেমন: অতিরিক্ত সূরা পড়া, অতিরিক্ত রুকু-সিজদা করা) করলে সাহু সিজদা ওয়াজিব হয় না; বরং তা মাকরুহ হতে পারে যদি ইচ্ছাকৃত হয়।
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৬০০-৬০৫; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ১২৬)
৪. আপনার নামাজের হুকুম:
যেহেতু:
- হালকা ঘুমের ঝাঁকি নামাজ ভঙ্গ করে না।
- সূরা ফাতিহা পুনরায় পড়া নামাজ ভঙ্গ করে না।
- সাহু সিজদা দেওয়া (যদিও এখানে ওয়াজিব ছিল না) নামাজ ভঙ্গ করে না; বরং এটি একটি অতিরিক্ত সিজদা হিসেবে গণ্য হবে।
সুতরাং আপনার নামাজ হয়ে গেছে। আবার পড়তে হবে না।
তবে ভবিষ্যতে এমতাবস্থায়:
- ঘুমের ঝাঁকি এলে পুনরায় শুরু থেকে না পড়ে যেখানে ছিলেন সেখান থেকে পড়বেন।
- অতিরিক্ত কাজের কারণে সাহু সিজদা দেবেন না।
- যদি সন্দেহ হয় যে ঘুম এত গভীর ছিল যে ইচ্ছা-নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেছে, তাহলে নামাজ পুনরায় পড়া উত্তম।
ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন:
"যদি নামাজে এমন ঘুম আসে যে, সে নিজের কথা বুঝতে পারে না, তবে তার নামাজ ও ওযু উভয়ই ভঙ্গ হয়ে যায়। আর যদি হালকা ঝিমুনি হয় যা কেবল মুহূর্তের জন্য, তবে কিছুই ভঙ্গ হয় না।"
(কিতাবুল আসল, খণ্ড ১, পৃ. ৩৫)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"নামাজে হালকা তন্দ্রা বা ঝাঁকি আসলে যদি ইচ্ছা-নিয়ন্ত্রণ বাকি থাকে, নামাজ ভঙ্গ হয় না। তবে পুনরায় সূরা ফাতিহা শুরু করা প্রয়োজন নেই; যেখানে ছিলেন সেখান থেকে পড়াই যথেষ্ট।"
(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৯)
প্রশ্ন ২: দাঁত ফেলা হয়েছে। ক্ষত স্থান থেকে রক্ত বের হতে থাকে। এমতাবস্থায় কীভাবে সালাত আদায় করব?
উত্তর:
সংক্ষিপ্ত উত্তর: দাঁতের ক্ষত থেকে রক্ত বের হলে যদি রক্ত থুতুর সাথে মিশে মুখ থেকে বের হয় এবং থুতুর চেয়ে রক্ত বেশি বা সমান হয়, তাহলে হানাফি মাযহাবে ওযু ভঙ্গ হয়ে যায়। আর যদি রক্ত থুতুর চেয়ে কম হয়, তাহলে ওযু ভঙ্গ হয় না। এমতাবস্থায় আপনি:
- প্রতিবার ওযু করে নামাজ পড়বেন যদি রক্ত থুতুর সমান বা বেশি হয়।
- যদি রক্ত বের হওয়া অব্যাহত থাকে এবং প্রতিবার ওযু করে নামাজ পড়া কষ্টকর হয়, তাহলে মাযহাব অনুযায়ী সমাধান হলো: ওযু করে নামাজ শুরু করবেন, নামাজের ভেতরে রক্ত বের হলেও যদি তা থুতুর সমান বা বেশি না হয়, নামাজ ভঙ্গ হবে না। তবে যদি নামাজের ভেতরে বের হয় এবং থুতুর সমান বা বেশি হয়, নামাজ ভঙ্গ হয়ে যাবে।
- বিশেষ পরিস্থিতিতে (মা'যুর) — যদি রক্ত বের হওয়া এমনভাবে অব্যাহত থাকে যে পুরো নামাজের সময়ে একবারও বন্ধ হয় না, তাহলে আপনি মা'যুর (অপারগ) হিসেবে গণ্য হবেন এবং এক ওযু দিয়ে এক নামাজের সময় পর্যন্ত সব নামাজ পড়তে পারবেন।
বিস্তারিত:
১. মুখ থেকে রক্ত বের হলে ওযু ভঙ্গের বিধান:
হানাফি মাযহাবে মুখ থেকে রক্ত বের হলে ওযু ভঙ্গ হয় যদি:
- রক্ত থুতুর সাথে মিশে মুখ থেকে বের হয়।
- এবং রক্তের পরিমাণ থুতুর সমান বা বেশি হয়।
যদি রক্ত থুতুর চেয়ে কম হয়, ওযু ভঙ্গ হয় না।
দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الْوُضُوءُ مِمَّا خَرَجَ مِنَ الْقُبُلِ وَالدُّبُرِ وَالدَّمِ
"ওযু (ভঙ্গ হয়) সেই বস্তু থেকে যা সামনের ও পিছনের রাস্তা থেকে বের হয় এবং রক্ত থেকে।"
(মুসনাদে আহমাদ: ২২৩১৪; তবে হানাফি মাযহাবে এই হাদিসের ব্যাখ্যা হলো: প্রবাহিত রক্ত)
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, মুখ থেকে রক্ত বের হলে যদি তা থুতুর সাথে মিশে এবং থুতুর সমান বা বেশি হয়, তাহলে ওযু ভঙ্গ হয়। আর যদি কম হয়, ওযু ভঙ্গ হয় না।
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৫; আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ২১)
২. দাঁতের ক্ষত থেকে রক্ত বের হওয়ার বিশেষ বিধান:
দাঁত ফেলার পর ক্ষত স্থান থেকে রক্ত বের হওয়া সাধারণত কয়েকদিন স্থায়ী হয়। এমতাবস্থায়:
- যদি রক্ত থুতুর সাথে মিশে এবং থুতুর সমান বা বেশি হয়: ওযু ভঙ্গ হবে। প্রতিবার নামাজের আগে ওযু করতে হবে।
- যদি রক্ত থুতুর চেয়ে কম হয়: ওযু ভঙ্গ হবে না। আগের ওযু দিয়েই নামাজ পড়া যাবে।
- যদি রক্ত বের হওয়া অব্যাহত থাকে এবং বন্ধ না হয়: তাহলে মা'যুর হওয়ার বিধান প্রযোজ্য হবে।
৩. মা'যুর (অপারগ) হওয়ার শর্ত ও বিধান:
হানাফি মাযহাবে মা'যুর হওয়ার শর্ত:
- এমন অসুস্থতা বা সমস্যা থাকা যা স্থায়ীভাবে বা প্রায় স্থায়ীভাবে থাকে।
- এক নামাজের সময় থেকে পরবর্তী নামাজের সময় পর্যন্ত অন্তত একবারও সেই সমস্যা (রক্ত বের হওয়া) বন্ধ না হয়।
- সমস্যা এমন হয় যে, ওযু করে নামাজ পড়ার পর আবার ওযু ভঙ্গ হয়ে যায়।
মা'যুরের বিধান:
- মা'যুর ব্যক্তি এক ওযু দিয়ে এক নামাজের সময় পর্যন্ত যত ইচ্ছা নামাজ পড়তে পারবেন, ফরজ-সুন্নত-নফল সব।
- পরবর্তী নামাজের সময় শুরু হলে আবার নতুন ওযু করতে হবে।
- নামাজের ভেতরে রক্ত বের হলেও নামাজ ভঙ্গ হবে না (যদি মা'যুর হন)।
দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
"তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যতটা তোমাদের সামর্থ্য আছে।"
(সূরা আত-তাগাবুন: ১৬)
হাদিস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ
"যখন আমি তোমাদের কোনো কাজের আদেশ দিই, তখন তোমরা তা যথাসাধ্য পালন কর।"
(সহিহ বুখারি: ৭২৮৮, সহিহ মুসলিম: ১৩৩৭)
হানাফি ফিকহ:
ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন: "মা'যুর ব্যক্তি এক ওযু দিয়ে এক নামাজের সময় পর্যন্ত সব নামাজ পড়তে পারবে, যদিও তার থেকে রক্ত বের হতে থাকে।"
(কিতাবুল আসল, খণ্ড ১, পৃ. ৪২)
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"মা'যুরের হুকুম হলো: সে এক ওযু দিয়ে এক নামাজের ওয়াক্ত পর্যন্ত ফরজ, সুন্নত, নফল সব পড়তে পারবে। ওয়াক্ত শেষ হলে আবার ওযু করতে হবে।"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৩০৫)
৪. ব্যবহারিক সমাধান:
আপনার জন্য করণীয়:
যদি রক্ত থুতুর সমান বা বেশি হয় এবং অব্যাহত থাকে:
- প্রতিবার নামাজের আগে ওযু করুন।
- নামাজের ভেতরে রক্ত বের হলে: যদি তা থুতুর সমান বা বেশি না হয়, নামাজ চালিয়ে যান। যদি থুতুর সমান বা বেশি হয় এবং আপনি মা'যুর না হন, নামাজ ভেঙে আবার ওযু করে নামাজ পড়ুন।
- যদি মা'যুর হন: এক ওযু দিয়ে এক ওয়াক্তের সব নামাজ পড়ুন। পরবর্তী ওয়াক্তে আবার ওযু করুন।
যদি রক্ত থুতুর চেয়ে কম হয়:
- ওযু ভঙ্গ হবে না। আগের ওযু দিয়েই নামাজ পড়ুন।
৫. বিশেষ পরামর্শ:
- রক্ত বের হওয়া বন্ধ করার চেষ্টা করুন: যেমন: তুলা বা গজ দিয়ে চাপ দিন, লবণ-পানি দিয়ে কুলি করুন।
- যদি রক্ত বের হওয়া দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়: ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
- সন্দেহ হলে: সতর্কতামূলক প্রতিবার ওযু করে নামাজ পড়া উত্তম।
- মা'যুর হওয়ার বিষয়ে সন্দেহ থাকলে: মুফতি বা আলেমের সাথে পরামর্শ করুন।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"দাঁতের ক্ষত থেকে রক্ত বের হলে যদি তা থুতুর সাথে মিশে এবং থুতুর সমান বা বেশি হয়, ওযু ভঙ্গ হবে। আর যদি অব্যাহত থাকে এবং মা'যুরের শর্ত পূরণ হয়, তবে এক ওযু দিয়ে এক ওয়াক্তের নামাজ পড়া যাবে।"
(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ৩১২)