শরিয়তের দৃষ্টিতে ইন্ডেমনিটি, কিসাস ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা—শরয়ি হুকুম কী?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ইন্ডেমনিটি দিয়ে বিচার থেকে সুরক্ষা দেওয়ার যে ব্যবস্থা বহাল ও সাংবিধানিকভাবে বৈধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল—শরিয়তের কিসাস ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে এই কাজের হুকুম কী?
১. নিহতের ওয়ারিশদের কিসাস/বিচারের অধিকার এভাবে বন্ধ করা কি শরিয়তবিরোধী?
২. এ ধরনের কাজ করলে শাসক কি শুধু গুনাহগার/ফাসিক হবেন, নাকি বিশেষ কোনো অবস্থায় কুফরের হুকুমও আসতে পারে? ব্যক্তি নির্দিষ্টভাবে তাকফির করার শর্তগুলো কী?
৩. রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতান্ত্রিক হলেও সংসদ বা সরকার কি এমন আইন করতে পারে যা আল্লাহর নির্ধারিত হক বা শরিয়তের স্পষ্ট বিধানের বিরুদ্ধে যায়?
৪. শরিয়তের দৃষ্টিতে কাজটি ভুল প্রমাণিত হলে, রাজনৈতিক কারণে যেমন: দেশের বিশৃঙখলা নিয়ন্ত্রণে সেই কাজকে ইনিয়ে বিনিয়ে ডিফেন্ড করা কি জায়েজ? মানে কাজের পেছনে যুক্তি দেয়া কিন্তু সরাসরি সঠিক না বলা।
৫. গণতন্ত্র কি কুফরি ব্যাবস্থা? এজন্য কি দেশের জনগণ ও শাসকের ব্যাপারে ইসলামের হুকুম কি।
কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহ/নির্ভরযোগ্য ফতোয়ার রেফারেন্সসহ উত্তর দিলে উপকৃত হব।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ।
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। নিচে কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে ধাপে ধাপে উত্তর দেওয়া হলো।
মূলনীতি: কিসাস ও দিয়াত আল্লাহর নির্ধারিত হক
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর কিসাস ফরজ করা হয়েছে..." (সূরা আল-বাকারা: ১৭৮)
"আর আমি তাওরাতে তাদের জন্য লিখে দিয়েছিলাম: প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ..." (সূরা আল-মায়িদা: ৪৫)
"যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়, আমি তার উত্তরাধিকারীকে (কিসাসের) অধিকার দিয়েছি।" (সূরা আল-ইসরা: ৩৩)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"যে ব্যক্তি হত্যা করে, তার উপর কিসাস ওয়াজিব..." (সহিহ বুখারি: ৬৮৭৬; সহিহ মুসলিম: ১৬৭০)
হানাফি ফিকহের মূলনীতি: কিসাস হলো নিহতের ওয়ারিশদের হক (হক্কুল ইবাদ)। শাসক বা রাষ্ট্র এই হক বাতিল করতে পারে না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, কিসাসের অধিকার কেবল ওয়ারিশরাই মাফ করতে পারে, রাষ্ট্র নয়। (আল-হিদায়া, কিতাবুল জিনায়াত; রাদ্দুল মুহতার: ৬/৫৬২)
১. নিহতের ওয়ারিশদের কিসাস/বিচারের অধিকার বন্ধ করা কি শরিয়তবিরোধী?
উত্তর: হ্যাঁ, সম্পূর্ণ শরিয়তবিরোধী।
- কিসাস হলো হক্কুল ইবাদ (বান্দার হক), যা আল্লাহ ওয়ারিশদের দিয়েছেন।
- শাসক বা সংসদ আইন করে এই হক বাতিল করতে পারে না। এটি আল্লাহর বিধানের সাথে সীমালঙ্ঘন।
- ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "কিসাসের হক কেবল ওয়ারিশদের, তারা চাইলে মাফ করতে পারে, রাষ্ট্র বা শাসক নয়।" (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৫৬২)
- মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন: "জিনায়াতের বিধান আল্লাহর নির্ধারিত, কোনো পার্লামেন্ট তা পরিবর্তন বা বাতিল করার অধিকার রাখে না।" (ফাতাওয়া উসমানি: ৩/৫৯৮)
সুতরাং: ইন্ডেমনিটি দিয়ে বিচার থেকে সুরক্ষা দেওয়া = আল্লাহর হক বাতিল করার অপচেষ্টা = কবিরা গুনাহ ও শরিয়তবিরোধী।
২. শাসক কি শুধু গুনাহগার/ফাসিক হবেন, নাকি কুফরের হুকুমও আসতে পারে?
উত্তর:
ক. সাধারণ অবস্থায়:
- আল্লাহর বিধান বাতিল করা বা কিসাসের হক নষ্ট করা = কবিরা গুনাহ, ফিসক।
- শাসক ফাসিক ও জালিম হবেন, তবে সরাসরি কাফির নন।
খ. কুফরের হুকুম আসতে পারে যদি:
- আল্লাহর বিধানকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করে (ইনকার/জুহুদ)।
- আল্লাহর হুকুমকে নিজের আইনের চেয়ে নিকৃষ্ট মনে করে।
- আল্লাহর বিধানকে বাতিল করাকে বৈধ (হালাল) মনে করে।
আল্লাহ বলেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা কাফির।" (সূরা আল-মায়িদা: ৪৪)
হানাফি উলামায়ে কেরামের ব্যাখ্যা:
- ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "আল্লাহর হুকুমকে হালাল-হারাম নির্ধারণে অস্বীকার করা কুফর; কিন্তু জুলুমবশত না মানা ফিসক।" (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২৫৮)
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন: "আল্লাহর বিধানকে বাতিল করা যদি ইস্তেহাল (বৈধ মনে করা) ছাড়া হয়, তবে তা কুফর নয়, ফিসক।" (মাআরিফুল কুরআন: ৩/১৪৫)
গ. ব্যক্তি নির্দিষ্টভাবে তাকফিরের শর্ত:
- আলেমদের ইজমা থাকতে হবে।
- স্পষ্ট কুফরি কথা/কাজ প্রমাণিত হতে হবে।
- ইনকার বা ইস্তেহাল (বৈধ মনে করা) প্রমাণিত হতে হবে।
- সন্দেহ দূরীভূত হতে হবে।
- তাকফির করা সাধারণ মানুষের কাজ নয়, বরং মুফতি/আলেমদের কাজ।
রাসূল ﷺ বলেন: "যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে কাফির বলে, অথচ সে কাফির নয়, তবে সেই কুফরের কথা তার নিজের উপর ফিরে আসে।" (সহিহ বুখারি: ৬১০৪)
সুতরাং: সরাসরি তাকফির করা যাবে না; বরং বলা হবে—এ কাজ কুফরির দিকে নিয়ে যেতে পারে, তবে ব্যক্তি নির্দিষ্টভাবে কাফির বলতে আলেমদের ইজমা ও শর্ত প্রয়োজন।
৩. গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদ/সরকার কি আল্লাহর হকের বিরুদ্ধে আইন করতে পারে?
উত্তর: না, কখনোই নয়।
- আল্লাহর হুকুম চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয়।
- সংসদ বা সরকার আল্লাহর হক বাতিল করার অধিকার রাখে না।
- ইমাম আল-হিদায়ায় বলা হয়েছে: "শাসকের দায়িত্ব আল্লাহর বিধান কায়েম করা, পরিবর্তন নয়।" (আল-হিদায়া: কিতাবুল জিহাদ)
- মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন: "গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে আল্লাহর হুকুম বাতিল করা যায় না; এটি কুফরি আইন প্রণয়নের শামিল হতে পারে।" (ফাতাওয়া উসমানি: ৩/৬০১)
মূলনীতি: আল্লাহর হক > সংবিধান > সংসদ > সরকার।
৪. শরিয়তের দৃষ্টিতে কাজটি ভুল হলে রাজনৈতিক কারণে ইনিয়ে-বিনিয়ে ডিফেন্ড করা কি জায়েজ?
উত্তর: না, জায়েজ নয়।
- সত্য গোপন করা বা মিথ্যা দিয়ে ডিফেন্ড করা = মুনাফিকি ও কবিরা গুনাহ।
- আল্লাহ বলেন: "তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-বুঝে সত্য গোপন করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ৪২)
- রাসূল ﷺ বলেন: "যে ব্যক্তি কোনো জালিমকে সাহায্য করে, আল্লাহ তার উপর লানত করেন।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৩৫)
- ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন: "জুলুমকে যুক্তি দিয়ে ডিফেন্ড করা জুলুমের অংশ।" (বেহেশতী জেওর: ৭/২৩)
সুতরাং: ভুল কাজকে রাজনৈতিক কারণে ডিফেন্ড করা = জুলুমে সহযোগিতা = হারাম।
৫. গণতন্ত্র কি কুফরি ব্যবস্থা? জনগণ ও শাসকের ব্যাপারে ইসলামের হুকুম কী?
উত্তর:
ক. গণতন্ত্রের মূলনীতি:
- সার্বভৌমত্ব জনগণের হাতে (আল্লাহর নয়) → এটি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক।
- আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত অধিকার সংসদের → আল্লাহর হকের লঙ্ঘন।
খ. তবে:
- গণতন্ত্রকে সরাসরি কুফর বলা যায় না, যদি না তা আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করে।
- আকিদা: সার্বভৌমত্ব কেবল আল্লাহর। (সূরা ইউসুফ: ৪০, সূরা আল-মায়িদা: ৪৪-৪৭)
- হানাফি ফিকহ: মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন: "গণতন্ত্র নিজে কুফর নয়, তবে আল্লাহর বিধান বাতিল করলে কুফরি ব্যবস্থায় পরিণত হয়।" (ফাতাওয়া উসমানি: ৩/৬০৩)
গ. জনগণ ও শাসকের হুকুম:
- শাসক: আল্লাহর বিধান কায়েম করা ফরজ। বাতিল করলে ফাসিক/জালিম; ইনকার করলে কুফর।
- জনগণ:
- সৎ শাসককে সাহায্য করা।
- জালিম শাসকের বিরুদ্ধে সত্য বলা (জিহাদুল কালিমা)।
- ফিতনা সৃষ্টি না করা।
- আল্লাহর বিধান কায়েমের জন্য দাওয়াত দেওয়া।
রাসূল ﷺ বলেন: "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অন্যায় দেখবে, সে হাত দিয়ে প্রতিরোধ করবে; না পারলে মুখ দিয়ে; না পারলে অন্তর দিয়ে—এটি ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।" (সহিহ মুসলিম: ৪৯)
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | হুকুম | |--------|-------| | ১. কিসাসের হক বন্ধ করা | শরিয়তবিরোধী, কবিরা গুনাহ | | ২. শাসকের হুকুম | ফাসিক/জালিম; ইনকার করলে কুফর | | ৩. সংসদের আল্লাহর হক বাতিল | হারাম, কুফরির দিকে নিয়ে যায় | | ৪. জুলুম ডিফেন্ড করা | হারাম, জুলুমে সহযোগিতা | | ৫. গণতন্ত্র | আল্লাহর বিধান বাতিল করলে কুফরি; নাহলে ফিসক |
উপসংহার: আল্লাহর বিধান চূড়ান্ত। কিসাস ওয়ারিশদের হক, যা রাষ্ট্র বাতিল করতে পারে না। জুলুমকে ডিফেন্ড করা হারাম। গণতন্ত্র আল্লাহর বিধান বাতিল করলে কুফরি, নাহলে ফিসক। তাকফির করা সাধারণ মানুষের কাজ নয়, বরং আলেমদের ইজমা ও শর্ত সাপেক্ষ।
والله أعلم بالصواب