১০ দিনের বেশি রক্ত এলে করণীয়

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 6126
Questioner: Ahammad Hossain
Question Asked: 29 Sep 2026, 10:04 PM
Reviewed & Published: 30 Sep 2026, 02:08 AM
Views: 37
Tokens: 9,895
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার আগে বারবার ইস্তেহাজা হতো। এ কারণে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী একটি ওষুধ তিন মাস খেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু মাঝখানে কিছুদিন গ্যাপ হয়ে যাওয়ায়, সেই গ্যাপ পূরণ করার জন্য পরবর্তীতে ওষুধটি আরও কিছুদিন খেয়েছি। সব মিলিয়ে ভুলবশত প্রায় সাড়ে চার মাস ওষুধটি খাওয়া হয়েছে।

ওষুধটি খাওয়ার পর লক্ষ্য করি, আমার শেষের বারের পিরিয়ডের রক্তপাত অনেক কমে গেছে—প্রায় না থাকার মতো। তখন মনে হয়েছে, সম্ভবত এটি ওষুধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তাই আমি ওষুধটি বন্ধ করে দিই।

সাধারণত আমার ১৭–১৯ দিনের মধ্যেই পিরিয়ড হয়ে যেত। কিন্তু এবার ৩০ দিন পার হয়ে গেলেও পিরিয়ড হয়নি। মাঝে মাঝে ঘোলা একটি শ্রাব আসতো। এরপর ৩০ দিন-দুপুর থেকে অল্প অল্প করে টিয়া/কমলা রঙের, কফি/বাদামি রঙের ও ময়লা রঙের স্রাব আসতে থাকে। এভাবে প্রায় এক সপ্তাহ চলতে থাকে। আমি এটিকে পিরিয়ড মনে করে এক সপ্তাহ নামাজ পড়িনি।

এক সপ্তাহ পর স্রাব সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হয়ে যায়। তখন আমি ফরজ গোসল করে আবার নামাজ শুরু করি।

কিন্তু ফরজ গোসলের প্রায় দেড় দিন পর আবার টাটকা লাল রক্ত আসা শুরু হয়। প্রথমে রক্তের পরিমাণ অল্প দেখে আমি নামাজ ইস্তেজা মনে করে সেই নিয়মে নামাজ পড়েছি কিন্তু,এখন রক্তের পরিমাণও এমন যে, দেখে মনে হচ্ছে এটাই পিরিয়ডের প্রথম দিনের মতো স্বাভাবিক রক্তপাত। প্রথমে আমি এটিকে ইস্তেহাজা মনে করেছিলাম, কিন্তু এখন খুব দ্বিধায় আছি।

আমার মূল বিভ্রান্তি হলো—আগের এক সপ্তাহ যে টিয়া/কমলা, কফি/বাদামি ও ময়লা রঙের স্রাব এসেছিল, সেটি কি পিরিয়ডের অংশ হিসেবে গণ্য হবে? নাকি এখন যে টাটকা লাল রক্তপাত হচ্ছে, সেটিই পিরিয়ড হিসেবে গণ্য হবে? মধ্যবর্তী গ্যাপ মাত্র দেড় দিন স্বচ্ছ ছিল।।

উল্লেখ্য, আজ এই টাটকা রক্তপাতের ৯ম দিন চলছে; এখনো ১০ দিন পূর্ণ হয়নি। যেহেতু দশম দিন পূর্ণ হয়নি আমি কি অপেক্ষা করব ?নাকি নামাজ পড়বো? পূর্বে পূর্বে আমার দশ দিনের পিরিয়ডের অভ্যাস ছিল কিন্তু এখন সাত দিনের অভ্যাস এখন আমি কি সাত দিনের অভ্যাস ভেবে এটাই ইশতেহার যা ধরে নামাজ শুরু করব নাকি দশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবো ।

এ অবস্থায় শরিয়তের দৃষ্টিতে কোন রক্তকে হায়েজ এবং কোনটিকে ইস্তেহাজা হিসেবে গণ্য করা হবে—দয়া করে বিষয়টি পরিষ্কার করে জানাবেন।

Answer

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

আপনার বিস্তারিত পরিস্থিতি ও জিজ্ঞাসিত মাসআলাটির শরয়ী ফায়সালা ফিকহে হানাফীর নির্ভরযোগ্য ফিকহ ও ফাতাওয়া কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ নিচে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পেশ করা হলো:


১. রঙের বিবরণ ও ১ম সপ্তাহের স্রাব হায়েজের অংশ কিনা:

  • শরয়ী মূলনীতি: ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হায়েজের সময়সীমার ভেতরে লাল রক্ত ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি রঙের স্রাব নির্গত হলে তা হায়েজের রক্ত বলেই গণ্য হয়। এর মধ্যে হলুদ, কফি/বাদামি, ময়লা, টিয়া/কমলা ও কালচে রঙের স্রাবও হায়েজের অন্তর্ভুক্ত [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫; নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৪৭]।
  • প্রথম সপ্তাহের হুকুম: ৩০ দিন পর আপনার যে ১ সপ্তাহ (৭ দিন) ধরে টিয়া/কমলা, কফি/বাদামি ও ময়লা রঙের স্রাব এসেছিল এবং আপনার বর্তমান রক্তস্রাবের অভ্যাসও যেহেতু ৭ দিন, তাই ওই ১ম সপ্তাহের ৭ দিনের স্রাবই শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার এ মাসের পূর্ণাঙ্গ 'হায়েজ' (ঋতুস্রাব) হিসেবে গণ্য হবে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫, ১৩৮]।

২. পরবর্তী দেড় দিনের গ্যাপ ও টাটকা লাল রক্তপাতের শরয়ী মর্যাদা:

  • ১০ দিনের নিয়ম ও অভ্যাসে প্রত্যাবর্তন: ইসলামি শরীআতে হায়েজের সর্বোচ্চ মেয়াদ হলো ১০ দিন ও ১০ রাত [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫; নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৪৭]। প্রথম দিন স্রাব শুরু হওয়া থেকে নিয়ে বর্তমানে টাটকা রক্তপাতের ৯ম দিন হিসাব করলে মোট সময় প্রায় ১৭–১৮ দিন পার হয়ে গেছে, যা ১০ দিনের সীমা অতিক্রম করেছে।
  • শরয়ী সিদ্ধান্ত: ফিকহের নিয়ম হলো, যখন রক্তপাত বা স্রাবের মোট সময়কাল ১০ দিন অতিক্রম করে যায়, তখন নিয়ম অনুযায়ী মহিলাকে তার পূর্বের অভ্যাসে (আদাতে) ফেরত নেওয়া হয় [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৮]। যেহেতু আপনার ৭ দিনের অভ্যাস অনুযায়ী ১ম সপ্তাহের ৭ দিনেই হায়েজ পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল, তাই:
    • প্রথম ৭ দিন = হায়েজ [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫, ১৩৮]।
    • পরবর্তী দেড় দিনের স্বচ্ছ গ্যাপ এবং বর্তমানে চলমান টাটকা লাল রক্তপাত = ইস্তেহাজা (অসুস্থতাজনিত রক্তপাত) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৮; নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৪৭]।

৩. বর্তমানে আপনার করণীয় (১০ দিন অপেক্ষা করবেন নাকি নামায পড়বেন?):

  • অবিলম্বে নামায শুরু করা: আপনার ১০ দিন পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার আর কোনো প্রয়োজন বা শরয়ী অনুমতি নেই। যেহেতু আপনার এ মাসের হায়েজ প্রথম ৭ দিনেই শেষ হয়ে গেছে এবং বর্তমান রক্তপাতটি 'ইস্তেহাজা', তাই আজই গোসল/ওযূ করে অনতিবিলম্বে নামায পড়া শুরু করা আপনার জন্য ফরয [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৮, ১৩৯]।
  • ছুটে যাওয়া নামাযের কাযা করা: তাজা রক্ত আসার পর যে কয়দিন আপনি এটিকে দ্বিতীয়বার হায়েজ মনে করে ভুলবশত নামায পড়েননি, সেই দিনগুলোর ফরয নামাযগুলোর কাযা আদায় করা আপনার ওপর ওয়াজিব [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৮, ১৩৯; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১০ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৬৭]।
  • ইস্তেহাজা অবস্থায় নামায আদায়ের নিয়ম: ইস্তেহাজাকালী রক্ত প্রবাহের সময় একজন নারী শরয়ী 'মা'যূর' (ওজরগ্রস্ত) হিসেবে গণ্য হন। আপনার করণীয় হলো—প্রতিটি ফরয নামাযের ওয়াক্ত প্রবেশ করলে ওযূ করবেন। উক্ত ওযূ দিয়ে সেই ওয়াক্তের ফরয, সুন্নাত ও কাযা নামায নিঃসঙ্কোচে আদায় করবেন [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৮৬–৩৮৭]।

সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:

১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ১৩৫: (অধ্যায়: তাহারাত, ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: মহিলাদের খাস রক্তসমূহের বিবরণ — হায়েজের রঙসমূহ (হলুদ, কফি, ময়লা ইত্যাদি) এবং সর্বোচ্চ ১০ দিনের মেয়াদ) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৫]।
  • পৃষ্ঠা: ১৩৮–১৩৯: (অধ্যায়: তাহারাত, ইস্তেহাজার বিবরণ — রক্ত ১০ দিন অতিক্রম করলে অভ্যাসে ফেরত যাওয়া এবং ইস্তেহাজার রক্তে নামায ফরয হওয়া ও কাযা করার মাসআলা) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৩৮, ১৩৯]।

২. নূরুল ঈযাহ:

  • পৃষ্ঠা: ৪৭: (পরিচ্ছেদ: হায়েজ ও ইস্তেহাজা — হায়েজের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সময়সীমা এবং ইস্তেহাজাওয়ালীর নামাযের হুকুম) [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৪৭]।

৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ১৯৯–২০০: (অধ্যায়: বাবুল হায়েজ ওয়ানিফাস — অভ্যাস পরিবর্তন ও ১০ দিনের বেশি রক্ত প্রবাহের ফতোয়া) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৯৯, ২০০]।

৪. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ৩৮৬–৩৮৭: (অধ্যায়: মা'যূর ও ইস্তেহাজাওয়ালীর পবিত্রতা ও নামাযের বিস্তারিত ফিকহী রূপরেখা) [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৮৬, ৩৮৭]।

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.