রুকইয়াহ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি প্রশ্নের উত্তর।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 6120
Questioner: Tasnim Saima
Question Asked: 29 Sep 2026, 06:57 PM
Reviewed & Published: 29 Sep 2026, 07:16 PM
Views: 20
Tokens: 10,964
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওবারকাতুহ।
আমি আজ এক জায়গায় রুকইয়াহ করাতে গেলাম। কিন্তু আমি খুবই অবাক হলাম কিছু জিনিস দেখে। প্রথমে বলি আমি কি কি সমস্যা তাদের বলেছি :
১. খুব খারাপ সপ্ন দেখি ( সপ্নে কেউ ধাওয়া করছে, মেরে ফেলার চেষ্টা, খাওয়ানো, ওয়াশরুম টয়লেট সপ্ন দেখা আরও অনেক বাজে বাজে সপ্ন)
২. প্রেসার অস্বাভাবিক ভাবে লো থাকে
৩. বুক ধরফর করে
৪. খুব দুর্বল লাগে
৫. অল্পতে রেগে যাই, মেজাজ খিটখিটে থাকে
৬.শ্বাস নিতে কষ্ট হয়
৭. এবাদত বিমুখতা
৮. কোরআন তিলাওয়াত এ বাধা
৯. এরাবিক পড়তে যেয়ে সমস্যা
১০. যেকোনো কিছু ভুলে যাওয়া
১১.অকারণে কান্না আসে, ইত্যাদি
আরও কিছু বলে থাকলে এমুহূর্তে মনে পড়ছে না।

তারা আমার কাছ থেকে এগুলো নিল + বাবা, মা, আমার নাম, বয়স এগুলা তথ্য নিল।

তারপর আমাকে রাকির কাছে নিয়ে যাওয়া হলো তিনি কি যেন মনে মনে পড়ে আমাকে ফু দিলো আর বললো ২ হাত একটা অপরটার সাথে মুষ্টিবদ্ধ করতে। তারপর দেখলাম তিনি খাতায় কি লিখে যেন কাটছেন। কয়েকবার কাটলেন এভাবে।
যাইহোক তারপর আমাকে অন্য একজন হুজুর বললেন আমার এসব কোনো সমস্যা না। ভয় দূর করতে হবে। এগুলো আমার ভয়ের জন্য হয়। ভালো ঘুম হলে নাকি সপ্ন আসবে না। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো ১টা মানুষের ভয় এর জন্য কয়দিন খারাপ সপ্ন আসতে পারে? তাও এমন ধরনের??? আমার প্রায় প্রতিদিনই এমন হয়। আমি কোনো ভয়ে/ টেনশনে না থাকলেও। এক টানা ৭দিন আবার হয়তো কখনো একদিন গ্যাপ তারপর আবার। তারপর আমার বাকি উপসর্গ গুলোও অবহেলা করার মত না। যাই হোক আমাকে এটা বল্লো। ইভেন এসবের জন্য ডাক্তার দেখানো উচিত কিনা তাও ক্লিয়ার করে নি।
তারপর আমার মেইন সমস্যা বললো যে আমার জিনের বদনজরের সমস্যা। আমার কাছে ভিজিটসহ ৩৬০০৳ চার্জ করলো। প্রথমে ৪১০০৳ বলেছিল। আমি বললাম আমার বাসায় আর্থিক সমস্যা খুব। আমি নিজের খরচায় এখানে এসেছি + আমি স্টুডেন্ট। তাও ৫০০৳ কমালো যা কমানো আর না কমানো প্রায় একই কথা।
যাই হোক, আমাকে পড়া পানি দিল, আমার গায়ে ছিটিয়ে দিল+ খেতে বল্লো, সেই পানি আর ডাবের পানি + গোলাপজল + নরমাল পানি মিশিয়ে গোসল করতে বল্লো। আর সেই লেখা গুলো বললো রাকি কে দিবেন। তিনি পরে চিকিৎসা করে দিবেন।
এই হলো আমার রুকইয়াহর জার্নি। আমি খুবই বিচলিত। আমি আসলে এখন কি করবো? আর সমস্যাটাই বা কি আমার? আর আমার এমন কেন মনে হলো তিনি জিনের হেল্প নিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন? তিনি আমার উপর কিছু আয়াতও পাঠ করলো না যা নরমাল রুকইয়াহ তে করা হয়। আমি খুবই ব্যথিত। আমার কি করা উচিত? একটু কাইন্ডলি জানাবেন।

Answer

রুকইয়াহ সংক্রান্ত প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আপনার বর্ণনা থেকে যা বোঝা যাচ্ছে, তাতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়। নিচে ধাপে ধাপে শরীয়তের দৃষ্টিতে বিস্তারিত উত্তর দিচ্ছি।


১. প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি

রুকইয়াহ শরীয়তসম্মত একটি আমল, তবে তা হতে হবে কুরআন-সুন্নাহর নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে। রুকইয়াহর মূল ভিত্তি হলো:

  • রোগীর সামনে বা তার উপর কুরআনের আয়াত পাঠ করা
  • মাসনূন দুআ পড়া
  • ফুঁ দেওয়া (নফস)
  • রোগীর ঈমান ও তাওয়াক্কুল ঠিক রাখা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি রুকইয়াহ করে বা করায়, তার মধ্যে শিরকের কোনো লেশ থাকলে তা কুফরির দিকে নিয়ে যায়।" (মুসনাদে আহমাদ)

আপনার বর্ণনায় যে বিষয়গুলো উদ্বেগজনক:

| বিষয় | শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি | |------|---------------------| | আয়াত পাঠ না করা | রুকইয়াহর মূল উপাদানই বাদ দেওয়া হয়েছে | | শুধু "মনে মনে পড়ে ফুঁ দেওয়া" | এটি সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি নয় | | খাতায় লিখে কাটা | এর কোনো শরীয়তসম্মত ভিত্তি নেই | | জিনের সাহায্য নিয়ে চিকিৎসা | এটি সুস্পষ্ট হারাম ও শিরকের দিকে নিয়ে যায় | | অতিরিক্ত টাকা নেওয়া | রুকইয়াহর জন্য মোটা অঙ্কের ফি নেওয়া ঠিক নয় |


২. জিনের সাহায্য নিয়ে চিকিৎসা — কঠোর নিষেধাজ্ঞা

আপনার সন্দেহ যে "তিনি জিনের হেল্প নিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন" — এটি যদি সত্য হয়, তবে এটি সুস্পষ্ট হারাম।

আল্লাহ তা'আলা বলেন: "সেদিন আমি জিন ও ইনসানকে একত্রিত করব, অতঃপর বলব: হে জিন সম্প্রদায়! তোমরা ইনসানদের অনেককে পথভ্রষ্ট করেছ।" (সূরা আনআম: ১২৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "নিশ্চয়ই কিছু মানুষ জিনের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, ফলে জিনরা তাদের পাপাচারে আরও বাড়িয়ে দেয়।" (সূরা জিন: ৬)

ফাতাওয়া উসমানি (১/৩৪৫) ও ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৮৭)-তে স্পষ্ট বলা হয়েছে — জিনের সহায়তায় চিকিৎসা করা, জিনের সাথে যোগাযোগ করা, তাদের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা — সবই হারাম ও শিরকের মাধ্যম।

ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (৬/৩৬৩)-এ উল্লেখ করেছেন: যে ব্যক্তি জিনের সহায়তা নেয় বা জিনের সাথে সম্পর্ক রাখে, তার কাছে চিকিৎসার জন্য যাওয়া জায়েয নয়।


৩. আপনার উপসর্গগুলোর প্রকৃত বিশ্লেষণ

আপনার বর্ণিত উপসর্গগুলো লক্ষ্য করুন:

  1. খারাপ স্বপ্ন (ধাওয়া করা, মেরে ফেলার চেষ্টা, খাওয়ানো, টয়লেটের স্বপ্ন)
  2. প্রেসার অস্বাভাবিক কম
  3. বুক ধরফর
  4. দুর্বলতা
  5. অল্পতে রাগ, খিটখিটে মেজাজ
  6. শ্বাস নিতে কষ্ট
  7. ইবাদত বিমুখতা
  8. কুরআন তিলাওয়াতে বাধা
  9. আরবি পড়তে সমস্যা
  10. ভুলে যাওয়া
  11. অকারণে কান্না

এই উপসর্গগুলোর দুটি সম্ভাব্য দিক রয়েছে:

(ক) চিকিৎসাগত দিক (Medical)

  • প্রেসার কম, শ্বাসকষ্ট, বুক ধরফর, দুর্বলতা, মেজাজ খিটখিটে — এগুলো হরমোনাল ইমব্যালান্স, থাইরয়েড সমস্যা, অ্যানিমিয়া, ভিটামিন ডি/বি১২ ঘাটতি, ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার ইত্যাদির লক্ষণ হতে পারে।
  • অবশ্যই একজন ভালো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রয়োজনে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো উচিত। এটি শরীয়তবিরোধী নয়; বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ চিকিৎসা করাতে বলেছেন: "হে আল্লাহর বান্দারা! চিকিৎসা করাও, কারণ আল্লাহ এমন কোনো রোগ দেননি যার চিকিৎসা দেননি।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫৫)

(খ) আধ্যাত্মিক দিক (Spiritual)

  • বদনজর, জিনের আছর, সিহর — এসবও সম্ভব। তবে এর চিকিৎসা শুধুমাত্র কুরআন-সুন্নাহসম্মত রুকইয়াহ দ্বারা হতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ: শুধু "ভয় দূর করলে সপ্ন আসবে না" — এই কথাটি আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, কারণ আপনি নিজেই বলেছেন আপনি ভয়/টেনশনে থাকেন না। একটানা ৭ দিন খারাপ স্বপ্ন আসা শুধু "ভয়" দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।


৪. আপনার এখন করণীয়

ধাপ ১: এই রাকির থেকে দূরে থাকুন

যেহেতু তিনি আয়াত পড়েননি, জিনের সাহায্যের সন্দেহ রয়েছে, এবং অতিরিক্ত টাকা নিয়েছেন — তার কাছে আর যাবেন না। তার দেওয়া পানি/গোলাপজল ইত্যাদি ব্যবহার করবেন না।

ধাপ ২: ডাক্তার দেখান

আপনার শারীরিক উপসর্গগুলোর জন্য অবশ্যই একজন ভালো ডাক্তার দেখান। রক্ত পরীক্ষা করান — থাইরয়েড, হিমোগ্লোবিন, ভিটামিন ডি, বি১২, হরমোন। প্রয়োজনে সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নিন।

ধাপ ৩: নিজেই মাসনূন রুকইয়াহ করুন

নিম্নলিখিত আমলগুলো নিজে করুন:

ক. সকাল-সন্ধ্যা আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা ইখলাস ৩ বার পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে মাসেহ করুন।

খ. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (আমানার রাসূলু...) রাতে পড়ুন।

গ. ঘুমানোর আগে:

  • আয়াতুল কুরসি পড়ুন
  • সূরা ফালাক, নাস, ইখলাস পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে মাসেহ করুন (৩ বার)
  • "বিসমিল্লাহি ওয়ালাজি..." দুআ পড়ুন
  • ডান কাত হয়ে ঘুমান

ঘ. সকাল-সন্ধ্যা এই দুআ পড়ুন:

"আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক" (৩ বার)

ঙ. খারাপ স্বপ্ন দেখলে:

  • বাম দিকে ৩ বার ফুঁ দিন
  • "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন
  • শয়তানের ধোঁকা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান
  • ডান কাত হয়ে শুয়ে পড়ুন
  • কারও কাছে স্বপ্নের কথা বলবেন না

ধাপ ৪: নিয়মিত ইবাদত ও কুরআন তিলাওয়াত

শয়তান আপনাকে ইবাদত থেকে দূরে রাখতে চায়। যত কষ্টই হোক, নামাজ ছাড়বেন না। কুরআন তিলাওয়াত চালিয়ে যান, অল্প হলেও।

ধাপ ৫: বিশ্বস্ত রাকির খুঁজুন (প্রয়োজনে)

যদি সত্যিই রুকইয়াহর প্রয়োজন হয়, তবে এমন রাকির খুঁজুন যিনি:

  • সরাসরি কুরআনের আয়াত পড়বেন
  • মাসনূন দুআ পড়বেন
  • অতিরিক্ত টাকা নেবেন না
  • জিনের সাহায্য নেবেন না
  • আপনার সামনেই সব আমল করবেন

৫. আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর

প্রশ্ন: ১টা মানুষের ভয়ের জন্য কয়দিন খারাপ স্বপ্ন আসতে পারে?

উত্তর: শুধু ভয়ের কারণে এত দিন ধরে এত ভয়ংকর স্বপ্ন আসা স্বাভাবিক নয়। এটি শারীরিক সমস্যা (হরমোন, ঘুমের ব্যাঘাত, স্লিপ প্যারালাইসিস) অথবা আধ্যাত্মিক আছর — যেকোনো একটি হতে পারে। উভয় দিকেই চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

প্রশ্ন: সমস্যাটা কি আমার?

উত্তর: সমস্যা আপনার নয়, সমস্যা হলো আপনি ভুল পদ্ধতির রুকইয়াহর কাছে গিয়েছিলেন। আপনার উপসর্গগুলো বাস্তব, তবে তার চিকিৎসা এই রাকিরের পদ্ধতিতে নয়।

প্রশ্ন: তিনি জিনের হেল্প নিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন কি?

উত্তর: আপনার বর্ণনা (আয়াত না পড়া, শুধু মনে মনে পড়ে ফুঁ দেওয়া, খাতায় লিখে কাটা, জিনের বদনজরের কথা বলা) — এসব থেকে সন্দেহ প্রবল যে তিনি শরীয়তসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করছেন না। সতর্ক থাকুন, তার কাছে আর যাবেন না।

প্রশ্ন: আমার কি করা উচিত?

উত্তর: উপরে বর্ণিত ৫টি ধাপ অনুসরণ করুন। বিশেষ করে ডাক্তার দেখানো এবং নিজে মাসনূন রুকইয়াহ করা — এই দুটি সবচেয়ে জরুরি।


৬. শেষ পরামর্শ

প্রিয় বোন, আপনি বিচলিত হবেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"আর আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৮২)

আপনার ঈমান ও তাওয়াক্কুল আল্লাহর উপর রাখুন। নিয়মিত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, সকাল-সন্ধ্যার আমল চালিয়ে যান। পাশাপাশি ডাক্তারি চিকিৎসা নিন। আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই শিফা দান করবেন।

মনে রাখবেন: টাকার বিনিময়ে জিনের সাহায্যে চিকিৎসা — এটি কখনোই জায়েয নয়। আপনার টাকা নষ্ট হয়েছে, কিন্তু ঈমান বাঁচানো বেশি জরুরি। এখন থেকে সতর্ক থাকুন।

আল্লাহ তা'আলা আপনার সব সমস্যা দূর করুন এবং সুস্থতা দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.