বিসমিল্লাহ লেখা বা রাসুলুল্লাহ সাঃ এর নাম লিখা চিরকুট যদি রাস্তায় পড়ে থাকে, এগুলো যদি তুলা না হয়, তাহলে কি কোনো সমস্যা হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
উত্তর:
রাস্তায় বা বাজারে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর নাম বা পবিত্র বাক্য যেমন ‘বিসমিল্লাহ’ লেখা কাগজ পড়ে থাকলে তা দেখে তোলা ও সম্মানের স্থানে রাখা মুস্তাহাব এবং সুন্নাতের প্রতি যত্নের অংশ। তবে যদি কোনো ব্যক্তি সেগুলো না তোলে, তবে শুধু না তোলার কারণে সরাসরি গুনাহ হবে না বা ইমানের সমস্যা হবে না, যতক্ষণ না সে অবজ্ঞা বা অসম্মানের উদ্দেশ্যে তা ফেলে রাখে। তবে শরিয়তের নির্দেশ হলো, পবিত্র নামসমূহকে অপমান থেকে রক্ষা করা ওয়াজিব। যদি দেখার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে না তোলে এবং সেগুলো পায়ের নিচে পড়ে বা অসম্মানিত হয়, তাহলে সে গুনাহগার হবে। আর যদি কেউ তোলে, তাহলে সওয়াব লাভ করবে।
সতর্কতা: জনসমক্ষে উঠাতে লজ্জা বা মানুষের ভয় করলে গোপনে উঠানোর চেষ্টা করা উচিত
বিঃদ্রঃ উপরের বিষয় গুলো নিয়ে নিচে ক ও খ আকারে প্রশ্ন দেওয়া হল
ক)উত্তর বুঝতে পারছি না এক জায়গায় তোললে মুস্তাহাব গোনাহ হবে না আবার নিচের দিকে না তুললে গোনাহ হবে বুঝতে পারছি না
খ)এগুলো আমি ফেলছি না বিভিন্ন পোস্টারে ভিজিটিং কার্ডে অন্যন্য যায়গায় থাকে অন্যকেউ ফেলায়।অনেক যায়গায় যাওয়ার সময় এগুলোতে দুলাবারি নাপাকি থাকে বা থাকতে পারে উঠিয়ে সম্মান জনক যায়গা রাখতে পারি কিনা বা এমনিতেই ঝামেলা মনে করে বা চিন্তা করে বা এমনিতেই আমি না তোলার কারনে গোনাহগার বা ইমানে সমস্যা হবে কিনা?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
উত্তর:
আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর নাম বা পবিত্র বাক্য (যেমন ‘বিসমিল্লাহ’) লেখা কাগজ রাস্তায় বা বাজারে পড়ে থাকলে সেগুলো তোলা ও সম্মানজনক স্থানে রাখা শরিয়তে মুস্তাহাব (প্রশংসনীয়) এবং এর উপর সওয়াবের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে এটি ওয়াজিব নয়, যতক্ষণ না সেগুলো অসম্মানের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নিচে আপনার ক ও খ নম্বর প্রশ্নের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
ক) উত্তরের আপাত বিরোধিতার ব্যাখ্যা
আগের উত্তরটিতে দুটি ভিন্ন অবস্থার কথা বলা হয়েছে, যা বুঝতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে:
-
সাধারণ অবস্থা: কেউ যদি রাস্তায় পড়ে থাকা পবিত্র নাম লেখা কাগজ দেখে কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে না তোলে, এবং কাগজটি এমন জায়গায় থাকে যেখানে তা পায়ে দলা পাকানো বা অসম্মানের সম্ভাবনা নেই (যেমন ফুটপাতের পাশে নিরাপদ জায়গায় পড়ে আছে), তাহলে শুধু না তোলার কারণে গুনাহ হবে না। এটি মুস্তাহাব ছেড়ে দেওয়ার মতো, যা সওয়াব থেকে বঞ্চিত করে কিন্তু গুনাহ সৃষ্টি করে না।
(রদ্দুল মুহতার, ১/৪৭৩; ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২১৭) -
অসম্মানের আশঙ্কা থাকা অবস্থা: যদি কাগজটি এমন জায়গায় পড়ে থাকে যেখানে মানুষ পায়ে মাড়িয়ে যায়, ময়লা-আবর্জনার সাথে মিশে যায়, বা কোনো অপমানজনক অবস্থায় পড়ে থাকে, তাহলে সেটি না তোলা গুনাহর কারণ হবে। কেননা পবিত্র নামসমূহকে অপমান থেকে রক্ষা করা ওয়াজিব। এই অবস্থায় যদি কেউ দেখেও না তোলে, তবে সে গুনাহগার হবে।
(ফতোয়া উসমানি, ১/৫২২; ফতোয়া আলমগীরি, ৫/৩৭৫)
সারমর্ম: প্রথমটি হলো মুস্তাহাব বর্জন, দ্বিতীয়টি হলো ওয়াজিব বর্জন। আপনার প্রশ্নের সাথে দ্বিতীয় অবস্থাটি বেশি প্রাসঙ্গিক।
খ) আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতির বিধান
আপনি বলেছেন:
- আপনি নিজে কাগজগুলো ফেলেন না, অন্য কেউ ফেলে।
- অনেক সময় উঠান, আবার কখনো উঠান না।
- উঠাতে ইচ্ছা করে না কারণ: মানুষের ভয়, ঝামেলা মনে হওয়া, বা কাগজে নাপাকি থাকার আশঙ্কা।
এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত দিকগুলো বিবেচ্য:
১. নাপাকির আশঙ্কা থাকলে করণীয়
যদি কাগজে দৃশ্যমান নাপাকি (যেমন মল, প্রস্রাব, রক্ত) থাকে, তবে সরাসরি হাত দিয়ে স্পর্শ করা জায়েজ নয়। তবে গ্লাভস, কাপড় বা টিস্যু ব্যবহার করে তা উঠানো যাবে। উঠানোর পর কাগজটি পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা (যদি লেখা মোছে না যায়) অথবা কোনো পরিষ্কার কাপড়ে মুছে শুকিয়ে সম্মানজনক স্থানে রাখা উচিত। যদি নাপাকি নিশ্চিত না হয়, শুধু সন্দেহ থাকে, তাহলে সন্দেহ উপেক্ষা করে উঠানো যাবে।
(বাহিJTisti জেওর, ২/৮২; কিতাবুল আসার, ১/২৫০)
অনেক সময় কাগজে নাপাকি থাকতে পারে বলে উঠাতে সংকোচ করলে তা শয়তানের প্ররোচনা। বরং সতর্কতার সাথে উঠিয়ে পরিষ্কার করে সম্মানজনক স্থানে রাখাই কর্তব্য।
২. মানুষের ভয় বা লজ্জার বিষয়
জনসমক্ষে কাগজ উঠাতে লজ্জা বা মানুষের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ভয় থাকলে, গোপনে বা সুযোগমতো উঠিয়ে ফেলার চেষ্টা করা উচিত। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে চেষ্টা করতে হবে। মানুষের ভয়কে পবিত্র নামের অসম্মানের চেয়ে বড় করে দেখা উচিত নয়।
(ফতোয়া উসমানি, ১/৫২৩)
৩. ঝামেলা বা অলসতার কারণে না তোলা
আপনি যদি দেখেন কাগজটি পায়ের নিচে পড়ে থাকবে বা অসম্মানের শিকার হবে, কিন্তু ঝামেলা মনে করে না তোলেন, তাহলে তা গুনাহের কারণ হবে। কেননা ওয়াজিব পালনে অলসতা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। তবে যদি কাগজটি নিরাপদ স্থানে থাকে এবং অসম্মানের আশঙ্কা না থাকে, তাহলে না তোলার কারণে গুনাহ নেই, তবে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন।
(ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২১৮)
৪. ইমানের সমস্যা হবে কি?
ইমানের সমস্যা ততক্ষণ হবে না, যতক্ষণ না আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে অবজ্ঞা বা অসম্মানের উদ্দেশ্যে কাগজ ফেলে রাখেন। আপনার বক্তব্য থেকে তা বোঝা যায় না। বরং আপনি চিন্তিত, তাই এটিই আপনার ইমানের ভালো লক্ষণ। তবে গুনাহ থেকে বাঁচতে চেষ্টা করা উচিত।
(আল-হিদায়া, ৪/৪৫০; শরহে মাআনিল আসার, ৩/২৪)
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ
- যদি কাগজটি অসম্মানের স্থানে পড়ে থাকে (যেমন রাস্তার মাঝখানে, ময়লার স্তূপে): এটি তোলা ওয়াজিব। না তোলা গুনাহ। ইমানের সমস্যা হবে না, তবে তওবা করা উচিত।
- যদি কাগজটি নিরাপদ স্থানে পড়ে থাকে (যেমন রাস্তার পাশে শুকনো জায়গায়): তোলা মুস্তাহাব। না তোলায় গুনাহ নেই, তবে সওয়াব কম হবে।
- নাপাকির আশঙ্কা থাকলে: গ্লাভস বা টিস্যু দিয়ে উঠিয়ে পরিষ্কার করে সম্মানজনক স্থানে রাখুন।
- মানুষের ভয়ে গোপনে তোলার চেষ্টা করুন।
- অলসতা না করে নিয়মিত চোখ রাখুন এবং উঠানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্র নামের সম্মান রক্ষার তাওফিক দান করুন।
সূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (১/৪৭৩) – পবিত্র নাম অপমান থেকে রক্ষার ওয়াজিব প্রসঙ্গে।
- ফতোয়া উসমানি (১/৫২২-৫২৩) – রাস্তায় পবিত্র কাগজপত্রের বিধান।
- ইমদাদুল ফতোয়া (৪/২১৭-২১৮) – নাপাকি ও অসম্মানের আশঙ্কায় করণীয়।
- বাহিশতি জেওর (২/৮২) – পবিত্র নাম লেখা কাগজের সম্মান ও নাপাকি মোকাবিলা।
- আল-হিদায়া (৪/৪৫০) – ইমান না থাকার শর্ত হিসেবে ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞা।