ইসলামিক অনলাইন মাদ্রাসার আলিম কোর্স ছেড়ে দেওয়ার পর আল্লাহ কি ক্ষমা করবেন?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 6098
Questioner: Adiba Binte Azad
Question Asked: 28 Sep 2026, 10:57 PM
Reviewed & Published: 29 Sep 2026, 04:50 AM
Views: 10
Tokens: 8,560
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ,,
আমার প্রশ্ন হয়েছে যে আমি ইসলামিক অনলাইন মাদ্রাসার মধ্যে আলিম কোর্স ভর্তি হয়েছিলাম। এক বছর করার পরে তৃতীয় সেমিস্টারে উঠার পর আমার বিয়ে হয়েছে । বিয়ের প্রথম দিকে এদিক-ওদিক যাওয়া প্লাস নতুন ফ্যামিলিতে গোপন বিষয়ে অনেক কিছু জানা যে বিষয়গুলো বিয়ের আগে জানতাম না। এইসব পারিবারিক বিষয় নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম নিজের মধ্যে অনেক হতাশা চলে আসছিল। এজন্য কয়েকদিন ক্লাস না করার কারণে কিছুই বুঝতে পারতেছিলেন না এরাবিকে। গ্রুপের মধ্যে গেলে দেখতাম অন্য আপুরা কত কিছু জানে কিন্তু আমি কিছু বুঝতাম না এজন্য পড়ার প্রতি আগ্রহ কমে গিয়েছিল ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলাম। সারাক্ষণ ওইটাই শুধু মাথায় আসতে ছিল আমি তো কিছুই পারি না সবাই পারে।পরবর্তীতে ড্রপ দেওয়ার চিন্তা মাথায় আসে। ভেবেছিলাম ছয় মাস ড্রপ দিয়ে তারপর থেকে পরের ব্যাচ থেকে শুরু করবো। পরবর্তীতে ড্রপ দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু দেয়ার পরে মাদ্রাসার অনেক আপুরা অনেক কথা বলল, বন্ধু তুমি বাঁচবে যে এটার গ্যারান্টি কি। উত্তর দেয়া উচিত হয়নি কোন ভাবে পরে পরীক্ষা দিতে তারপর পরবর্তীতে ঠিকভাবে পড়তে। কিন্তু আমার মাথায় এটা আসতে ছিল যে পাশ করে কি করবে যদি ঠিকভাবে না শিখতে পারি। এখন খুব ভয় হচ্ছে যে ইলম থেকে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে সরে আসছি। এখন যদি আমি মারা যাই আল্লাহ কি আমাকে মাফ করবে? খুব ভয় হচ্ছে। তাহলে ইচ্ছাকৃতভাবে ইলম থেকে সরে আসছি। কিন্তু আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নামাজ পড়ার চেষ্টা করি তারপরে অনলাইনে সিরাহ সিরিজ শুনি। সাহাবীদের জীবনে শুনি এগুলা শুনলে কি কোন সওয়াব হবে?

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার মনের অবস্থা বোঝা যাচ্ছে। আপনি দ্বীনি ইলম অর্জনের পথে ছিলেন, কিন্তু পারিবারিক ও মানসিক চাপে পড়ে ড্রপ দিয়েছেন এবং এখন ভয় পাচ্ছেন যে আপনি কি ইচ্ছাকৃতভাবে ইলম থেকে দূরে সরে গেলেন এবং আল্লাহ কি ক্ষমা করবেন। আসুন কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত জানি।


১. ইলম অর্জন কি ফরজ?

ইসলামে ইলম দুই প্রকার:

  • ফরজে আইন (ব্যক্তিগতভাবে অবশ্যই জানতে হবে): নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ, হালাল-হারাম, আকীদা ইত্যাদি মৌলিক বিষয়। এগুলো শেখা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ।
  • ফরজে কিফায়া (সমাজের কিছু লোক জানলেই যথেষ্ট): আলিম হওয়া, গভীর ফিকহ, তাফসীর, হাদীস ইত্যাদি। এটি প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফরজ নয়।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২: "العلم المفرض هو علم الحال" — অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্য ফরজ ইলম হলো নিজের অবস্থার ইলম (নামাজ, রোজা ইত্যাদি)।
  • ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৩০: আলিম হওয়া ফরজে কিফায়া।

২. আপনি কি ইচ্ছাকৃতভাবে ইলম থেকে দূরে সরে গেছেন?

আপনি লিখেছেন: "এখন খুব ভয় হচ্ছে যে ইলম থেকে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে সরে আসছি।"

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়:

  • আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে ইলমকে ঘৃণা করে ছাড়েননি। বরং আপনি ডিপ্রেশন, পারিবারিক চাপ, নতুন সংসারের দায়িত্ব, আরabic না বুঝতে পারার হতাশা — এইসব কারণে ড্রপ দিয়েছেন।
  • ইসলামে অসুস্থতা, মানসিক চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব — এগুলো শরীয়তসম্মত ওজর (বৈধ কারণ) হিসেবে গণ্য হয়।

হাদীস:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ" — "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যেসব কাজ তারা বাধ্য হয়ে করে, তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২০৪৩; সহীহ)

আপনার ক্ষেত্রে এটি "বাধ্য হয়ে" বা "অসুস্থতার কারণে" ছাড়ার অন্তর্ভুক্ত। তাই আপনি গুনাহগার নন, ইনশাআল্লাহ।


৩. আল্লাহ কি ক্ষমা করবেন?

কুরআন:

"قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ" — "বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩)

হাদীস:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ" — "প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুল করে, আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তারা যারা তাওবা করে।" (সুনানে তিরমিজী, হাদীস ২৪৯৯; হাসান)

আপনি যদি তাওবা করেন এবং নামাজ পড়েন, দ্বীন শিখতে চেষ্টা করেন — আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করবেন। তিনি الغفور الرحيم।


৪. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও সীরাহ শোনার সওয়াব

আপনি লিখেছেন: "আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার চেষ্টা করি তারপরে অনলাইনে সীরাহ সিরিজ শুনি। সাহাবীদের জীবনে শুনি এগুলা শুনলে কি কোন সওয়াব হবে?"

অবশ্যই সওয়াব হবে। এগুলো নেক আমল:

  1. নামাজ: এটি ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ। প্রত্যেক নামাজের আলাদা সওয়াব।

    • হাদীস: "الصَّلَاةُ نُورٌ" — "নামাজ হলো নূর।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৩)
  2. সীরাহ ও সাহাবীদের জীবনী শোনা: এটি ইলম অর্জনের একটি অংশ। হাদীস শোনা, সাহাবীদের জীবনী জানা — এগুলো ইমান বাড়ায় এবং সওয়াবের কাজ।

    • হাদীস: "مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَطْلُبُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ"
    • — "যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণে কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।"
    • (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৯৯)

    আপনি অনলাইনে সীরাহ শুনছেন — এটিও ইলম অন্বেষণের একটি পথ। ইনশাআল্লাহ সওয়াব পাবেন।

  3. নিয়ত ঠিক রাখা: আপনি যদি নিয়ত করেন যে "আমি এখন পারিবারিক দায়িত্বের কারণে ফরমাল কোর্স করতে পারছি না, কিন্তু দ্বীন শেখা চালিয়ে যাব" — তাহলে আপনি ইলম থেকে দূরে সরে যাননি, বরং ভিন্ন পথে ইলম অর্জন করছেন।


৫. আপনার করণীয়

১. তাওবা করুন: "আল্লাহুম্মা ইন্নি আতুবু ইলাইক" — আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। তিনি ক্ষমাশীল।

২. নামাজ চালিয়ে যান: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ অবশ্যই পড়ুন। এটি আপনার সবচেয়ে বড় অবলম্বন।

৩. ইলম শেখা চালিয়ে যান: ফরমাল কোর্স না করতে পারলেও অনলাইনে সীরাহ, হাদীস, ফিকহ শুনতে থাকুন। এটিও ইলম।

৪. নিজেকে দোষ দেবেন না: ডিপ্রেশন একটি রোগ। এটি আপনার দুর্বলতা নয়। আল্লাহ আপনার অবস্থা জানেন।

৫. পারিবারিক দায়িত্ব পালন করুন: স্বামীর সংসার, সন্তান (যদি থাকে) — এগুলোও ইবাদত, যদি নিয়ত ঠিক থাকে।

৬. ভবিষ্যতে সুযোগ এলে আবার শুরু করুন: যদি কখনো পরিবেশ অনুকূল হয়, আবার ইলম অর্জনের চেষ্টা করুন। দরজা বন্ধ নয়।

★ যেকোনো বৈধ পদ্ধতিতেই হোক,ফরজে আইন পরিমান ইলম অর্জন অবশ্যই করবেন।


৬. একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

আপনি লিখেছেন: "মাদ্রাসার অনেক আপুরা অনেক কথা বলল, বন্ধু তুমি বাঁচবে যে এটার গ্যারান্টি কি।"

এটি তাদের ভুল কথা। কারো বাঁচার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। তবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। আপনি যদি নামাজ পড়েন, তাওবা করেন, দ্বীন শেখার চেষ্টা করেন — ইনশাআল্লাহ আপনি বাঁচবেন এবং আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেন।

হাদীস:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ" — "নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দার তাওবা কবুল করেন যতক্ষণ না মৃত্যুর সময় গলার কাছে পৌঁছে যায়।" (সুনানে তিরমিজী, হাদীস ৩৫৩৭; হাসান)


উপসংহার

প্রিয় বোন, আপনি ইলম থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে সরে যাননি। আপনি অসুস্থতা, পারিবারিক চাপ ও মানসিক কষ্টের কারণে ড্রপ দিয়েছেন। এটি শরীয়তসম্মত ওজর। আপনি গুনাহগার নন, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ ক্ষমাশীল। আপনি নামাজ পড়ছেন, সীরাহ শুনছেন — এগুলো নেক আমল, সওয়াব পাবেন। নিরাশ হবেন না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া কুফর। আপনি তাওবা করুন, নামাজ চালিয়ে যান, ইলম শেখার চেষ্টা চালিয়ে যান। আল্লাহ আপনাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.