রুমে কেউ মোবাইলে ভিডিও দেখলে কুরআন পড়ার সওয়াব কম হবে কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5829
Questioner: Dilshat Kona
Question Asked: 22 Sep 2026, 08:06 PM
Reviewed & Published: 22 Sep 2026, 08:36 PM
Views: 27
Tokens: 4,294
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
১।রুমে কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও দেখছে বা ব্যবহার করছে আর অন্য একজন একই রুমে কুরআন পড়ছে, এক্ষেত্রে যে কুরআন পড়ছে তার কি কোনো সমস্যা হবে? সওয়াব কম পাবে?

২। আমাদের যৌথ পরিবার। আমার জা যদি আমাদের পরিবার নিয়ে কিছু বলে সেই কথা আমি আমার হাসবেন্ডকে বললে আমার কি গুনাহ হবে? এটা কি গিবত হবে? উনি যা বলেন তাই বলি বানিয়ে বা মিথ্যা কিছু না

Answer

উত্তর (ফতোয়া)

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:

প্রশ্ন ১: রুমে কেউ মোবাইলে ভিডিও দেখছে বা ব্যবহার করছে, আর অন্য একজন একই রুমে কুরআন পড়ছে — এতে কুরআন পড়া ব্যক্তির কোনো সমস্যা হবে কি? সওয়াব কম পাবে কি?

উত্তর: এ বিষয়ে ফিকহের মূলনীতি হলো—কুরআন তিলাওয়াতের সময় শ্রোতার মনোযোগ বিঘ্নিত হওয়া বা তিলাওয়াতের আদব রক্ষা না হওয়া নিন্দনীয়, তবে অন্য কারো মোবাইল ব্যবহার বা ভিডিও দেখার কারণে কুরআন পড়া ব্যক্তির সওয়াব কম হবে না, ইনশাআল্লাহ। কারণ সওয়াবের কম-বেশি নির্ভর করে তার নিজের ইখলাস, মনোযোগ ও আদবের উপর; অন্যের কর্মের উপর নয়।

তবে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:

১. যদি ভিডিওতে গান-বাজনা বা হারাম কিছু থাকে, তাহলে একই রুমে কুরআন পড়া এবং সেটি চলতে থাকা—উভয়ের জন্যই আদব পরিপন্থী। কুরআন তিলাওয়াতের সময় গান-বাজনা বা অশ্লীল ভিডিও চালু রাখা কুরআনের আদবের খেলাফ। এমতাবস্থায় কুরআন পড়া ব্যক্তির উচিত অন্য জায়গায় গিয়ে বা ভিডিও বন্ধ করতে বলে তিলাওয়াত করা।

২. যদি ভিডিওটি হালাল ও প্রয়োজনীয় হয় (যেমন শিক্ষামূলক, খবর, দাওয়াতি ভিডিও), তাহলে একই রুমে কুরআন পড়া ও অন্য ব্যক্তির মোবাইল ব্যবহার—এতে কুরআন পড়া ব্যক্তির সওয়াব কম হবে না। তবে উত্তম হলো—কুরআন তিলাওয়াতের সময় পরিবেশ শান্ত ও সম্মানজনক রাখা।

৩. হাদিসে এসেছে: হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন—"তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে নিজে কুরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২৭)

আর কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন—"যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পড়ে, সে একটি নেকি পায়; আর একটি নেকি দশটি নেকির সমান।" (তিরমিজি, হাদিস: ২৯১০)

সারকথা: অন্যের মোবাইল ব্যবহারের কারণে কুরআন পড়া ব্যক্তির সওয়াব কম হবে না। তবে যদি ভিডিওতে হারাম কিছু থাকে, তাহলে সেই পরিবেশে কুরআন পড়া আদবের খেলাফ; সেক্ষেত্রে স্থান পরিবর্তন করা বা ভিডিও বন্ধ করতে বলা উত্তম।


প্রশ্ন ২: যৌথ পরিবারে আমার জা (husband's brother's wife) যদি আমাদের পরিবার নিয়ে কিছু বলে, সেই কথা আমি আমার হাসবেন্ডকে বললে আমার কি গুনাহ হবে? এটা কি গিবত হবে? আমি বানিয়ে বা মিথ্যা কিছু বলি না, উনি যা বলেন তাই বলি।

উত্তর: গিবতের সংজ্ঞা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয়ই কিছু ধারণা গুনাহ। আর তোমরা গোয়েন্দাগিরি করো না এবং একে অন্যের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বরং তোমরা তা ঘৃণা করো।" (সূরা হুজুরাত: ১২)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) গিবতের সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন—"তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।" সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন—"যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সেই দোষটি সত্যিই থাকে?" তিনি বললেন—"যদি তা সত্য হয়, তবে তা-ই গিবত; আর যদি মিথ্যা হয়, তবে তা অপবাদ (বুহতান)।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯)

এখন আপনার প্রশ্নের বিধান:

১. যদি আপনার জা আপনার পরিবার সম্পর্কে এমন কথা বলে, যা আপনার পরিবারের সম্মান বা গোপনীয়তার সাথে সম্পর্কিত এবং তা শুনে আপনি আপনার স্বামীকে জানান—তাহলে দেখতে হবে উদ্দেশ্য কী:

  • যদি উদ্দেশ্য হয় সমাধান করা, পরামর্শ করা, বা পরিবারের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া (যেমন: জা পরিবারে বিভেদ সৃষ্টি করছে, কারো বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, বা এমন কথা বলছে যা জানা জরুরি), তাহলে স্বামীকে জানানো গিবত হবে না; বরং এটি নসিহত ও পরামর্শের অন্তর্ভুক্ত। কারণ শরিয়তে "গিবতের অনুমতি" আছে সেই সব ক্ষেত্রে যেখানে অন্যায় প্রতিরোধ, পরামর্শ, বা হক আদায়ের উদ্দেশ্য থাকে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃ: ৪০৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪, পৃ: ৩০০)

  • যদি উদ্দেশ্য হয় শুধু দোষ চর্চা করা, মনের জ্বালা মেটানো, বা স্বামীর কাছে জাকে ছোট করা—তাহলে তা গিবত হবে এবং গুনাহ হবে। এমনকি যদি কথাটি সত্য হয়, তবুও গিবত হবে।

২. আপনি যা বলছেন তা যদি সত্য হয় (বানিয়ে বা মিথ্যা কিছু না বলেন), তাহলেও গিবত হতে পারে। কারণ গিবতের সংজ্ঞাতেই বলা হয়েছে—"সত্য কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।" তাই সত্য হওয়া গিবতকে জায়েজ করে না; বরং সত্য হলে তা গিবত, আর মিথ্যা হলে তা অপবাদ—দুটোই গুনাহ।

৩. তবে ব্যতিক্রম: যদি আপনার জা আপনার পরিবারের বিরুদ্ধে এমন কিছু বলে বা করে, যা আপনার স্বামীর জানা জরুরি (যেমন: পরিবারে ফিতনা সৃষ্টি, কারো সম্মান নষ্টের চেষ্টা, সম্পদ বা হকের বিষয়ে অন্যায়), তাহলে স্বামীকে জানানো জায়েজ; বরং কখনো কখনো কর্তব্য। এমতাবস্থায় উদ্দেশ্য হবে সমাধান ও প্রতিরোধ, দোষ চর্চা নয়।

সারকথা:

  • যদি শুধু দোষ চর্চা বা মনের জ্বালা মেটানোর উদ্দেশ্যে স্বামীকে বলেন → গিবত, গুনাহ হবে।
  • যদি পরিবারের কল্যাণ, অন্যায় প্রতিরোধ, বা পরামর্শের উদ্দেশ্যে বলেন → গিবত হবে না, জায়েজ।
  • সত্য কথা বলা গিবতকে জায়েজ করে না; বরং সত্য হলে তা গিবত, মিথ্যা হলে অপবাদ।

পরামর্শ: স্বামীকে কিছু বলার আগে নিয়ত পরীক্ষা করুন—"আমি কি সমাধানের জন্য বলছি, নাকি দোষ চর্চার জন্য?" যদি সমাধানের জন্য হয়, তাহলে সংক্ষেপে, নির্দিষ্টভাবে, কারো সম্মান নষ্ট না করে বলুন। আর যদি শুধু মনের জ্বালা মেটানো হয়, তাহলে চুপ থাকাই উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।" (সূরা বাকারা: ২২২)


والله أعلم بالصواب

রেফারেন্স:

  • সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২৭
  • সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯
  • সূরা হুজুরাত: ১২
  • রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃ: ৪০৪
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪, পৃ: ৩০০
  • ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ৩, পৃ: ৪২৫

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.