ছোট বাচ্চাদের জামা-কাপড় পরিধান প্রসঙ্গে

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5797
Questioner: myselfsamiairin
Question Asked: 22 Sep 2026, 11:19 AM
Reviewed & Published: 22 Sep 2026, 12:05 PM
Views: 22
Tokens: 5,425
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার ৫ মাসের একটি কন্যা সন্তান আছে।বর্তমানে যে অবস্থা চলছে তাতে আমি আমার কন্যা সন্তানকে নিয়ে সর্বদাই সঙ্কিত থাকি।তাই সবসময় চেষ্টা করি আমার মেয়েকে নিজের কাছেই রাখতে এবং লজ্জার বিষয়টি মাথায় রেখে ওকে কখনোই খালি গায়ে রাখি না এবং ওর প্রস্রাব পায়খানা আমি নিজেই পরিষ্কার করি কাউকে দিয়ে করাই না।আমার শশুড়বাড়ির লোকজন গ্রামে থাকেন তারা এই বিষয়টি ভালো নজরে দেখেন না।তারা ছেলে মেয়ে সারাক্ষন উলঙ্গ অবস্থায় রেখে পালন করতে অভস্ত বিধায় তারা আমার কাজকে ধর্মীয় গোড়ামি বলে অভিহিত করেন এবং বলেন এখনি আমি মেয়েকে সারাক্ষণ জামা-কাপড় পড়িয়ে রেখে পর্দা করিয়ে ওর উপর জুলুম করছি।সারাক্ষণ কাপড় পরিধান করানোতে ও অসুস্থ হয়ে পড়েছে।এছাড়াও নানান ধরনের কটু কথাও শুনান।
আমার প্রশ্ন হল,আমার চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী আমি যা কিছু করছি তা কি সঠিক?এক্ষেত্রে ইসলাম কি বলে?

Answer

ছোট বাচ্চাদের জামা-কাপড় পরিধান প্রসঙ্গে

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

আপনার ৫ মাসের কন্যা সন্তান রয়েছে। আপনি তাকে সর্বদা জামা-কাপড় পরিধান করান, খালি গায়ে রাখেন না, নিজ হাতে প্রস্রাব-পায়খানা পরিষ্কার করেন। কিন্তু আপনার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা এটাকে ধর্মীয় গোড়ামি ও জুলুম বলে অভিহিত করেন এবং বলেন যে সারাক্ষণ কাপড় পরিধান করানোর কারণে বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আপনি জানতে চান—আপনার এই কাজ কি ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক?


ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

১. শিশুর সতর ঢেকে রাখা অভিভাবকের দায়িত্ব

ইসলামে শিশুর সতর ঢেকে রাখা এবং তাকে শালীনতা শিক্ষা দেওয়া অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যদিও নাবালেগ শিশুর ক্ষেত্রে সতরের বিধান প্রাপ্তবয়স্কদের মতো কঠোর নয়, তবে তাকে ছোটবেলা থেকেই শালীনতা ও পর্দার অভ্যাস করানো ইসলামের নির্দেশ।

হাদিস শরিফে এসেছে:

«مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ»

"তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের আদেশ দাও।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৫; মুসনাদে আহমাদ)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইসলামে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই দ্বীনি শিক্ষা ও অভ্যাস গড়ে তোলার নির্দেশ রয়েছে। অনুরূপভাবে শালীনতা ও পর্দার অভ্যাসও ছোটবেলা থেকেই করানো উচিত।

২. শিশুর যত্ন নেওয়া মায়ের দায়িত্ব ও সওয়াবের কাজ

আপনি নিজ হাতে সন্তানের প্রস্রাব-পায়খানা পরিষ্কার করেন—এটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ এবং মায়ের দায়িত্ব। ইসলামে সন্তানের পরিচর্যা করা ইবাদত হিসেবে গণ্য।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

«وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا»

"আর বলো, হে আমার রব! তাদের (পিতা-মাতার) প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৪)

৩. সন্তানের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা

বর্তমান সমাজে শিশু নির্যাতন ও অপরাধের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। সন্তানকে সুরক্ষিত রাখা অভিভাবকের দায়িত্ব। বিশেষ করে কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।

ফিকহের কিতাবে এসেছে:

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার» গ্রন্থে উল্লেখ করেন:

«وَيُؤْمَرُ الصَّبِيُّ بِالصَّلَاةِ لِسَبْعٍ وَيُضْرَبُ عَلَيْهَا لِعَشْرٍ، وَكَذَا يُؤْمَرُ بِالصَّوْمِ وَالطَّهَارَةِ وَتَرْكِ الْمُحَرَّمَاتِ»

"শিশুকে সাত বছর বয়সে নামাজের আদেশ দেওয়া হবে, দশ বছর বয়সে (না পড়লে) প্রহার করা হবে। অনুরূপভাবে তাকে রোজা, পবিত্রতা এবং হারাম বস্তু ত্যাগের আদেশ দেওয়া হবে।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৫২)

এই মূলনীতি থেকে প্রতীয়মান হয়—শিশুকে ছোটবেলা থেকেই ভালো অভ্যাস ও শালীনতার শিক্ষা দেওয়া ইসলামের নির্দেশ।

৪. বাচ্চার অসুস্থতার বিষয়টি

আপনি বলেছেন, সারাক্ষণ কাপড় পরিধান করানোর কারণে বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এখানে লক্ষণীয়:

  • যদি সত্যিই চিকিৎসাগতভাবে প্রমাণিত হয় যে অতিরিক্ত কাপড় বা গরমে বাচ্চার স্বাস্থ্যঝুঁকি হচ্ছে, তাহলে উপযুক্ত ও আরামদায়ক পোশাক পরিধান করানো যাবে—যা সতর ঢাকবে এবং স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি করবে না।
  • তবে শুধু "অসুস্থ হয়ে পড়েছে" বলার কারণে সতর ঢাকা ছেড়ে দেওয়া বা খালি গায়ে রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য নয়।
  • বাচ্চার জন্য আরামদায়ক, সুতি ও হালকা কাপড় ব্যবহার করুন—যা সতর ঢাকবে এবং গরমও লাগবে না।

৫. শ্বশুরবাড়ির লোকদের অভিযোগ প্রসঙ্গে

তারা আপনার কাজকে "ধর্মীয় গোড়ামি" ও "জুলুম" বলছে—এটি তাদের ভুল ধারণা। ইসলামে সন্তানকে শালীনতা ও পর্দার শিক্ষা দেওয়া গোড়ামি নয়; বরং এটি দ্বীনি দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:

«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا»

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।" — (সূরা তাহরীম: ৬)

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ এই আয়াতের তাফসীরে লেখেন:

"এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া এবং তাদেরকে হারাম ও গুনাহ থেকে বিরত রাখা পিতা-মাতার অবশ্য কর্তব্য।" — (মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ৩৬৭)


সিদ্ধান্ত

আপনার চিন্তা-ভাবনা ও কাজ ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক। আপনি যা করছেন তা হলো:

  1. সন্তানের সতর ঢেকে রাখা — এটি শালীনতার শিক্ষা, যা ইসলাম সমর্থন করে।
  2. নিজ হাতে পরিচর্যা করা — এটি মায়ের দায়িত্ব ও সওয়াবের কাজ।
  3. সন্তানকে সুরক্ষিত রাখা — এটি অভিভাবকের কর্তব্য।

তবে একটি বিষয়ে সতর্কতা: বাচ্চার স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখুন। যদি সত্যিই অতিরিক্ত কাপড়ে অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে হালকা, আরামদায়ক ও সুতি কাপড় ব্যবহার করুন—যা সতর ঢাকবে এবং স্বাস্থ্যের ক্ষতি করবে না। ইসলামে "ا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ" (ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতিগ্রস্তও করা যাবে না) — এই মূলনীতি প্রযোজ্য।

শ্বশুরবাড়ির লোকদের কথায় বিভ্রান্ত হবেন না। আপনার সন্তানের প্রতি আপনার এই যত্ন ও দ্বীনি দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখুন। আল্লাহ তাআলা আপনার সন্তানকে হেফাজত করুন এবং আপনার নেক কাজে বরকত দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.