নামাজে ইমামের পিছনে মাসবুক (ছুটে যাওয়া রাকাত) আদায়ের বিধান কি?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 5796
Questioner: Asad sarker
Question Asked: 22 Sep 2026, 11:01 AM
Reviewed & Published: 22 Sep 2026, 11:18 AM
Views: 13
Tokens: 6,554
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। যদি ইমামের পিছনে ৩ রাকাত বা ৪ রাকাত নামাজ গুলোতে, ১/২/৩ রাকাত মিছ হয়ে যায় তখন কিভাবে নামাজ আদায় করবো, বিশেষ করে ইমামের ২/৪ রাকাতের শ্বষ বৈঠকে কি করবো? বিভিন্ন কম্বিনেশন দিয়ে বুঝিয়ে দিন,পা্‌াপাশি সানা কখন পড়বো। পাশাপাশি যখন ইমাম চুপ করে সূরা পড়েন তখন আমি কি করবো নামাজে?
প্রত্যেক সুরার সময় আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ পড়তে হবে? আমি সুরা পড়ার সবয় বাংলা অর্থ মনে মনে ভাবি এটা কি ভুল? আমি নামাজের সুরা, তাসবিহ এমন ভাবে পড়ি যে আল্লাহ কে তা শুনাচ্ছি, আল্লাহ আমার সামনে এটা কি ভুল? কিন্তু সিজদাহ দিয়ে গিয়ে শিরকের ওয়াসওয়াসা আছে, মনে অনেক খারাপ চিন্তা ভাবনা আসে এক্ষেত্রে কি করবো? পাপ হয়ে যায়?

Answer

নামাজে ইমামের পিছনে মাসবুক (ছুটে যাওয়া রাকাত) আদায়ের বিধান ও সংশ্লিষ্ট মাসায়েল

উত্তর (ফতোয়া)

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد

ভূমিকা

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুমুখী। আমি ধাপে ধাপে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বিস্তারিত উত্তর দিচ্ছি।


১. মাসবুক কে? এবং তার নামাজের মূল নীতি

যে ব্যক্তি ইমামের সাথে প্রথম রাকাত (বা একাধিক রাকাত) পায়নি, তাকে মাসবুক বলা হয়।

মূল নীতি (হানাফি মাযহাব):

মাসবুক ইমামের সাথে যে রাকাত পায়, তা তার জন্য শেষ রাকাত হিসেবে গণ্য হবে। ইমাম সালাম ফেরানোর পর সে দাঁড়িয়ে ছুটে যাওয়া রাকাতগুলো একা আদায় করবে এবং প্রতিটি ছুটে যাওয়া রাকাতে সূরা ফাতিহা + সূরা পড়বে (যদি তা ফজরের ২য় রাকাত, মাগরিবের ৩য় রাকাত বা জুমার ২য় রাকাত না হয়)।

দলিল:

  • সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৩৬: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «فَمَا أَدْرَكْتُمْ فَصَلُّوا، وَمَا فَاتَكُمْ فَأَتِمُّوا» — "যা পেয়ে যাও তা আদায় করো, আর যা ছুটে গেছে তা পূর্ণ করো।"
  • আল-হিদায়া (১/৭০): "والمسبوق يقضي ما فاته، ويقرأ في كل ركعة يقضيها الفاتحة والسورة"

২. বিভিন্ন কম্বিনেশনে মাসবুকের নামাজ আদায়ের পদ্ধতি

🔹 কেস ১: ৩ রাকাত নামাজ (মাগরিব) — ১ রাকাত ছুটে গেছে

| ধাপ | করণীয় | |-----|--------| | ইমামের সাথে | ২য় ও ৩য় রাকাতে শরিক হলেন | | ইমামের সালামের পর | দাঁড়িয়ে ১ রাকাত আদায় করবেন | | ঐ রাকাতে | সূরা ফাতিহা + সূরা (সরবে) পড়বেন | | তারপর | তাশাহহুদ, দরুদ, দুআ, সালাম |

বিশেষ নোট: মাগরিবের ৩য় রাকাতে ইমাম যদি বৈঠকে বসেন (প্রথম বৈঠক), আপনি ইমামের সাথে সেই বৈঠকে শরিক হবেন এবং তাশাহহুদ পড়বেন। ইমাম সালাম ফেরানোর পর দাঁড়িয়ে বাকি ১ রাকাত আদায় করবেন।


🔹 কেস ২: ৪ রাকাত নামাজ (যোহর/আসর/ইশা) — ১ রাকাত ছুটে গেছে

| ধাপ | করণীয় | |-----|--------| | ইমামের সাথে | ২য়, ৩য়, ৪র্থ রাকাতে শরিক | | ইমামের সালামের পর | দাঁড়িয়ে ১ রাকাত আদায় | | ঐ রাকাতে | সূরা ফাতিহা + সূরা পড়বেন | | তারপর | তাশাহহুদ, দরুদ, দুআ, সালাম |


🔹 কেস ৩: ৪ রাকাত নামাজ — ২ রাকাত ছুটে গেছে

| ধাপ | করণীয় | |-----|--------| | ইমামের সাথে | ৩য় ও ৪র্থ রাকাতে শরিক | | ইমামের সালামের পর | দাঁড়িয়ে ২ রাকাত আদায় | | ১ম ছুটে যাওয়া রাকাতে | সূরা ফাতিহা + সূরা | | ২য় ছুটে যাওয়া রাকাতে | সূরা ফাতিহা + সূরা | | তারপর | তাশাহহুদ, দরুদ, দুআ, সালাম |

⚠️ গুরুত্বপূর্ণ: এখানে ২য় রাকাতে (আপনার জন্য যা শেষ রাকাত) বৈঠক করবেন তাশাহহুদের জন্য, তারপর ৩য় রাকাতে দাঁড়াবেন — কারণ আপনার মোট ৪ রাকাত পূর্ণ করতে হবে।


🔹 কেস ৪: ৪ রাকাত নামাজ — ৩ রাকাত ছুটে গেছে

| ধাপ | করণীয় | |-----|--------| | ইমামের সাথে | শুধু ৪র্থ রাকাতে শরিক | | ইমামের সালামের পর | দাঁড়িয়ে ৩ রাকাত আদায় | | ১ম রাকাতে | সূরা ফাতিহা + সূরা | | ২য় রাকাতে | সূরা ফাতিহা + সূরা | | ২য় রাকাতের পর | তাশাহহুদ (বৈঠক) | | ৩য় রাকাতে | সূরা ফাতিহা + সূরা | | তারপর | তাশাহহুদ, দরুদ, দুআ, সালাম |


🔹 কেস ৫: ৩ রাকাত নামাজ (মাগরিব) — ২ রাকাত ছুটে গেছে

| ধাপ | করণীয় | |-----|--------| | ইমামের সাথে | শুধু ৩য় রাকাতে শরিক | | ইমামের সালামের পর | দাঁড়িয়ে ২ রাকাত আদায় | | ১ম রাকাতে | সূরা ফাতিহা + সূরা | | ২য় রাকাতে | সূরা ফাতিহা + সূরা | | তারপর | তাশাহহুদ, দরুদ, দুআ, সালাম |


🔹 কেস ৬: ফজরের ২ রাকাত — ১ রাকাত ছুটে গেছে

| ধাপ | করণীয় | |-----|--------| | ইমামের সাথে | ২য় রাকাতে শরিক | | ইমামের সালামের পর | দাঁড়িয়ে ১ রাকাত আদায় | | ঐ রাকাতে | সূরা ফাতিহা + সূরা (সরবে) | | তারপর | তাশাহহুদ, দরুদ, দুআ, সালাম |


৩. ইমামের ২য়/৪র্থ রাকাতের বৈঠকে (প্রথম বৈঠক) মাসবুক কী করবে?

হানাফি মাযহাবের সঠিক মাসআলা:

মাসবুক ইমামের সাথে প্রথম বৈঠকে শরিক হলে তাশাহহুদ পড়বে। কিন্তু সে দরুদ ও দুআ মাসুরা পড়বে না। কারণ ঐ বৈঠক তার জন্য শেষ বৈঠক নয়।

দলিল:

  • রাদ্দুল মুহতার (২/৯৯): "والمسبوق إذا جلس مع الإمام في التشهد الأول يتشهد ولا يصلي على النبي ﷺ"
  • ফতোয়া আলমগিরি (১/৭৪)

ব্যাখ্যা:

  • যদি আপনি ইমামের ২য় রাকাতের বৈঠকে থাকেন (যেমন ৪ রাকাত নামাজে ২য় রাকাতের পর) → শুধু তাশাহহুদ পড়বেন, চুপ থাকবেন।
  • যদি আপনি ইমামের ৪র্থ রাকাতের বৈঠকে থাকেন (শেষ বৈঠক) → ইমামের সাথে তাশাহহুদ, দরুদ, দুআ পড়বেন, তারপর ইমামের সালামের পর দাঁড়াবেন।

৪. সানা (সুবহানাকাল্লাহুম্মা...) কখন পড়বেন?

মাসবুকের জন্য সানার বিধান:

| অবস্থা | সানা পড়ার বিধান | |--------|------------------| | ইমামের সাথে শরিক হওয়ার সময় ইমাম দাঁড়ানো অবস্থায় আছেন | সানা পড়বেন না, সরাসরি সূরা ফাতিহা পড়া শুরু করবেন (যদি ইমাম চুপ থাকেন) | | ইমাম রুকুতে আছেন | সরাসরি তাকবিরে তাহরিমা বলে রুকুতে যাবেন, সানা পড়বেন না | | ইমাম সিজদায় আছেন | তাকবির বলে সিজদায় যাবেন, সানা পড়বেন না | | ইমাম বৈঠকে আছেন | তাকবির বলে বৈঠকে শরিক হবেন, সানা পড়বেন না |

দলিল:

  • আল-হিদায়া (১/৭১): "المسبوق إذا أدرك الإمام في الركوع كبر وسجد، ولا يقرأ الثناء"
  • ফতোয়া উসমানি (১/৩২৭)

বিশেষ নোট: যদি ইমাম দাঁড়ানো অবস্থায় থাকেন এবং আপনি প্রথম রাকাত পেয়ে থাকেন (অর্থাৎ আপনি মাসবুক নন, মুক্তাদি), তাহলে সানা পড়বেন। কিন্তু মাসবুক হিসেবে শরিক হলে সানা পড়বেন না।

★যখন ইমাম চুপ করে সূরা পড়েন তখন আপনি চুপ থাকবেন।

প্রত্যেক সূরার আগে আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ার বিধান

| বিষয় | বিধান | |-------|-------| | আউযুবিল্লাহ | শুধু প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার আগে পড়বেন। পরের রাকাতগুলোতে পড়বেন না। | | বিসমিল্লাহ | প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার আগে পড়বেন। সূরা ফাতিহার পর অন্য সূরা পড়ার আগেও বিসমিল্লাহ পড়বেন (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)। |

দলিল:

  • কুরআন: «فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ» (সূরা নাহল: ৯৮) — এখানে "পড়া শুরু করলে" অর্থাৎ প্রথমে।
  • আল-হিদায়া (১/৬৬): "يأتي بالاستعاذة في الركعة الأولى، وبالبسملة في كل ركعة"
  • ফতোয়া উসমানি (১/৩০৫)

সারসংক্ষেপ:

  • ১ম রাকাত: আউযুবিল্লাহ + বিসমিল্লাহ + ফাতিহা + বিসমিল্লাহ + সূরা
  • ২য়/৩য়/৪র্থ রাকাত: বিসমিল্লাহ + ফাতিহা + বিসমিল্লাহ + সূরা

সূরার বাংলা অর্থ মনে মনে ভাবা — এটা কি ভুল?

উত্তর: এটা ভুল নয়, বরং এটি খুশু ও মনোযোগ বাড়ায়। তবে শর্ত হলো:

  1. জিহ্বা আরবিতে সূরা পড়বে
  2. মন বাংলা অর্থ অনুধাবন করবে
  3. এতে নামাজ বাতিল হবে না

দলিল:

  • কুরআন: «الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ» (সূরা মুমিনুন: ২) — "যারা নিজেদের নামাজে বিনয়ী"
  • ফতোয়া উসমানি (১/৩০৮): "ترجمة معاني القرآن في القلب لا تضر بالصلاة"

⚠️ সতর্কতা: যদি আপনি বাংলা অর্থ শব্দে শব্দে উচ্চারণ করেন (যেমন জিহ্বা দিয়ে বলেন), তাহলে নামাজ বাতিল হবে। শুধু মনে মনে ভাবা জায়েজ।


নামাজে সূরা/তাসবিহ এমনভাবে পড়া যেন আল্লাহ শুনছেন — এটা কি ভুল?

উত্তর: এটা ভুল নয়, বরং এটি ইহসানের অন্তর্ভুক্ত।

দলিল:

  • সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫০: জিব্রাইল (আ.) রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞাসা করলেন: "ইহসান কী?" তিনি বললেন: «أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ» — "আল্লাহকে এমনভাবে ইবাদত করো যেন তুমি তাকে দেখছো; যদি না দেখো, তবে (জেনো) তিনি তোমাকে দেখছেন।"

তবে খেয়াল রাখবেন:

  • সিররি নামাজে (যোহর/আসর) — শব্দ না করে মনে মনে পড়বেন
  • জাহরি নামাজে (ফজর/মাগরিব/ইশা) — ইমামের পিছনে চুপ থাকবেন, একা পড়লে শব্দ করে পড়বেন
  • নফল নামাজে — নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী শব্দ বা নিঃশব্দে পড়তে পারেন

৯. সিজদায় গিয়ে শিরকের ওয়াসওয়াসা ও খারাপ চিন্তা আসা — কী করবেন?

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়।

🔸 প্রথম কথা: এটি শিরক নয়, বরং শয়তানের ওয়াসওয়াসা

দলিল:

  • সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩২৭৬: এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলল: "আমি নামাজে এমন চিন্তা পাই যা আমি বলতে লজ্জিত।" তিনি বললেন: «ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ» — "এটি ঈমানের স্পষ্টতা।" (অর্থাৎ শয়তান তোমার ঈমান নষ্ট করতে চায়, কিন্তু তুমি তা ঘৃণা করছো — এটাই ঈমানের প্রমাণ)

🔸 করণীয়:

| করণীয় | বিধান | |--------|-------| | চিন্তাটিকে ঘৃণা করা | এটি ঈমানের আলামত | | আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া | "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" মনে মনে পড়া | | চিন্তাটিকে দমন না করা | জোর করে দমন করলে আরও আসবে | | নামাজ চালিয়ে যাওয়া | নামাজ ভাঙবেন না | | সিজদায় দুআ করা | "রাব্বি আউযুবিকা মিন শাররি মা ওয়াসওয়াসা বিহিশ শাইতান" | | নামাজ শেষে | আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়া |


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.