বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে স্টুডেন্ট ভিসায় দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়া কি ইসলামী দৃষ্টিতে জায়েয?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5795
Questioner: হোসাইন Islam
Question Asked: 22 Sep 2026, 09:48 AM
Reviewed & Published: 22 Sep 2026, 11:21 AM
Views: 30
Tokens: 5,899
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বর্তমানে বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনুযায়ী স্টুডেন্ট ভিসায় দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়া কি ঠিক হবে।আমার মনে শুধু ওয়াসওয়াসা দেয় কখন জানি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যায়,অহেতুক দেশ ছেড়ে জ্ঞান অর্জনের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া গিয়ে মরার কোনো দরকার নেই।।যেকোনো সময় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যেতে পারে।আমি সিদ্ধান্তহীনতায় আছি।আমি মনকে এটাই বুজাতে পারছিনা মৃত্যু যেখানে লেখা আছে সেখানেই হবে

Answer

স্টুডেন্ট ভিসায় দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়া: ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও ওয়াসওয়াসার সমাধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী জানতে চাচ্ছেন—বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে (যুদ্ধের আশঙ্কা, অস্থিরতা) স্টুডেন্ট ভিসায় দক্ষিণ কোরিয়া গিয়ে জ্ঞান অর্জন করা কি ঠিক হবে? তাঁর মনে ওয়াসওয়াসা আসে যে, যেকোনো সময় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যেতে পারে, ফলে অহেতুক দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে মরার দরকার নেই। তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় আছেন এবং মনে বোঝাতে পারছেন না যে, "মৃত্যু যেখানে লেখা আছে সেখানেই হবে।"


প্রথমে একটি মৌলিক বিষয়: মৃত্যু ও তাকদীর

আপনার শেষ কথাটিই সম্পূর্ণ সঠিক এবং ইসলামী আকীদার মূল ভিত্তি:

"মৃত্যু যেখানে লেখা আছে সেখানেই হবে।"

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

"প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।" — (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)

"যখন তাদের নির্ধারিত সময় আসবে, তখন তারা এক মুহূর্তও বিলম্ব করতে পারবে না, আর এক মুহূর্তও আগে বাড়াতে পারবে না।" — (সূরা আন-নাহল: ৬১)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা পাঁচটি বিষয় নির্ধারণ করেছেন—জন্ম, মৃত্যু, রিযিক, স্থান (কোথায় থাকবে) এবং দুর্ভাগ্য-সৌভাগ্য।" — (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৩৮২২; সহীহ ইবনে হিব্বান)

অর্থাৎ—

  • আপনি বাংলাদেশে থাকলে মৃত্যু আসবে না, আর কোরিয়ায় গেলে মৃত্যু আসবে—এটি ভুল ধারণা।
  • মৃত্যু নির্ধারিত সময়ে, নির্ধারিত স্থানেই হবে। দেশ ছাড়া বা না ছাড়ার সাথে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই।
  • তাই "বিদেশে গিয়ে মরার দরকার নেই" —এই যুক্তিটি ইসলামী দৃষ্টিতে ভিত্তিহীন।

দ্বিতীয়ত: ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) সম্পর্কে

আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন—এটি ওয়াসওয়াসা। ইসলামে ওয়াসওয়াসা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে বিভ্রান্ত করে।" — (সূরা আন-নিসা: ১১৯)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ওয়াসওয়াসা থেকে আশ্রয় চাইতে শিখিয়েছেন:

"আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পাঠ করুন এবং ওয়াসওয়াসাকে ভ্রুক্ষেপ করবেন না।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে বলেন:

"ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের প্রবেশদ্বার। এর চিকিৎসা হলো—এটি উপেক্ষা করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৪২)

হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ লিখেন:

"ওয়াসওয়াসা আসলে শয়তানের ধোঁকা। এর প্রতিকার হলো—আল্লাহর যিকির বেশি করা এবং ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়া।" — (বেহেশতী জেওর, ১ম খণ্ড)


তৃতীয়ত: বিদেশে গিয়ে দ্বীনি/দুনিয়াবী জ্ঞান অর্জনের হুকুম

ক) দ্বীনি ইলম অর্জনের জন্য সফর

ইসলামে দ্বীনি ইলম অর্জনের জন্য সফর করা সুন্নত ও সাওয়াবের কাজ। সাহাবায়ে কেরাম দ্বীন শেখার জন্য দূর-দূরান্তে সফর করতেন।

ইমাম বুখারী (রহ.) "সহীহ বুখারী"-তে একটি অধ্যায়ই রচনা করেছেন:

"بَابُ الرِّحْلَةِ فِي الْعِلْمِ" (ইলম অর্জনের জন্য সফরের অধ্যায়) — (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইলম)

খ) দুনিয়াবী ইলম (যেমন: ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিসিন, আইটি) অর্জনের হুকুম

দুনিয়াবী ইলম যদি শরীয়তসম্মত হয় এবং হালাল উপায়ে অর্জিত হয়, তবে তা অর্জন করা জায়েয। আর যদি সেই ইলম দ্বারা মুসলিম উম্মাহর খিদমত হয়, তবে তা সাওয়াবের কাজও হতে পারে।

ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী দা.বা.)-তে উল্লেখ আছে:

"দুনিয়াবী শিক্ষা অর্জনের জন্য বিদেশ গমন জায়েয, শর্ত হলো—সেখানে দ্বীনি পরিবেশ রক্ষা করা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং হালাল রুজি অর্জন করা।" — (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ৩, পৃ. ৪৫৬)


চতুর্থত: ভয় ও আশঙ্কার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া

ক) ইসলামে ভয় (খাওফ) কখনো কখনো স্বাভাবিক, কিন্তু তা যেন আমল থেকে বিরত না করে

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিত।" — (সূরা আলে ইমরান: ১০২)

কিন্তু এই ভয় হলো আল্লাহর ভয়, তাঁর অবাধ্যতার ভয়—দুনিয়ার যুদ্ধ-বিগ্রহের ভয় নয়।

খ) তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা) করা

"যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" — (সূরা আত-তালাক: ৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

"যদি তোমরা আল্লাহর উপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদেরকে পাখির মতো রিযিক দিতেন—সকালে খালি পেটে বের হয়, সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।" — (তিরমিযী, হাদীস নং ২৩৪৪; ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১৬৪)

অর্থাৎ— ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং আল্লাহর উপর ভরসা করে হালাল উপায়ে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া ইসলামের শিক্ষা।


পঞ্চমত: ফিকহী দৃষ্টিকোণ—বিদেশ গমনের শর্তাবলী

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী:

  1. দ্বীনি পরিবেশ রক্ষা: যদি বিদেশে গিয়ে দ্বীন পালনে বাধা সৃষ্টি হয় বা হারামে লিপ্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তবে সেখানে যাওয়া জায়েয নয়।
  2. হালাল রুজি: যে দেশে যাচ্ছেন, সেখানে হালাল উপায়ে উপার্জনের সুযোগ থাকতে হবে।
  3. মহিলাদের ক্ষেত্রে: মাহরাম ছাড়া বিদেশ গমন জায়েয নয় (যদি না নিরাপত্তা ও শরীয়তসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত হয়)।
  4. পিতামাতার অনুমতি: পিতামাতার অনুমতি নেওয়া জরুরি, বিশেষত যদি তারা আপনার সেবার মুখাপেক্ষী হন।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ বলেন:

"কোনো স্থানে গমনের অনুমতি তখনই আছে, যখন সেখানে দ্বীন ও জান-মালের নিরাপত্তা থাকবে।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ১২৩)

ফাতাওয়া আলমগীরিতে উল্লেখ আছে:

"মুসলিমের জন্য এমন দেশে গমন জায়েয নয়, যেখানে তার দ্বীন ও ঈমানের ক্ষতির আশঙ্কা আছে।" — (ফাতাওয়া আলমগীরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪৮)


ষষ্ঠত: আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর

প্রশ্ন: বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে স্টুডেন্ট ভিসায় দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়া কি ঠিক হবে?

উত্তর:

  1. যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হয়, তবে যাওয়া জায়েয ও বৈধ:

    • দক্ষিণ কোরিয়ায় আপনার দ্বীন পালনে কোনো বাধা নেই।
    • হালাল উপায়ে উপার্জনের সুযোগ আছে।
    • হারাম (যিনা, মদ, সুদ, ইত্যাদি) থেকে বেঁচে থাকার পরিবেশ আছে।
    • পিতামাতার অনুমতি আছে।
    • আপনার উদ্দেশ্য শুধু দুনিয়াবী স্বার্থ নয়, বরং ইলম অর্জন ও মুসলিম উম্মাহর খিদমত।
  2. যদি উপরোক্ত শর্তগুলোর কোনোটি না থাকে, তবে যাওয়া উচিত নয়।

  3. "তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যেতে পারে" —এই আশঙ্কার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া ইসলামী দৃষ্টিতে সঠিক নয়। কারণ:

    • ভবিষ্যতের অজানা বিষয় আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
    • মৃত্যু নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত স্থানেই হবে।
    • ভয় পেয়ে সুযোগ হারানো ইসলামের শিক্ষা নয়।
  4. আপনার মনে যে ওয়াসওয়াসা আসছে, তা শয়তানের কুমন্ত্রণা। এটি উপেক্ষা করুন এবং ইস্তিখারা করুন।


সপ্তমত: ইস্তিখারা করার পরামর্শ

সিদ্ধান্তহীনতায় থাকলে সালাতুল ইস্তিখারা পড়ুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

"তোমাদের কেউ কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে সে যেন দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে এবং এই দুআ পড়ে..." — (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১১৬৬)

ইস্তিখারার দুআ:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ...

এরপর মন যেদিকে ঝুঁকে, সেদিকে সিদ্ধান্ত নিন—এটাই সুন্নত পদ্ধতি।


অষ্টমত: বিশেষ পরামর্শ

  1. ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না। এটি শয়তানের প্রবেশদ্বার। বেশি বেশি আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ুন এবং "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" বলুন।

  2. আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন। ভয় নয়, ভরসা করুন।

  3. আপনার উদ্দেশ্য পরিষ্কার করুন। যদি শুধু দুনিয়ার স্বার্থে যান, তবে তা নয়। যদি ইলম অর্জন ও উম্মাহর খিদমতের নিয়তে যান, তবে তা সাওয়াবের কাজ।

  4. পিতামাতার সাথে পরামর্শ করুন। তাদের অনুমতি ও দুআ নিন।

  5. স্থানীয় বিশ্বস্ত আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন। আপনার ব্যক্তিগত অবস্থা তিনি ভালো জানেন।

  6. ভিসা, খরচ, থাকার ব্যবস্থা—সব দিক ভালোভাবে যাচাই করুন। অপ্রস্তুত অবস্থায় যাওয়া ঠিক নয়।


উপসংহার

সংক্ষেপে:

  • মৃত্যু আল্লাহর হাতে, দেশের হাতে নয়।
  • ভয় পেয়ে সুযোগ হারানো ইসলামের শিক্ষা নয়।
  • শর্ত পূরণ হলে দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়া জায়েয।
  • ওয়াসওয়াসা শয়তানের কুমন্ত্রণা—এটি উপেক্ষা করুন।
  • ইস্তিখারা করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।

"আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মবিধায়ক।" — (সূরা আল-আনফাল: ৪০)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.