স্বপ্ন
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
স্বপ্নে যুদ্ধ ও মিশাইল দেখার ব্যাখ্যা
প্রশ্ন: আমি স্বপ্নে দেখি যুদ্ধ হয়, প্রথমে আকাশের উপর দিয়ে মিশাইল যেতে দেখি, পরে মাটির পাশাপাশি, একটা একটা মিশাইল যখন আমার কাছাকাছি আসতেছিল, তখন আমি পাশ কাটিয়ে যেতেছিলাম বারবার। এর ব্যাখ্যা কী হতে পারে?
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد:
১. স্বপ্নের শরয়ি অবস্থান
ইসলামে স্বপ্নকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
الرُّؤْيَا ثَلَاثَةٌ: رُؤْيَا الصَّالِحَةُ بُشْرَى مِنَ اللهِ، وَرُؤْيَا تَحْزِينٌ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَرُؤْيَا مِمَّا يُحَدِّثُ بِهِ الرَّجُلُ نَفْسَهُ
"স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) নেক স্বপ্ন — যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) দুঃস্বপ্ন — যা শয়তানের পক্ষ থেকে দুশ্চিন্তা, (৩) মনোভাবাপন্ন স্বপ্ন — যা মানুষ নিজের মনের কথা থেকে দেখে।"
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২২৬৩; সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬৯৯০ (আবু হুরাইরা রা. থেকে)
সুতরাং প্রতিটি স্বপ্নের ব্যাখ্যা খোঁজা জরুরি নয়। বিশেষত যুদ্ধ, অস্ত্র, বিপদ ইত্যাদি স্বপ্ন সাধারণত শয়তানি ওয়াসওয়াসা অথবা দৈনন্দিন দুশ্চিন্তা ও মিডিয়ার প্রভাব থেকেই হয়ে থাকে।
২. যুদ্ধ ও মিশাইলের স্বপ্নের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা
আপনার স্বপ্নে কয়েকটি উপাদান আছে — যুদ্ধ, মিশাইল, আকাশ, মাটি, পাশ কাটিয়ে বেঁচে যাওয়া। এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা:
(ক) দুশ্চিন্তা ও ভয়ের প্রতিফলন: বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ-সংঘাত, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সংবাদ মিডিয়ায় সর্বক্ষণ দেখে মানুষ অবচেতন মনে ভীত হয়ে পড়ে। এই ভয়ই স্বপ্নে যুদ্ধ ও মিশাইল রূপে প্রকাশ পায়। ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.) বলেন, স্বপ্ন অনেক সময় মানুষের অন্তরের চিন্তা ও ভয়ের ছায়া হয়ে থাকে।
(খ) শয়তানের খেলা: দুঃস্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হয়, যাতে মুমিন দুশ্চিন্তায় পড়ে। রাসূল ﷺ দুঃস্বপ্ন দেখলে বাম দিকে থুতু ফেলতে, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে এবং পার্শ্ব পরিবর্তন করতে বলেছেন।
— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২২৬২
(গ) সতর্কতার ইঙ্গিত: কেউ কেউ এটিকে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার ইঙ্গিত বলেন — আপনি বারবার পাশ কাটিয়ে বেঁচে গেছেন, যা আল্লাহর হেফাজতের প্রতীক হতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যাখ্যা কাটা-ছেঁড়া অনুমান, শরয়ি দলিল নয়।
(ঘ) ভবিষ্যদ্বাণী নয়: স্বপ্ন কখনো কখনো ইশারা হতে পারে, কিন্তু তা কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। তাই স্বপ্ন দেখে আতঙ্কিত হওয়া বা বড় কোনো ঘটনার অপেক্ষা করা উচিত নয়।
৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে করণীয়
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ এবং মোল্লা আলী কারী (রহ.) «মিরকাত»-এ দুঃস্বপ্নের আদব বর্ণনা করেছেন:
১. দুঃস্বপ্ন দেখলে আউযুবিল্লাহ পড়া। ২. বাম দিকে তিনবার থুতু ফেলা (শুকনোভাবে)। ৩. পার্শ্ব পরিবর্তন করা। ৪. কারো কাছে বর্ণনা না করা (বিশেষত যাকে ভালোবাসেন না)। ৫. দুই রাকাত নামাজ পড়া ও আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা। ৬. আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমানো এবং ঘুমের আগে দুআ পড়া।
রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন: "তোমাদের কেউ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে যেন তিনবার বাম দিকে থুতু ফেলে এবং শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে; তাহলে তা তার কোনো ক্ষতি করবে না।" — সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২২৬২
৪. স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করা প্রসঙ্গে
স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করা জায়েয, তবে সব স্বপ্নের ব্যাখ্যা খোঁজা সুন্নত নয়। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, স্বপ্নের ব্যাখ্যা কেবল নবী-রাসূলদের ইলমের অংশ ছিল; সাধারণ মানুষের জন্য এ নিয়ে মাথা ঘামানো অনুচিত। মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ ইউসুফ (আ.)-এর স্বপ্নের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, স্বপ্নের তাবীর একটি বিশেষ ইলম, যা সবাই জানে না এবং এর উপর দ্বীন-দুনিয়ার ফায়সালা নির্ভর করে না।
৫. সারসংক্ষেপ ও উপদেশ
- আপনার স্বপ্নটি সাধারণত দুশ্চিন্তা বা শয়তানি ওয়াসওয়াসার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
- এটি কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়; ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
- দুঃস্বপ্নের সুন্নতি আদবগুলো পালন করুন।
- নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, সকাল-সন্ধ্যার আযকার পড়ুন — অন্তর প্রশান্ত হবে ইনশাআল্লাহ।
- স্বপ্ন নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করবেন না; আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
والله أعلم بالصواب