মাদ্রাসার পড়াশোনা৷ নিয়ে

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5764
Questioner: Mariam
Question Asked: 21 Sep 2026, 03:10 PM
Reviewed & Published: 21 Sep 2026, 03:35 PM
Views: 22
Tokens: 6,456
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমি জেনারেল থেকে এসে কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিলাম ৫ম জামাতে।এখন আমি কুদুরি জামাতে পড়ি,
কিন্তু আমি আমার নিজের গাফেলতির জন্য ৫ম, মিযান,নাহবেমীর ভালো করে পড়ি নি,অনেক কিছু শিখার বাকি রয়ে গিয়েছে।
আমি এই বছর রমজানের পর কুদুরি জামাতে ভর্তি হয়েছিলাম, কিন্তু নিজের গাফেলতির জন্য আমি ৫ মাস ক্লাস করি নি,মানে শুরু থেকে কিছুই পড়ি নি আমি।

এখন আবার মাদ্রাসায় যেতে চাই,কুদুরিই পড়তে চাই,কিন্তু আমার পরিক্ষা শুরু সামনে মাসের ৮ তারিখ থেকে!
এখন আমি সবকিছু কাভার দিব?আমার এত পড়া গ্যাপ রয়ে গিয়েছে,কীভাবে সবকিছু শেষ করব আমি?
দয়াকরে আমায় পরামর্শ দিবেন,,আমার নিজের অনেক গাফেলতি আছে,বার বার মাদ্রাসার পড়াশোনা ছেড়ে দেই,পরে অনেক গাফেল হয়ে যাই আমি।
আমি কীভাবে এই কুদুরি জামাত থেকেই সব ঠিকভাবে পড়াশোনা করতে পারি?
এদিকে আমার আম্মা অসুস্থ থাকেন

Answer

মাদ্রাসার পড়াশোনা ও গাফেলতি থেকে উত্তরণের উপায়

উত্তর (সংক্ষিপ্ত):

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার আন্তরিকতা ও আত্মসমালোচনা প্রশংসনীয়। আপনি নিজের গাফেলতি স্বীকার করেছেন এবং সংশোধনের ইচ্ছা পোষণ করেছেন—এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওবার তাওফিক। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত পরামর্শ দেওয়া হলো।


১. প্রথমে তাওবা ও দৃঢ় সংকল্প

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَن تَابَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَإِنَّهُ يَتُوبُ إِلَى اللَّهِ مَتَابًا "যে তাওবা করে এবং সৎকর্ম করে, নিশ্চয়ই সে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে।" (সূরা আল-ফুরকান: ৭১)

আপনার অতীতের গাফেলতির জন্য আন্তরিক তাওবা করুন। ইলম অর্জন ইবাদত—এটি ছেড়ে দেওয়া ছিল শয়তানের ধোঁকা। এখন থেকে দৃঢ় সংকল্প করুন: "আর কখনো মাদ্রাসার পড়া ছাড়ব না।"


২. ইলম অর্জনের ফজিলত ও গুরুত্ব

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ أَرَادَ الدُّنْيَا فَعَلَيْهِ بِالْعِلْمِ، وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ فَعَلَيْهِ بِالْعِلْمِ، وَمَنْ أَرَادَهُمَا فَعَلَيْهِ بِالْعِلْمِ "যে দুনিয়া চায়, তার জন্য ইলম অপরিহার্য; যে আখিরাত চায়, তার জন্য ইলম অপরিহার্য; আর যে উভয়ই চায়, তার জন্যও ইলম অপরিহার্য।" (শরহু মুশকিলিল আছার, ইমাম তাহাবি; মিশকাতুল মাসাবিহ: ২৪১)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন:

"ইলম ছাড়া ইবাদতের কোনো মূল্য নেই, আর ইলম ছাড়া ফিকহ বোঝা যায় না।" (তারিখে বাগদাদ)


৩. বাস্তব পরামর্শ: পরীক্ষার প্রস্তুতি ও পড়া কাভার করা

ক) পরীক্ষার আগে করণীয় (৮ তারিখ থেকে পরীক্ষা):

১. আতঙ্কিত হবেন না—আতঙ্ক মস্তিষ্ককে অচল করে দেয়। শান্ত হয়ে বসুন। ২. প্রায়োরিটি নির্ধারণ করুন—কুদুরি জামাতের মূল কিতাবগুলো:

  • কুদুরি (ফিকহ)
  • মিযানুস সরফ (সরফ)
  • নাহবেমীর (নাহু)
  • নূরুল ইদাহ (ফিকহ)
  • হেদায়াতুন নাহু (নাহু)

৩. যা পড়া হয়নি, তা সংক্ষেপে বুঝে নিন—সম্পূর্ণ কিতাব মুখস্থ না করে মূল মাসআলাগুলো বুঝুন। ফিকহের ক্ষেত্রে মাসআলা ও দলিল বুঝুন, সরফ-নাহুর ক্ষেত্রে কায়দা ও উদাহরণ বুঝুন।

৪. দৈনিক রুটিন তৈরি করুন—যেমন:

  • ফজরের পর: ২ ঘণ্টা (নাহু/সরফ)
  • যোহরের পর: ২ ঘণ্টা (ফিকহ)
  • আসরের পর: ২ ঘণ্টা (রিভিশন)
  • মাগরিবের পর: ১ ঘণ্টা (মুখস্থ)
  • এশার পর: ১ ঘণ্টা (লেখা/অনুশীলন)

৫. শিক্ষকের সাহায্য নিন—আপনার মাদ্রাসার মুহতামিম বা উস্তাদকে বলুন আপনার অবস্থা। তারা সংক্ষিপ্ত সিলেবাস বা বিশেষ ক্লাস দিতে পারেন।

৬. পুরনো ছাত্রদের নোট নিন—যারা আগে কুদুরি পড়েছে, তাদের নোট ও সহায়তা নিন।

খ) পরীক্ষার পর করণীয়:

১. কুদুরি জামাতেই থাকুন—আপনি যদি কুদুরি জামাতের মূল কিতাবগুলো ভালোভাবে না পড়ে থাকেন, তবে পরের জামাতে (মিশকাত) যাওয়া ঠিক হবে না। বরং কুদুরি জামাত পুনরায় পড়ুন বা মূল কিতাবগুলো ভালোভাবে শেষ করুন।

২. দুর্বল বিষয়গুলো চিহ্নিত করুন—মিযান, নাহবেমীর, কুদুরি—যেটি দুর্বল, সেটি আলাদা সময়ে পড়ুন।

৩. প্রতিদিন নিয়মিত পড়ুন—দিনে অন্তত ৬-৮ ঘণ্টা। অল্প অল্প করে প্রতিদিন।


৪. বারবার পড়া ছেড়ে দেওয়ার সমাধান

ক) শয়তানের ধোঁকা চিনুন:

শয়তান আপনাকে বলে: "তুমি অনেক পিছিয়ে পড়েছ, আর পারবে না।" এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। আল্লাহ বলেন:

إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا "নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু, সুতরাং তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ কর।" (সূরা ফাতির: ৬)

খ) আমলের মাধ্যমে ইলমকে দৃঢ় করুন:

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেছেন:

"ইলম নূর, আর নূর গুনাহের মাধ্যমে হারিয়ে যায়।" (দিওয়ানুশ শাফেয়ি)

তাই:

  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করুন (মহিলাদের জন্য সময়মতো)।
  • কুরআন তিলাওয়াত প্রতিদিন অন্তত ১ পারা।
  • দরুদ শরিফ বেশি পড়ুন।
  • ইস্তিগফার বেশি করুন—বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যা ১০০ বার।

গ) অভ্যাস পরিবর্তনের কৌশল:

১. ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন—আজ ১ ঘণ্টা পড়ব, কাল ২ ঘণ্টা। ২. পড়ার পরিবেশ তৈরি করুন—মোবাইল দূরে রাখুন, শান্ত জায়গায় বসুন। ৩. নিজেকে পুরস্কার দিন—লক্ষ্য পূরণ হলে নিজেকে উৎসাহিত করুন। ৪. সাথী বানান—একজন নিয়মিত সহপাঠীর সাথে পড়ুন। ৫. প্রতিদিন ডায়েরি লিখুন—কতটুকু পড়লেন, কী বুঝলেন।


৫. আম্মার অসুস্থতার বিষয়টি

আপনার আম্মা অসুস্থ—এটি আপনার জন্য বড় পরীক্ষা। ইসলামে মায়ের সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

الْجَنَّةُ تَحْتَ أَقْدَامِ الْأُمَّهَاتِ "জান্নাত মায়ের পদতলে।" (সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ৩১০৪; মিশকাত: ৪৯৩৯)

তবে ইলম অর্জনও ফরজে কিফায়া। উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখুন:

  • আম্মার সেবা করুন—সময়মতো ঔষধ, খাবার, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া।
  • পড়ার সময় নির্ধারণ করুন—আম্মার ঘুমের সময় বা বিশ্রামের সময় পড়ুন।
  • আম্মার কাছে দুআ চান—তিনি দুআ করলে আল্লাহ কবুল করেন।
  • প্রয়োজনে মাদ্রাসার আবাসিক থাকুন—যদি আম্মার সেবার জন্য বাড়িতে থাকা জরুরি হয়, তবে বাড়ি থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যান। মাদ্রাসার সাথে যোগাযোগ রাখুন।

৬. ফিকহি দৃষ্টিকোণ: ইলম অর্জন কি ফরজ?

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফি ফিকহ অনুযায়ী:

  • ফরজে আইন: প্রত্যেক মুসলিমের জন্য প্রয়োজনীয় ইলম—আকিদা, নামাজ, রোজা, হালাল-হারাম।
  • ফরজে কিফায়া: গভীর ইলম—ফিকহ, হাদীস, তাফসির। যদি কোনো এলাকায় আলেম না থাকে, সবার উপর দায়িত্ব।

আপনি যেহেতু মাদ্রাসায় পড়ছেন, এটি ফরজে কিফায়ার অন্তর্ভুক্ত। এটি ছেড়ে দেওয়া জায়েজ নয়, যদি না কোনো শরয়ি ওজর থাকে।

রাদ্দুল মুহতার-এ আছে: "ইলম অর্জন করা ফরজে কিফায়া, আর প্রয়োজনীয় ইলম ফরজে আইন।" (রাদ্দুল মুহতার: ১/৩৭)


৭. চূড়ান্ত পরামর্শ

| বিষয় | করণীয় | |------|--------| | তাওবা | আন্তরিক তাওবা করুন, ইস্তিগফার বাড়ান | | পরীক্ষা | আতঙ্ক নয়, প্রায়োরিটি ঠিক করুন, শিক্ষকের সাহায্য নিন | | পড়া | দৈনিক রুটিন, ছোট লক্ষ্য, নিয়মিত রিভিশন | | গাফেলতি | শয়তানের ধোঁকা চিনুন, আমল বাড়ান, সাথী বানান | | আম্মা | সেবা করুন, দুআ চান, ভারসাম্য রাখুন | | ভবিষ্যৎ | কুদুরি জামাত পুনরায় বা ভালোভাবে শেষ করুন |

মনে রাখবেন: ইলম অর্জন একটি সফর। আপনি পিছিয়ে পড়েছেন—এটি সত্য, কিন্তু আল্লাহর রহমতে আপনি এখনো সময়মতো ফিরে এসেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ إِذَا عَمِلَ أَحَدُكُمْ عَمَلًا أَنْ يُتْقِنَهُ "আল্লাহ পছন্দ করেন যে, যখন তোমরা কোনো কাজ করো, তা সুন্দরভাবে করো।" (তাবারানি, মুজামুল আওসাত)

আল্লাহ আপনার ইলমকে বরকত দান করুন, আম্মাকে সুস্থতা দান করুন, এবং আপনাকে ইলমের পথে অবিচল রাখুন। আমিন।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।

রেফারেন্স:

  • কুরআনুল কারিম
  • সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
  • শরহু মুশকিলিল আছার (ইমাম তাহাবি)
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন)
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি)
  • মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফি)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.