শুধু ভয় বা লেবার পেইন সহ্য করতে না পারার কারণে স্বেচ্ছায় সিজার করানো যাবে কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5746
Questioner: Faria Islam
Question Asked: 21 Sep 2026, 02:48 AM
Reviewed & Published: 21 Sep 2026, 05:40 AM
Views: 6
Tokens: 3,809
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
আমি শারীরিক ভাবে তেমন স্ট্রং না। লেবার পেইন নেওয়ার মতো ধর্য্য ক্ষমতা আমার নেই, ইচ্ছাও নেই। আমি স্বেচ্ছা সিজার করাতে চাই, এটা কি জায়েজ হবে?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
শুধু “ইচ্ছা নেই” বা “স্বেচ্ছায় সিজার করতে চাই”—এই কারণে সিজার করা জায়েজ নয়। তবে যদি অভিজ্ঞ মুসলিম ডাক্তার/বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন যে স্বাভাবিক প্রসব মা বা সন্তানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, অথবা স্বাভাবিক প্রসব কষ্ট/ক্ষতির কারণ হবে, তখন প্রয়োজনবশত সিজার করা জায়েজ; বরং অনেক সময় কর্তব্য। আর নিছক ভয়, ধৈর্য না থাকা বা লেবার পেইন সহ্য করার ইচ্ছা না থাকা—এসব কারণে অকারণে সিজার করানো ইসলামে অনুমোদিত নয়।


বিস্তারিত দলিল ও আলোচনা

ইসলামে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার মূলত প্রয়োজনের ভিত্তিতে বৈধ। শরীয়তের একটি মূলনীতি হলো:

الضرورة تبيح المحظورات
“প্রয়োজন নিষিদ্ধ বস্তুকে বৈধ করে।”
(আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবন নুজাইম)

আরেকটি মূলনীতি:

لا ضرر ولا ضرار
“ক্ষতি করা যাবে না, ক্ষতির সম্মুখীন হওয়াও যাবে না।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০)

সিজার একটি বড় অস্ত্রোপচার। এতে মায়ের পেট কাটা হয়, রক্তপাত হয়, সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে, পরবর্তী গর্ভধারণে জটিলতা হতে পারে। তাই বিনা প্রয়োজন এটি করানো শরীয়তসম্মত নয়।


১. কখন সিজার জায়েজ?

যখন অভিজ্ঞ ডাক্তার বলেন:

  • স্বাভাবিক প্রসব মায়ের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ;
  • সন্তানের জীবনের ঝুঁকি আছে;
  • প্লাসেন্টা নিচে থাকা, বিলম্বিত প্রসব, নাভির দড়ি গলায় পেঁচানো, পেলভিস সংকীর্ণ, আগের সিজারের জটিলতা ইত্যাদি;
  • স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব নয় বা অতিরিক্ত দেরি হলে মা/সন্তানের ক্ষতি হবে;

তখন সিজার করা জায়েজ, বরং জীবন রক্ষার জন্য কর্তব্য।

দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
“তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।”
(সূরা আল-বাকারা: ১৯৫)

আরও বলেন:

فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ
“যে ব্যক্তি বাধ্য হয়, অথচ অন্যায়কারী বা সীমালঙ্ঘনকারী নয়, তার কোনো গুনাহ নেই।”
(সূরা আল-বাকারা: ১৭৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً
“তোমরা চিকিৎসা করাও; আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিকার/ঔষধ তিনি সৃষ্টি করেননি।”
(সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫৫; সুনানে তিরমিজি: ২০৩৮)

ইমাম ইবন আবিদিন রহ. লিখেন, চিকিৎসার জন্য অস্ত্রোপচার করা প্রয়োজন হলে তা বৈধ।
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৫-৩৬৬)


২. শুধু কষ্ট/ভয়/ধৈর্য না থাকার কারণে সিজার?

এটি জায়েজ নয়। কারণ:

  • গর্ভধারণ ও প্রসবের কষ্ট আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া;
  • কষ্টের কারণে সন্তান জন্মদান থেকে পলায়ন করা ইসলামের শিক্ষা নয়;
  • নিছক আরাম বা ভয়ের কারণে শরীরে অস্ত্রোপচার করা আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো ঝুঁকি;
  • ডাক্তারি কারণ ছাড়া সিজার করলে মা ও সন্তানের জন্য ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ
“হয়তো তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।”
(সূরা আল-বাকারা: ২১৬)

মা-বাবার প্রতি সন্তানের জন্মদান কষ্টসহকারে হলেও তা মহান সাওয়াব ও আল্লাহর রহমতের কারণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, সন্তান প্রসবের কষ্ট ও ক্লেশ মায়ের গুনাহ মোচনের কারণ হতে পারে।
(মুসলিম: ২৫৮৮-এর আলোচনা; মা’আরিফুল কুরআন, সূরা লুকমান: ১৪-এর ব্যাখ্যা)


৩. হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত

হানাফি ফিকহে চিকিৎসার জন্য অস্ত্রোপচার বৈধ, তবে শর্ত হলো:

  1. অভিজ্ঞ মুসলিম ডাক্তার বা নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ;
  2. প্রকৃত প্রয়োজন বা ঝুঁকি থাকা;
  3. জীবন রক্ষা বা বড় ক্ষতি প্রতিরোধের উদ্দেশ্য;
  4. শুধু আরাম, ভয় বা ইচ্ছার বশে না হওয়া।

ফাতাওয়া উসমানি-তে বলা হয়েছে, প্রয়োজন ছাড়া সিজার করানো ঠিক নয়; তবে মা বা সন্তানের জীবন ঝুঁকিতে থাকলে সিজার জায়েজ।
(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪৯৫-৪৯৭)

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তেও এসেছে, চিকিৎসকের পরামর্শে জীবন রক্ষার জন্য অস্ত্রোপচার করা জায়েজ।
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৫৪)

বাহিশতী যেওর-এ হযরত আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন, চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হলে তা করা যায়; কিন্তু বিনা প্রয়োজনে শরীরে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
(বাহিশতী যেওর, চিকিৎসা অধ্যায়)


৪. আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর

আপনি লিখেছেন:

“আমি শারীরিকভাবে তেমন স্ট্রং না। লেবার পেইন নেওয়ার মতো ধৈর্য ক্ষমতা আমার নেই, ইচ্ছাও নেই। আমি স্বেচ্ছায় সিজার করাতে চাই।”

এ অবস্থায়:

  • যদি ডাক্তারি পরীক্ষায় প্রমাণ হয় যে আপনার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক প্রসবের জন্য উপযোগী নয়, অথবা স্বাভাবিক প্রসব আপনার বা সন্তানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ—তাহলে সিজার জায়েজ।
  • আর যদি ডাক্তারি কোনো বাধা না থাকে, শুধু কষ্টের ভয়ে বা ইচ্ছা না থাকার কারণে সিজার করতে চান—তাহলে এটি জায়েজ নয়।
  • সন্তান জন্মদানের কষ্টকে আল্লাহর কাছে সাওয়াবের আশায় ধৈর্য ধারণ করা উচিত। আল্লাহ কষ্টের সঙ্গে সহজও দেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
“নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে; নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে।”
(সূরা আশ-শারহ: ৫-৬)


পরামর্শ

  1. অভিজ্ঞ মুসলিম স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
  2. ডাক্তার যদি সিজারের প্রয়োজন বলেন, তাহলে দ্বিধা করবেন না; এটি শরীয়তসম্মত।
  3. ডাক্তার যদি স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব বলেন, তাহলে আল্লাহর উপর ভরসা করে ধৈর্য ধরুন।
  4. বেশি দুশ্চিন্তা করবেন না; আল্লাহ মায়েদের জন্য প্রসবের কষ্টে বিশেষ রহমত ও সাওয়াব রেখেছেন।
  5. সম্ভব হলে অভিজ্ঞ আলেম/মুফতির কাছ থেকে আপনার নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থা জানিয়ে ফতোয়া নিন।

উপসংহার:
প্রকৃত চিকিৎসা-প্রয়োজন ছাড়া শুধু ভয়, কষ্ট বা ইচ্ছার কারণে সিজার করানো জায়েজ নয়। তবে মা বা সন্তানের জীবন/স্বাস্থ্যের ঝুঁকি থাকলে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে সিজার করা জায়েজ ও প্রয়োজনীয়।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.