স্বপ্নে কারো খুন করলে কি হয়?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
স্বপ্নে কাউকে খুন করার বিধান ও করণীয়
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
স্বপ্নে কেউ উস্কানি দিলে আমি অন্য একজনকে (যিনি আমার খুব কাছের) খুন করছি — এর শরয়ী বিধান কী? এবং সেই ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক রাখা উচিত কি না?
১. স্বপ্নে খুন করা কি বাস্তব খুন হিসেবে গণ্য?
উত্তর: না। স্বপ্নে কাউকে হত্যা করা বাস্তব হত্যা (কতল) হিসেবে গণ্য নয়। এর জন্য কোনো কিসাস, দিয়াত, কাফফারা বা গুনাহ নেই।
দলিল:
কুরআন:
«لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا» "আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
হাদিস:
«رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ...» "তিন ব্যক্তির আমলনামা লেখা হয় না: ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগে..." (সুনানে আবু দাউদ: ৪৪০৩, তিরমিজি: ১৪২৩)
স্বপ্ন হলো নafs-এর কল্পনা বা শয়তানের খেলা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالْحُلْمُ مِنَ الشَّيْطَانِ» "সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর অশুভ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।" (বুখারি: ৬৯৮৭)
ফিকহি মূলনীতি (ইবনে আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার):
"النَّائِمُ لَا قَلَمَ عَلَيْهِ" — ঘুমন্ত ব্যক্তির উপর কোনো দায়িত্ব নেই।
সুতরাং স্বপ্নে খুন করা কোনো বাস্তব হত্যা নয়, কোনো কাফফারা বা দিয়াতও ওয়াজিব নয়।
২. তবে কি সম্পূর্ণ নিরাপদ? — একটি সতর্কতা
যদিও স্বপ্নের জন্য কোনো শরয়ী শাস্তি নেই, তবে স্বপ্নে বারবার এমন দৃশ্য দেখা কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ:
- শয়তানের ওয়াসওয়াসা হতে পারে — যা অন্তরে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে।
- নafs-এর দুর্বলতা — কারো প্রতি গোপন রাগ বা হিংসা থাকলে তা স্বপ্নে প্রকাশ পায়।
- বদনজর বা জিনের প্রভাব — কিছু ক্ষেত্রে।
করণীয়:
- স্বপ্ন দেখে ভয় পাবেন না, কারো সাথে শেয়ার করবেন না (বিশেষত যার বিরুদ্ধে স্বপ্ন দেখেছেন)।
- বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলুন (শুকনো)।
- আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম পড়ুন।
- শয়তানের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান।
- সম্ভব হলে অজু করে অন্য কাত হয়ে শুয়ে পড়ুন।
হাদিস: «إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يَكْرَهُهَا فَلْيَبْصُقْ عَنْ يَسَارِهِ ثَلَاثًا، وَلْيَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ...» (মুসলিম: ২২৬২)
৩. যার সাথে স্বপ্নে খুন করেছেন — তার সাথে সম্পর্ক রাখা কি জায়েয?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই সম্পর্ক রাখা জায়েয, বরং কর্তব্য।
কারণ:
- আপনি বাস্তবে তাকে কোনো ক্ষতি করেননি।
- স্বপ্নের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ» (বুখারি: ৬০৭৭)
করণীয়:
- তার সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখুন।
- স্বপ্নের কথা তাকে বলবেন না — এতে অকারণ সন্দেহ ও মনোমালিন্য সৃষ্টি হবে।
- তার জন্য দুআ করুন।
- যদি অন্তরে তার প্রতি কোনো গোপন রাগ/হিংসা থাকে, তা দূর করুন — এটাই স্বপ্নের মূল কারণ হতে পারে।
- সদকা করুন (যেমন: অল্প কিছু টাকা গরিবকে) — এটি বালা-মুসিবত দূর করে।
- বেশি বেশি ইস্তিগফার ও কুরআন তিলাওয়াত করুন।
৪. যদি স্বপ্নে খুন করার পর অন্তরে অপরাধবোধ থাকে?
এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। মনে রাখবেন:
- ঘুমন্ত অবস্থায় আপনি মুকাল্লাফ (দায়িত্বপ্রাপ্ত) নন।
- আল্লাহ তাআলা স্বপ্নের জন্য জবাবদিহি করবেন না।
- তবে নafs-এর সংশোধন ও আল্লাহর কাছে তাওবা করা ভালো — বিশেষত যদি স্বপ্নে এমন কিছু দেখেন যা আপনার অন্তরের দোষ প্রকাশ করে।
৫. সারসংক্ষেপ (খুলাসা)
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | স্বপ্নে খুন করা | বাস্তব হত্যা নয়, কোনো গুনাহ/কাফফারা নেই | | কিসাস/দিয়াত | ওয়াজিব নয় | | সম্পর্ক রাখা | জায়েয, বরং কর্তব্য | | স্বপ্নের কথা বলা | উচিত নয় | | করণীয় | আউযুবিল্লাহ পড়া, সদকা, দুআ, ইস্তিগফার | | অন্তরে হিংসা থাকলে | তা দূর করা জরুরি |
দুআ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ نَفْسِي، وَمِنْ شَرِّ الشَّيْطَانِ وَشِرْكِهِ "হে আল্লাহ! আমি আমার নফস-এর অনিষ্ট থেকে এবং শয়তান ও তার শিরক থেকে আপনার আশ্রয় চাই।"
মূল রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) — কিতাবুল হুদুদ
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
- সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
والله أعلم بالصواب