বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন্য আলেম দিয়ে তাওবা করানো, মহিলাদের পর্দার আড়াল থেকে তাওবা পাঠ, শিশুদের তাওবা শিক্ষা, আলিম প্রিপারেটি কোর্সের ক্লাস পরিবারকে শোনানো, এবং বেপর্দা পরিবেশের কলেজে মামাতো বোনকে ভর্তি করানোর বিধান সম্পর্কে জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২) যদি জায়েজ হয়ে থাকে মহিলারা পর্দার আড়াল থেকে পাঠ করতে পারবে কি ?
৩) শিশু কিশোররা ও কি এভাবে তাওবার বাক্য পাঠ করতে পারবে?
৪)আলিম প্রিপারেটি কোর্সের ক্লাস পরিবারের সদস্যদের কী শুনানো যাবে?
৫) আমি দ্বীনে ফেরার আগে যে কলেজে পড়ালেখা করেছিলাম। ঐ কলেজে আমার মামাতো বোন ভর্তি হতে চাচ্ছে। কিন্তু আমার মামাতো বোন ভর্তির নিয়মাবলী কিছু জানেনা। গতদিন মামা নিজে , উনার মেয়েকে নিয়ে আমাদের বাসায় আসছেন , কলেজে ভর্তিতে কিভাবে কি করতে হয় তা জানার জন্য আমায় ডাকলেন। কথার বলার পর আমি বুঝতে পারলাম যে মামা খুব চিন্তিত এ বিষয়টি নিয়ে। তাই আমি নিজে থেকে বলেছিলাম মামাতো বোনের সাথে কলেজে আমি যাবো ।
কিন্তু পরবর্তীতে চিন্তা আসলো , মামাতো বোন সে পর্দা করেনা। বেদ্বীন পরিবেশের কলেজে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার জন্য আমি কি গুনাহগার হবো?
উল্লেখ্য, আমি যদি ভর্তি করিয়ে না দেই । তবু ও যেকোনো ভাবে মামাতো বোন ভর্তি হয়ে যাবে।
মামা আমাদের ছোটবেলায় অনেক ইহসান করেছিলেন , এ প্রেক্ষিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার কথা দিয়েছিলাম। এখন আমার করনীয় কি?
কলেজে যারা পর্দা করতে চায়, তারা পর্দা করতে পারে আলহামদুলিল্লাহ। হাত পা মোজাসহ
ক্লাস করা যায়। কিন্তু সমস্যা হল আমার মামাতো বোন কোন সময় বোরকা পরিধান করে আর কখনো পরিধান করেনা।
Answer
তাওবা করানো ও কলেজে ভর্তি সংক্রান্ত জিজ্ঞাসার জবাব
উত্তর (সংক্ষেপে):
১) বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন্য আলেম/বুজুর্গকে বাসায় দাওয়াত দিয়ে এনে তাওবার বাক্য পাঠ করানো — জায়েজ। এটি তাওবা ও ইস্তেগফারের একটি বৈধ পদ্ধতি। তবে তাওবা কবুল হওয়ার জন্য শর্ত হলো: গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা, কৃত গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, এবং ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা। শুধু মুখে তাওবার বাক্য উচ্চারণ করলেই তাওবা সহিহ হয় না।
২) মহিলারা পর্দার আড়াল থেকে তাওবার বাক্য পাঠ করতে পারবে — এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে মহিলাদের জন্য উত্তম হলো নিজে নিজে আল্লাহর কাছে তাওবা করা; কোনো পুরুষ আলেমের সামনে সরাসরি তাওবার বাক্য পাঠ করা জরুরি নয়।
৩) শিশু-কিশোররাও তাওবার বাক্য পাঠ করতে পারবে। বরং তাদের ছোটবেলা থেকেই তাওবা, ইস্তেগফার ও দ্বীনি শিক্ষার অভ্যাস করানো উচিত।
৪) আলিম প্রিপারেটি কোর্সের ক্লাস পরিবারের সদস্যদের শুনানো যাবে — এতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে যদি ক্লাসে এমন বিষয় আলোচনা হয় যা পরিবারের সদস্যদের জন্য উপযুক্ত নয় বা যাদের সামনে বলা ঠিক নয়, তা হলে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
৫) আপনার মামাতো বোনকে বেদ্বীন পরিবেশের কলেজে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার বিষয়ে:
- যদি আপনি তাকে ভর্তি করিয়ে দেন এবং সে পর্দা না করে, বেপর্দা অবস্থায় পড়াশোনা করে, পুরুষদের সাথে অবাধ মেলামেশা করে — তাহলে আপনি গুনাহগার হবেন, কারণ আপনি তার বেপর্দা ও বেদ্বীন পরিবেশে যাওয়ার পথ সহজ করে দিচ্ছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
"আর তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।"
(সূরা মায়িদা: ২)
-
যদি সে নিজে থেকেই ভর্তি হয়ে যায় — তাহলে আপনি সরাসরি গুনাহগার হবেন না, তবে আপনার উচিত তাকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া, পর্দার গুরুত্ব বোঝানো এবং সম্ভব হলে কোনো ইসলামি পরিবেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির পরামর্শ দেওয়া।
-
মামার ইহসানের কথা চিন্তা করে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন — এটা understandable, কিন্তু ইসলামে কোনো প্রতিশ্রুতি যদি গুনাহের কাজে সহযোগিতা করার হয়, তাহলে তা পূরণ করা জায়েজ নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ
"সৃষ্টির আনুগত্যে স্রষ্টার অবাধ্যতা করা যাবে না।"
(মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ১০৯৮; সহিহ)
আপনার করণীয়:
১. মামাকে ভদ্রভাবে বুঝিয়ে বলুন যে, আপনি তাকে কলেজে ভর্তি করাতে সাহায্য করতে পারবেন না, কারণ সেখানে বেপর্দা পরিবেশে পড়াশোনা করতে হবে — যা ইসলামে নিষিদ্ধ। আপনি তাকে বোঝান যে, আপনি তার মেয়ের দ্বীনি কল্যাণ চান।
২. মামাতো বোনকে পর্দার গুরুত্ব বোঝান, তাকে দ্বীনি শিক্ষার প্রতি উৎসাহিত করুন।
৩. সম্ভব হলে তাকে কোনো ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা মহিলাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিন।
৪. মামার ইহসানের প্রতিদান দেওয়ার জন্য অন্য কোনো বৈধ উপায়ে তাকে সাহায্য করুন — যেমন: দ্বীনি পরামর্শ, দোয়া, বা অন্য কোনো হালাল বিষয়ে সহযোগিতা।
৫. আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং আপনার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য তাওবা করুন, কারণ আপনি না জেনে ভুল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
মনে রাখবেন: আপনার মামাতো বোন যদি নিজে থেকেই ভর্তি হয়ে যায়, তাহলে তার গুনাহের দায় আপনার উপর বর্তাবে না। কিন্তু আপনি যদি তাকে ভর্তি করিয়ে দেন এবং তার বেপর্দা ও বেদ্বীন পরিবেশে পড়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করেন, তাহলে আপনি গুনাহগার হবেন।
আরবি ও উর্দু রেফারেন্স
১. তাওবা সম্পর্কে:
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।"
(সূরা বাকারা: ২২২)
২. গুনাহে সহযোগিতা সম্পর্কে:
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
"আর তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না; আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা।"
(সূরা মায়িদা: ২)
৩. হাদিস:
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো মুনকার (নিষিদ্ধ কাজ) দেখবে, সে যেন তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে; যদি না পারে, তবে জিহ্বা দিয়ে; যদি তাও না পারে, তবে অন্তর দিয়ে — আর এটাই ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৯)
৪. ফিকহের কিতাব:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): "গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হারাম।" (খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৯২)
- ফাতাওয়া শামি: "কোনো মুসলিমকে বেপর্দা পরিবেশে পাঠানো বা তার জন্য সহযোগিতা করা জায়েজ নয়।"
- ফাতাওয়া উসমানি: "বেপর্দা পরিবেশে মেয়েদের পড়াশোনা করা জায়েজ নয়, যদি না পর্দার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা থাকে।" (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৫৬)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: "মেয়েদের বেপর্দা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ানো-পড়া নিষিদ্ধ।" (খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৮৯)
- বেহেশতী জেওর: "মেয়েদের জন্য পর্দা ফরজ; বেপর্দা অবস্থায় বাইরে যাওয়া গুনাহ।"
৫. উসুলুল শাশী: "যে বিষয় আল্লাহর নাফরমানির দিকে নিয়ে যায়, তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।"
উপসংহার: আপনার মামাতো বোনকে বেপর্দা পরিবেশের কলেজে ভর্তি করিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। মামাকে ভদ্রভাবে বুঝিয়ে বলুন এবং তার মেয়ের দ্বীনি কল্যাণের জন্য পরামর্শ দিন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।