কসর সলাত পড়ার নিয়ম ও পদ্ধতি কি? সবিস্তারে বুঝিয়ে দাও?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 5686
Questioner: Jannatul Nayem
Question Asked: 19 Sep 2026, 05:00 PM
Reviewed & Published: 19 Sep 2026, 05:09 PM
Views: 11
Tokens: 3,392
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কসর সলাত পড়ার নিয়ম।

Answer

কসর সালাত পড়ার নিয়ম

ভূমিকা

কসর (قصر) শব্দের অর্থ হলো সংক্ষিপ্ত করা। শরীয়তের পরিভাষায়, সফর (ভ্রমণ) অবস্থায় চার রাকআত ফরজ সালাতকে দুই রাকআতে আদায় করাকে কসর বলা হয়। এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান, যা কুরআন, হাদিস ও ইজমা (ঐকমত্য) দ্বারা প্রমাণিত।

কুরআনের দলিল

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلَاةِ

"আর যখন তোমরা জমিনে সফর করো, তখন সালাত সংক্ষিপ্ত করাতে তোমাদের কোনো গুনাহ নেই।"

— (সূরা আন-নিসা: ১০১)

হাদিসের দলিল

হযরত ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

صَحِبْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ فِي السَّفَرِ فَلَمْ يَزِدْ عَلَى رَكْعَتَيْنِ

"আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে সফরে ছিলাম, তিনি দুই রাকআতের বেশি পড়েননি।"

— (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১১০২; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৬৮৯)

হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত:

فُرِضَتِ الصَّلَاةُ رَكْعَتَيْنِ رَكْعَتَيْنِ، فَأُقِرَّتْ صَلَاةُ السَّفَرِ، وَأُتِمَّتْ صَلَاةُ الْحَضَرِ

"সালাত প্রথমে দুই দুই রাকআত ফরজ হয়েছিল। অতঃপর সফরের সালাত বহাল রাখা হয়েছে এবং মুকীমের (বাসস্থানের) সালাত পূর্ণ করা হয়েছে।"

— (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৩৫০; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৬৮৫)

কসরের শর্তাবলি (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)

হানাফি মাযহাব অনুসারে কসর করার জন্য নিম্নলিখিত শর্তাবলি পূরণ হওয়া আবশ্যক:

১. সফরের দূরত্ব

সফরের দূরত্ব কমপক্ষে তিন দিনের পথ (প্রায় ৭৭-৭৮ কিলোমিটার বা ৪৮ মাইল) হতে হবে। এই দূরত্ব পায়ে হাঁটা, উট, ঘোড়া বা প্রচলিত মাধ্যমের হিসাবে নির্ধারিত।

ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) এর মত হলো, তিন দিনের পথ অর্থাৎ ৭৭ কিলোমিটার।

— (আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ৮০; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ১২১)

২. সফরের সময়ে ১৫ দিন অবস্থানের নিয়ত না করা।

৩. নিয়ত

সফরের নিয়ত করতে হবে। সফরের নিয়ত ছাড়া কসর করা যাবে না।

৪. মুকীম অবস্থার অবসান

যে স্থানে সফর শুরু হয়েছে, সেই স্থানের আবাদি এলাকা (নগরীর সীমানা) অতিক্রম করতে হবে।

৫. সময়সীমা

কোনো এক স্থানে ১৫ দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত করলে কসর করা যাবে না; বরং পূর্ণ সালাত পড়তে হবে। আর যদি ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত হয়, তবে কসর করা যাবে।

— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ১২৩; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৯)

কোন সালাতে কসর প্রযোজ্য?

শুধুমাত্র চার রাকআত ফরজ সালাত-এ কসর প্রযোজ্য। যথা:

| সালাত | মুকীম অবস্থায় | সফর অবস্থায় | |--------|----------------|----------------| | ফজর | ২ রাকআত | ২ রাকআত (কসর নেই) | | যোহর | ৪ রাকআত | ২ রাকআত | | আসর | ৪ রাকআত | ২ রাকআত | | মাগরিব | ৩ রাকআত | ৩ রাকআত (কসর নেই) | | ইশা | ৪ রাকআত | ২ রাকআত |

সুন্নত ও নফল সালাত:

  • ফজরের সুন্নত: সফরেও পড়া উত্তম (তবে ছাড়ার সুযোগ আছে)।
  • যোহর, আসর ও ইশার সুন্নতে মুআক্কাদা: সফরে না পড়ার অনুমতি আছে।
  • মাগরিবের সুন্নত: পড়া উত্তম।
  • বিতর ও তাহাজ্জুদ: সফরেও পড়া যায়।

— (মারাকিল ফালাহ, পৃ. ১৩৫; বাহিশতী জেওর, পৃ. ১৩০)

কসরের নিয়ম

১. নিয়ত: সফরের কারণে কসর করার নিয়ত করতে হবে। শুধু "দুই রাকআত ফরজ" বলে নিয়ত করলেও হবে।

২. জামাত: সফর অবস্থায় জামাতের সাথে পড়া উত্তম। যদি মুকীম ইমামের পিছনে সফরকারী মুক্তাদি হয়, তবে তাকে পূর্ণ চার রাকআত পড়তে হবে (কসর করবে না)।

৩. একাকী পড়া: সফরকারী একাকী দুই রাকআত পড়বে।

৪. কসর ওয়াজিব না সুন্নত: হানাফি মাযহাব অনুসারে সফরের শর্ত পূরণ হলে কসর করা ওয়াজিব। ইমাম শাফেঈ (রহঃ) এর মতে, কসর করা সুন্নত।

— (আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ৮১; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ২৪৫)

বিশেষ মাসআলা

১. মুকীম ইমামের পিছনে সফরকারী

যদি সফরকারী ব্যক্তি মুকীম ইমামের পিছনে সালাত আদায় করে, তবে তাকে পূর্ণ চার রাকআত পড়তে হবে। কারণ ইমামের পূর্ণ করা তার জন্য আবশ্যক।

— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ১৩০)

২. সফরকারী ইমামের পিছনে মুকীম মুক্তাদি

যদি সফরকারী ইমাম দুই রাকআত পড়ে সালাম ফিরিয়ে দেন, তবে মুকীম মুক্তাদিরা উঠে বাকি দুই রাকআত একাকী পড়বে (সূরা ফাতিহা সহ)।

— (আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ৮২)

৩. সফরে জুমআ

সফরকারীর উপর জুমআ ওয়াজিব নয়। তবে যদি জুমআর জামাতে শরিক হয়, তবে জুমআ আদায় হয়ে যাবে এবং জোহর পড়তে হবে না।

৪. সফরের সময়সীমা

যদি কোনো ব্যক্তি একাধিক স্থানে সফর করে এবং প্রতিটি স্থানে ১৫ দিনের কম থাকে, তবে সফর চলাকালীন সময়ে কসর করতে থাকবে, যতদিন না সে নিজ শহরে ফিরে আসে বা ১৫ দিন থাকার নিয়ত করে।

— (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৯)

কসর না করার অবস্থা

নিম্নলিখিত অবস্থায় কসর করা যাবে না:

১. সফরের দূরত্ব তিন দিনের কম হলে। ২. ১৫ দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত করলে। ৩. মুকীম ইমামের পিছনে হলে। ৪. নিজ শহরের সীমানার ভিতরে থাকলে।

উপসংহার

কসর সালাত ইসলামের একটি মহান বিধান, যা সফরকারীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ ছাড়। হানাফি মাযহাব অনুসারে, তিন দিনের পথ (প্রায় ৭৭ কিলোমিটার) সফরের শর্ত পূরণ হলে চার রাকআত ফরজ সালাতকে দুই রাকআতে আদায় করা ওয়াজিব। এমনকি চার রাকাত পড়লে এবং প্রথম বৈঠক করলে, প্রথম দুই রাকাত ফরয আদায় হবে এবং পরবর্তী দুই রাকাত নফল হিসেবে আদায় হবে। তবে ১৫ দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত করলে কসর করা যাবে না। সফরকারীর জন্য উত্তম হলো জামাতের সাথে কসর আদায় করা।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.