এতিম শিশুর উত্তরাধিকার হক, শাশুড়ির জমি দান, সম্মন্ধীর সম্পত্তি বণ্টন ও ইসলামী উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে জানতে চাই?

Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 5682
Questioner: md soroar
Question Asked: 19 Sep 2026, 03:40 PM
Reviewed & Published: 19 Sep 2026, 04:08 PM
Views: 14
Tokens: 4,732
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার শ্বশুর জীবিত থাকা অবস্থায় আমার শাশুড়ি তিন শতক জমির মালিক ছিলেন এবং আমার শ্বশুর মারা যাওয়ার পর আমার সম্মন্ধী আমার শাশুড়িকে আড়াই শতক জমি লিখে দেয়। এমন অবস্থায় আমার সম্মন্ধী মারা যায় এবং আমার সম্মন্ধীর এক বছরের একটা বাচ্চা আছে। এখন আমার শাশুড়ি চাইতেছে যে আড়াই শতক জমিটা আমার শাশুড়ি পাইছে সেটা তার ছোট মেয়েকে লিখে দিতে এবং দেড় শতক করে তিন শতক যে জমি আছে তার দুই মেয়েকে লিখে দিতে। এতে করে কি এতিম শিশুর প্রতি হক নষ্ট হবে কিনা?

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, আর সালাত ও সালাম রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপর।

সংক্ষিপ্ত উত্তর

হ্যাঁ, এতে এতিম শিশুর হক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে — যদি নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় না নেওয়া হয়। তবে বিস্তারিত হুকুম নির্ভর করে জমিগুলোর প্রকৃত মালিকানা ও মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদের উপর।


বিষয়টি ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ

১. শাশুড়ির তিন শতক জমি — এটি তার নিজের সম্পত্তি

শাশুড়ি জীবিত থাকা অবস্থায় যে তিন শতক জমির মালিক ছিলেন, তা তার নিজস্ব মালিকানা। তিনি জীবিত থাকলে তার সম্পত্তি তিনি যাকে ইচ্ছা দান/উইল করতে পারেন — তবে শর্ত হলো:

  • জীবদ্দশায় দান (হেবা) হলে তা সম্পূর্ণ বৈধ, যদি সুস্থ মস্তিষ্কে ও স্বেচ্ছায় হয়।
  • মৃত্যুর পর উইল (অসিয়ত) হলে শরিয়তের সীমা হলো এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) এর বেশি নয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ، فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ» — "নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার হক দিয়ে দিয়েছেন, তাই ওয়ারিসের জন্য কোনো উইল নেই।" (সুনান আবু দাউদ ২৮৭০, সুনান তিরমিজি ২১২১ — শাইখ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন)

অর্থাৎ উত্তরাধিকারী (ওয়ারিস)-এর জন্য উইল করা জায়েয নয় — সে তো শরিয়ত নির্ধারিত অংশ পাবেই। তাই শাশুড়ি যদি তার মৃত্যুর পর দুই মেয়েকে জমি দিতে চান, তবে তা শরিয়তের উত্তরাধিকার নিয়মেই হবে, উইল দিয়ে নয়।

২. সম্মন্ধীর দেওয়া আড়াই শতক জমি — এখানে মূল প্রশ্ন

সম্মন্ধী শাশুড়িকে আড়াই শতক জমি লিখে দিয়েছেন। এখানে কয়েকটি সম্ভাবনা:

ক) যদি এটি সত্যিকারের হেবা (দান) হয় — শাশুড়ি তার মালিক হয়ে যান, তবে তা তার সম্পত্তি, তিনি যাকে ইচ্ছা দিতে পারেন।

খ) যদি এটি শুধু কাগজে-কলমে "লিখে দেওয়া" হয় কিন্তু প্রকৃত দখল হস্তান্তর হয়নি — তাহলে হেবা সম্পূর্ণ হয়নি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يُعْطِيَ عَطِيَّةً فَيَرْجِعَ فِيهَا...» — "কোনো ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় যে, সে দান করার পর তা ফিরিয়ে নেবে..." (সুনান তিরমিজি ২১৩২ — সহীহ)

তবে হেবা পূর্ণ হওয়ার শর্ত হলো কবজা (দখল) হস্তান্তর। শাইখ ইবন উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হেবা তখনই পূর্ণ হয় যখন দানকৃত বস্তু দানগ্রহীতার দখলে চলে যায়।

গ) যদি সম্মন্ধী মারা যাওয়ার সময় এই জমি তার মালিকানায় থেকে যায় (অর্থাৎ হেবা পূর্ণ হয়নি) — তাহলে এই আড়াই শতক জমি তার মৃত সম্পত্তির অংশ এবং তা তার সকল ওয়ারিসের মাঝে শরিয়ত অনুযায়ী বণ্টিত হবে। তার এক বছরের সন্তানও একজন ওয়ারিস।

৩. এতিম শিশুর হক — মূল সতর্কতা

আল্লাহ তা'আলা কুরআনে এতিমের সম্পদ সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন:

«إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَىٰ ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا ۖ وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا» — "নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের সম্পদ ভক্ষণ করে, তারা তো তাদের পেটে আগুন ভক্ষণ করে, আর শীঘ্রই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" (সূরা আন-নিসা: ১০)

«وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ» — "এতিমের সম্পদের নিকটবর্তী হয়ো না, তবে উত্তম পদ্ধতিতে (তার উপকারার্থে)।" (সূরা আল-আনআম: ১৫২)

সুতরাং:

  • যদি আড়াই শতক জমি সম্মন্ধীর মৃত সম্পত্তির অংশ হয়, তবে তা সকল ওয়ারিসের মাঝে বণ্টন করতে হবে — শাশুড়ি একা পুরোটা নিতে পারবেন না, আর তার ছোট মেয়েকে একা লিখে দিতে পারবেন না।
  • এতে এতিম শিশুর হক নষ্ট হবে — যা কুরআনের সুস্পষ্ট নিষিদ্ধ।

৪. সম্মন্ধীর এক বছরের সন্তানের হক

সম্মন্ধী মারা গেলে তার সম্পত্তির ওয়ারিস হবে:

  • তার সন্তান (এক বছরের বাচ্চা) — যদি ছেলে হয় তবে বড় অংশ, মেয়ে হলে নির্দিষ্ট অংশ
  • তার স্ত্রী (যদি থাকে)
  • তার পিতা-মাতা (যদি জীবিত থাকে)

শাশুড়ি এখানে ওয়ারিস নন — তিনি সম্মন্ধীর শাশুড়ি, অর্থাৎ তার স্ত্রীর মা। ইসলামী উত্তরাধিকারে শাশুড়ি জামাতার সম্পত্তির ওয়ারিস নন।

তাই সম্মন্ধীর সম্পত্তিতে শাশুড়ির কোনো শরিয়তসিদ্ধ দাবি নেই — যদি না সম্মন্ধী তাকে জীবদ্দশায় বৈধ হেবা করে থাকেন।


সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | শাশুড়ির নিজের তিন শতক জমি | তিনি জীবিত থাকলে যাকে ইচ্ছা দিতে পারেন; মৃত্যুর পর উইল ১/৩ এর বেশি নয় | | সম্মন্ধীর দেওয়া আড়াই শতক — যদি প্রকৃত হেবা হয় | শাশুড়ির সম্পত্তি, তিনি যাকে ইচ্ছা দিতে পারেন | | সম্মন্ধীর দেওয়া আড়াই শতক — যদি হেবা পূর্ণ না হয় | মৃতের সম্পত্তি, সকল ওয়ারিসের মাঝে বণ্টন হবে | | এতিম শিশুর হক | কোনোভাবেই নষ্ট করা যাবে না — কুরআনের কঠোর নিষেধ |

পরামর্শ:

১. স্থানীয় বিশ্বস্ত আলেম/মুফতির কাছে সরাসরি বিষয়টি উপস্থাপন করুন — কাগজপত্র ও প্রকৃত অবস্থা দেখিয়ে। কারণ হেবা পূর্ণ হয়েছে কিনা, দখল হস্তান্তর হয়েছে কিনা — এসব জানা ছাড়া চূড়ান্ত ফতোয়া দেওয়া সম্ভব নয়।

২. এতিম শিশুর অংশ আলাদা করে সংরক্ষণ করুন — তার প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত। আল্লাহ বলেন:

«وَابْتَلُوا الْيَتَامَىٰ حَتَّىٰ إِذَا بَلَغُوا النِّكَاحَ فَإِنْ آنَسْتُم مِّنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ» — "এবং এতিমদের পরীক্ষা করো, এমনকি তারা বিবাহের বয়সে পৌঁছালে; যদি তাদের মধ্যে বুদ্ধিমত্তা দেখো, তবে তাদের সম্পদ তাদের হাতে দিয়ে দাও।" (সূরা আন-নিসা: ৬)

৩. শাশুড়িকে সদুপদেশ দিন — তিনি যদি এতিমের হক নষ্ট করেন, তবে তা কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নামের আগুন হবে। শাইখ ইবন বায রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা কবীরা গুনাহ।

৪. যদি শাশুড়ি তার নিজের সম্পত্তি থেকে দিতে চান — তবে তা তার অধিকার, তাতে এতিমের হক নষ্ট হবে না। কিন্তু সম্মন্ধীর সম্পত্তি থেকে দিলে অবশ্যই ওয়ারিসদের হক রক্ষা করতে হবে।


মূল কথা: শাশুড়ি তার নিজের সম্পত্তি থেকে যা চান করতে পারেন, কিন্তু সম্মন্ধীর সম্পত্তি যদি প্রকৃতপক্ষে মৃতের রেখে যাওয়া সম্পদ হয়, তবে তা এতিম শিশুসহ সকল ওয়ারিসের মাঝে শরিয়ত অনুযায়ী বণ্টন করা ফরজ। এতে এতিমের হক নষ্ট করা যাবে না — এটি কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.