পর্দা (জিলবাব ও খিমার) সম্পর্কিত বিস্তারিত ফিকহি জবাব
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২। জিলবাব কতটুকু ঢাকে আমি তা সহিহ সূত্রে বা সঠিক বর্ণণা জানতে চাই। জিলবাব কেউ বলে মাথা থেকে পা ঢাকে কেউ বলে যে মাতগা আর বুক ঢাকে আসলে নাবিজি ﷺ এর সময় জিলবাব কী বুঝাত আমি সহিহ ভাবে অয়াচ্ছি না। ইবনে আব্বাস রা এর নামে নিসবত করে জিলবাবের যে বর্ণনা তা তো সহিহ্র শর্ত পূরণ করে না।
৩। খিমার নাবিজি ﷺ এর সময়ে কতটুকু ঢাকা বুঝাত সহিহ বর্ণনা দেন যা সহিহ এর শর্ত পূরণ করে।
৪। খিমার জুয়ুব এ টানিতে বলেছেন আল্লাহ পাক জুয়ুব কী সহিহ ভাবে জানান!
৫। আল্লাহ তায়ালা জিনাত প্রদর্শন করতে নিষেধ করেছেন এখন জিনাত মানে তো আরবিতে অলংকার গহনা বা পোশাক বুঝায় যা দৃষ্টি আকর্ষণ করে? নাকি আরো কিছু বুঝায় জিনাত দ্বারা।
৬। তাহলে জিনাত যদি গহনা অলংকার বুঝায় তা পরিধান রত অবস্থা অঙ্গ দেখানো নাজায়েজ তাহলে যদি কেউ হাতে চুড়ি বা পায়ে পায়েল না পরে বা কানে দুল না পরে তাহলে কি তার জন্য কান পা হাত দেখানো জায়েজ কুরআন অনুযায়ী?
৭। সহিহ হাদিস কি নেই পর্দা নিয়ে সুনির্দিষ্ট? এমন হাদিস যা সহিহ হওয়া নিয়ে সবাই একমত।
৮। আর জিলবাব কি শুধু বাহিরে গেলেই পরা বাধ্যতামূলক? বাসায় যদি পর পুরুষ থাকে?
৯। আমরা কিভাবে বুঝব যে পেট পিঠ পা হাত কুনুই বা রান বা হাটু বা গলা চুল বাহু এগুলা দেখানো যে পর পুরুষকে নাজায়েজ কিভাবে বুঝব কুরআনে বা হাদিসে তো সুনির্দিষ্ট ভাবে বলা নেই।
Answer
পর্দা (জিলবাব ও খিমার) সম্পর্কিত বিস্তারিত ফিকহি জবাব
উত্তর
১। জিলবাব বা এর কাজ করে এমন পোশাক পরা বাধ্যতামূলক কি না?
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ(অর্থ: তারা যেন তাদের জিলবাবের অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়) (সূরা আহযাব: ৫৯)।
ফিকহ ও তাফসীরের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলীতে বর্ণিত রয়েছে যে, 'জিলবাব' (جلباب) হলো এমন বড় চাদর বা রীদা (বোরকা/আবরণী), যা দ্বারা নারী তার পুরো শরীর ও চেহারা ঢেকে রাখে । গায়রে মাহরাম বা পরপুরুষের সামনে সতরের অঙ্গসমূহ ঢেকে রাখা এবং শরীর আবৃত করে পর্দা রক্ষা করা শরীয়তের দৃষ্টিতে ফরয ও বাধ্যতামূলক । সুতরাং জিলবাব কিংবা এর স্থলাভিষিক্ত এমন যেকোনো ঢিলেঢালা ও পুরু পোশাক—যা পুরো শরীরকে ভালোভাবে আবৃত করে—পরপুরুষের সামনে পরিধান করা আবশ্যক ।
- সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১২৬, ১২৮–১২৯ (অধ্যায়: বাবুল হিজাব — পর্দা ফরয হওয়া ও জিলবাবের বিবরণ)।
২। জিলবাব কতটুকু ঢাকে এবং নবীজি ﷺ-এর সময়ে এর রূপ কী ছিল?
'জিলবাব' কতটুকু ঢাকে সে প্রসঙ্গে তাফসীরে জাস্সাস ও ফাতাওয়া মাহমুদিয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, জিলবাব অর্থ 'রীদা' বা বহিরাবরণী চাদর। হযরত উবাইদাহ আস-সালমানী (র.) থেকে বর্ণিত রয়েছে, জিলবাব দ্বারা মাথা ও মুখমণ্ডল আবৃত করে কেবল একটি চোখ খোলা রাখার মাধ্যমে পর্দা করা বোঝানো হতো। এছাড়া হাদিস শরীফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে মহিলাদের বাইরে বের হওয়ার জন্য জিলবাব বা বোরকা জাতীয় পরিধেয় বস্ত্র ছিল, যা দিয়ে তারা শরীর ও চেহারা ঢেকে বাইরে বের হতেন।
- সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১২৮–১২৯ (অধ্যায়: বাবুল হিজাব — জিলবাবের তাফসীর ও উবাইদাহ (র.)-এর বর্ণনা)।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১২৭ (অধ্যায়: নামায ও ঈদের খুতবা — জিলবাবের বিবরণ)।
৩। 'খিমার' নবীজি ﷺ-এর সময়ে কতটুকু ঢাকা বুঝাত?
'খিমার' (خمار) মূলত এমন ওড়না বা মাথার কাপড়কে বলা হয়, যা দ্বারা নারীর মাথা, চুল, গলার চারপাশ এবং বক্ষদেশ আবৃত করা হয়। হাদিস শরীফে এসেছে (যেমন মুআত্তা মালেক ও দরসুল ফিকহে বর্ণিত), হযরত আয়েশা (রা.) হযরত হাফসা বিনতে আব্দুর রহমানের ওপর পাতলা খিমার (ওড়না) দেখে তা ছিঁড়ে ফেলেন এবং একটি মোটা ও পুরু খিমার পরিয়ে দেন, যাতে মাথার চুল ও শরীর সঠিকভাবে আবৃত থাকে।
- সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৪০৭–৪০৮ (অধ্যায়: পোশাক সংক্রান্ত নীতিমালা — পুরু খিমার পরিধানের হাদিস)।
৪। 'খিমার জুয়ুব-এ টানিতে বলেছেন'—জুয়ুব কী?
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ(অর্থ: তারা যেন তাদের খিমার/ওড়না দিয়ে তাদের জুয়ুব আবৃত করে) (সূরা আন-নূর: ৩১)।
এখানে 'জুয়ুব' (জাইব-এর বহুবচন) দ্বারা জামার গলার ফাঁক, বক্ষদেশ বা বুকের উপরিভাগকে বোঝানো হয়েছে। খিমার বা ওড়নাকে এই জুয়ুবের ওপর ঝুলিয়ে দিয়ে গলা ও বুকের উপরিভাগ আবৃত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৪০০ (অধ্যায়: সতর ও দৃষ্টি সংযত রাখার বিধান)।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৬৩ (অধ্যায়: শর'য়ী সতর ও তার গুরুত্ব)।
৫। 'জিনাত' মানে কি অলংকার নাকি আরো কিছু?
পবিত্র কুরআনে 'জিনাত' (সৌন্দর্য/অলংকার) বলতে কেবল পরিহিত গহনা-অলংকার নয়, বরং নারীর পোশাকি সৌন্দর্য এবং শারীরিক যেসব অঙ্গ স্বাভাবিকভাবে রূপ-সৌন্দর্য ছড়ায় বা দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তার সবই বোঝানো হয়েছে। ফুকাহায়ে কেরাম উল্লেখ করেছেন, যেসকল সাজসজ্জা, পরিধেয় বস্ত্র বা শরীরের অংশ পরপুরুষকে আকৃষ্ট করে, তা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।
- সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৪০৮ (অধ্যায়: পোশাকের ১ম মূলনীতি ও সৌন্দর্য প্রকাশ বর্জন)।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৬৩ (অধ্যায়: জিনাত গোপন করার কুরআনভিত্তিক বিধান)।
৬। অলংকার না পরলে কি হাত, পা বা কান দেখানো জায়েয?
হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, স্বাধীন নারীর মুখমণ্ডল, দুই হাতের কব্জি এবং দুই পায়ের পাতা ব্যতীত সমস্ত শরীর সতরের অন্তর্ভুক্ত । তবে পরপুরুষ বা গায়রে মাহরামের সামনে ফেতনার আশঙ্কাকালে অনাবৃত ত্বক ও সৌন্দর্য গোপন রাখা ওয়াজিব। অলংকার না পরলেও অনাবৃত শরীরের ত্বক বা অঙ্গের গঠন পরপুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে; তাই কেবল অলংকার না পরা অঙ্গ খোলার শরয়ী অনুমতি প্রদান করে না।
- সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৬০–১৬১ (অধ্যায়: সালাত — নারীর সতরের সীমা)।
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৭৪, ১৭৬ (অধ্যায়: বাবুল হিজাব — গায়রে মাহরামের সামনে অঙ্গ আবৃত রাখা)।
৭। পর্দা নিয়ে কি সুনির্দিষ্ট সহীহ হাদিস নেই?
পর্দা ও সতর রক্ষা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট সহীহ হাদিস বিদ্যমান রয়েছে।
-
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে: "কোনো পুরুষ যেন কোনো বেগানা নারীর সাথে একান্তে অবস্থান না করে..."।
-
সহীহ মুসলিমে এসেছে: "এমন কিছু নারী হবে যারা কাপড় পরেও উলঙ্গ থাকবে... তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না..."।
-
এছাড়া হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত সহীহ বর্ণনায় এসেছে, এহরাম অবস্থায়ও সওয়ারির আরোহী পরপুরুষরা সামনে আসলে তারা মাথার ওপর থেকে চেহারার ওপর কাপড় নামিয়ে পর্দা করতেন।
-
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩৮২–৩৮৩, ৪০৭–৪০৮ (পরপুরুষের সাথে নির্জনবাস ও বেপর্দা পোশাকের হাদিস)।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১০৩ (ইহরাম অবস্থায় চেহারার পর্দার সাহাবীগণের আমল)।
৮। জিলবাব বা পর্দা কি বাসায় পরপুরুষ থাকলেও বাধ্যতামূলক?
পর্দা করার বিধান কেবল ঘরের বাইরে যাওয়ার সাথে খাস নয়; বরং গায়রে মাহরাম বা পরপুরুষের উপস্থিতির সাথেই সম্পর্কিত। বাসায় যদি দেওর, ভাসুর, খালাতো/ফুফাতো/মামাতো ভাই বা অন্য কোনো গায়রে মাহরাম পুরুষ থাকে, তবে তাদের সামনেও পর্দা করা ওয়াজিব এবং তাদের সাথে নির্জনে অবস্থান করা হারাম । হাদিস শরীফে রাসুলুল্লাহ ﷺ দেওর বা স্বামীর পুরুষ আত্মীয়দের সামনে বেপর্দা হওয়াকে 'মৃত্যু'র সাথে তুলনা করেছেন।
- সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৭৬, ১৭৮ (অধ্যায়: বাবুল হিজাব — আত্মীয় পরপুরুষ ও দেওর-ভাসুরের পর্দা)।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩৮২ (বেগানা পুরুষের সাথে নির্জনবাস নিষিদ্ধের বিবরণ)।
৯। পেট, পিঠ, উরু, হাঁটু, বাহু, চুল ইত্যাদি পরপুরুষকে দেখানো যে নাজায়েয, তা কীভাবে বোঝা যায়?
পবিত্র কুরআনে সার্বিকভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ...(অর্থ: আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে, লজ্জাস্থানের হিফাযত করে এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে) (সূরা আন-নূর: ৩১)।
ফুকাহায়ে কেরাম কুরআনের এই আয়াত এবং সহীহ হাদিসসমূহের আলোকে নারীর 'সতর' (আবশ্যকীয় গোপনীয় অঙ্গ)-এর ফিকহী সীমা নির্ধারণ করেছেন। ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬০–১৬১) এবং নূরুল ঈযাহ-এ স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, স্বাধীন নারীর মুখমণ্ডল, দু হাতের কব্জি ও দু পায়ের পাতা ব্যতীত পুরো শরীর—যার মধ্যে চুল, গলা, পেট, পিঠ, বাহু, কনুই, উরু, হাঁটু ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত—তা 'সতর'। আর সতরের যেকোনো অঙ্গ পরপুরুষের সামনে প্রকাশ করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম ও নাজায়েয।
- সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৬০–১৬১ (অধ্যায়: সালাত — সতরের অঙ্গসমূহের পৃথক পৃথক বিবরণ)।
- নূরুল ঈযাহ: পৃষ্ঠা: ৬৬ (পরিচ্ছেদ: সালাতের শর্তাবলী — সতরের সীমা)।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৬৩–১৬৪ (অধ্যায়: সতরের বিভিন্ন স্তর ও ফিকহী বিধান)।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।