স্বপ্নে কন্যা সন্তান, স্বামী ও গুন্ডার হাত থেকে সন্তান রক্ষা পাওয়ার ইসলামী ব্যাখ্যা কী?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আজকে আমি ফজরের নামাজ পড়ে একটু মাথাব্যথা বোধ করায় ঘুমিয়েছিলাম। সেই ঘুমেই স্বপ্নে দেখলাম আমার কোলে একটা ফুটফুটে(এত্ত সুন্দর দেখতে ফর্সা এবং সুশ্রী আমার এখনো তার চেহারা হাল্কা মনে আছে) কন্যা সন্তান আছে এবং সেটা আমারই সন্তান,বাচ্চাটা মেইবি কয়েক মাসের হবে।আমি এও দেখেসি যে কে আমার স্বামী, তার চেহারাও দেখেসি কিন্তু আমি এবং আমার স্বামী আলাদা জায়গায় থাকি এমনটা দেখলাম(মনে হচ্ছে আমাদের মাঝে মনোমালিন্য চলছিলো যদিও এটা স্বপ্নে শিউরলি বুঝিনাই)।আমি যেখানে থাকি সে বাসার সাম্নেই আমি একটা ছোট্ট দোকান চালাই এরকম ও দেখেছি।এছাড়াও আমার সন্তানকে নিয়ে কোথাও থেকে আসার সময় কিছু গুন্ডা টাইপ লোক তাকে কেড়ে নিতে লেগেছিলো এবং আশেপাশের কেউ এসে বাচায় তাকে এবং আমার কাছে ফেরত দেয়। এর মাঝে অনেককিছু দেখেছি বাট সবটা স্পষ্ট মনে নেই। স্বপ্ন দেখে জেগে উঠার পর মনটা ভীষণ খুশি লাগছিলো।
উল্লেখ্য যে আমি অবিবাহিত,এডমিশন ক্যান্ডিডেট এবং বর্তমানে বিয়ে নিয়ে সেভাবে ভাবিওনাই। যাকে স্বপ্নে স্বামী হিসেবে দেখেছি সে আমার চেনা এবং সে কল্যানকর হইলে আল্লাহর কাছে তাকেই স্বামী হিসেবে চাই অলয়েজ কিন্তু আমি এমন ভাবনা কখনো ভাবিনাই যা স্বপ্নে আজ দেখলাম।এর ব্যখ্যা কি হতে পারে?
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয়টি মূলত স্বপ্ন-সংক্রান্ত। ইসলামী শরীয়তে স্বপ্নকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। হাদীসে এসেছে—
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الرُّؤْيَا ثَلَاثٌ: الْحَدِيثُ بِالْحَدِيثِ، وَمَا يَهُمُّ بِهِ الرَّجُلُ فِي يَقَظَتِهِ فَيَرَاهُ فِي مَنَامِهِ، وَالرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ بُشْرَى مِنَ اللَّهِ»
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, স্বপ্ন তিন প্রকার— ১. অন্তরের কল্পনা বা দৈনন্দিন চিন্তার প্রতিফলন, ২. শয়তানের কুমন্ত্রণা বা ভয়-ভীতি, ৩. সুসংবাদসূচক সৎ স্বপ্ন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩; মুসনাদে আহমাদ)
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالْحُلْمُ مِنَ الشَّيْطَانِ
অর্থ: সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর অশুভ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৯০)
আরও এসেছে—
إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مَا يَكْرَهُ فَلْيَقُمْ فَلْيُصَلِّ، وَلْيَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ
অর্থ: তোমাদের কেউ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে যেন উঠে নামাজ পড়ে এবং শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬২)
আপনার স্বপ্নের ব্যাখ্যা:
১. আপনি অবিবাহিত, এডমিশন ক্যান্ডিডেট এবং বিয়ে নিয়ে সেভাবে ভাবেন না। কিন্তু স্বপ্নে কন্যা সন্তান, স্বামী, দোকান ইত্যাদি দেখা—এগুলো সাধারণত আপনার অবচেতন মন, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাভাবিক কৌতূহল, পড়াশোনার চাপ, মাথাব্যথা ও ঘুমের অবস্থার প্রভাব হতে পারে। হাদীসের প্রথম প্রকার তথা “দৈনন্দিন চিন্তা ও কল্পনার প্রতিফলন”-এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
২. স্বপ্নে কন্যা সন্তান দেখা অনেক সময় কল্যাণ, রিযিক ও স্নেহের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে ইসলামে স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না; এটি ইলমে তাবীরের বিষয়, যা কুরআন-হাদীসের আলোকে সম্ভাব্য অর্থ বলে, চূড়ান্ত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
৩. স্বপ্নে গুন্ডা টাইপ লোক সন্তানকে কেড়ে নিতে চাওয়া এবং কেউ এসে বাঁচিয়ে দেওয়া—এটি ভয়, দুশ্চিন্তা বা নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলনও হতে পারে। যেহেতু জেগে উঠে মন ভীষণ খুশি লেগেছে, তাই এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা বা অশুভ স্বপ্ন নয়; বরং ভালো স্বপ্নের সম্ভাবনাই বেশি।
৪. আপনি যাকে স্বপ্নে স্বামী হিসেবে দেখেছেন এবং তাকে কল্যাণকর মনে করলে আল্লাহর কাছে তাকেই স্বামী হিসেবে চান—এটি আপনার অন্তরের একটি স্বাভাবিক কামনা। তবে এ থেকে কোনো শরীয়তগত বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয় না। স্বপ্নের ভিত্তিতে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়; বরং ইস্তিখারা, অভিভাবকের পরামর্শ, পাত্রের দ্বীনদারি, চরিত্র ও সামঞ্জস্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
৫. স্বপ্নে দেখা ব্যক্তিকে বিয়ে করা আবশ্যক নয়, আবার নিষিদ্ধও নয়। যদি সে দ্বীনদার, চরিত্রবান ও উপযুক্ত হয় এবং উভয় পক্ষের সম্মতিতে বিয়ে হয়, তবে তা কল্যাণকর হতে পারে। আর যদি সে উপযুক্ত না হয়, তবে স্বপ্নের কারণে নিজেকে তার সাথে আবদ্ধ করা ঠিক নয়।
করণীয়:
- স্বপ্নটি ভালো হলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন।
- কারও কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা চেয়ে ঘুরে বেড়াবেন না; বিশেষত অপরিচিত বা অযোগ্য ব্যক্তির কাছে নয়।
- বিয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইস্তিখারা করুন এবং অভিভাবকের সাথে পরামর্শ করুন।
- নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ শরীফ, আয়াতুল কুরসি ও সূরা ফালাক-নাস পড়ার অভ্যাস করুন।
- অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে বাম দিকে তিনবার থুতু ফেলুন, শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান এবং ডান দিকে কাত হয়ে শয়ন করুন।
মূল কথা: স্বপ্ন কোনো শরীয়তগত হুকুম বা ভবিষ্যতের নিশ্চিত সংবাদ নয়। এটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত হতে পারে, আবার মনোভাবের প্রতিফলনও হতে পারে। তাই স্বপ্নের ভিত্তিতে জীবন-সিদ্ধান্ত না নিয়ে শরীয়তসম্মত উপায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই কর্তব্য।
والله أعلم بالصواب