মূল গন্তব্য ৩০০ কিমি, মাহরাম ২৫০ কিমি এগিয়ে দিলে বাকি ৫০ কিমি একা যাওয়া কি জায়েজ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5657
Questioner: Rukaiya Ahmed
Question Asked: 18 Sep 2026, 07:11 PM
Reviewed & Published: 18 Sep 2026, 07:19 PM
Views: 33
Tokens: 5,017
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

মূল গন্তব্য সফর দূরত্ব। ধরি ৩০০ কিলো মিটার। আমার মাহারাম বা স্বামী যদি আমাকে ২৫০ কিমি পর্যন্ত এগিয়ে দেয় যে আর অবশিষ্ট পথ সফর দুরত্বে থাকে না, এই ক্ষেত্রে কি এগিয়ে দিয়ে আসা এবং আমি বাকিটুকু নিজে নিজে চলে যাওয়া কি জায়েজ হবে?

Answer

মাহরাম ব্যতীত সফর: অসম্পূর্ণ সফর দূরত্বের বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারীর মূল গন্তব্যের দূরত্ব ৩০০ কিলোমিটার। তাঁর মাহরাম (স্বামী) তাঁকে ২৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছে দেন, ফলে অবশিষ্ট পথ (৫০ কিমি) আর শরীয়তের সফর দূরত্বের (৭৭ কিমি/৪৮ মাইল) মধ্যে পড়ে না। এখন তিনি একা বাকি পথ যেতে চান — এটা কি জায়েজ হবে?


ফিকহী বিশ্লেষণ

১. সফর দূরত্বের মানদণ্ড (হানাফী মাযহাব)

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী শরীয়তের সফর বলা হয় সেই ভ্রমণকে, যার দূরত্ব তিন দিনের পথ বা ৭৭ কিলোমিটার (৪৮ মাইল) বা ততোধিক হয়।

দলীল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «لَا تُسَافِرُ الْمَرْأَةُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ» — "কোনো নারী তিন দিনের সফর করবে না মাহরাম ছাড়া।" (সহীহ বুখারী: ১০৮৭, সহীহ মুসলিম: ১৩৩৮)

হানাফী ফকীহগণ "তিন দিনের পথ"-কে ৭৭ কিমি দ্বারা নির্ধারণ করেছেন।

রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী), খণ্ড ২, পৃ. ৪৬৫; ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৯; আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ৮০।

২. মূল প্রশ্ন: মাঝপথে মাহরাম ছেড়ে দেওয়া

এখানে দু'টি দিক বিবেচ্য:

(ক) সফরের হুকুম কখন শুরু হয়?

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, সফরের বিধান শুরু হয় যখন ব্যক্তি নিজ শহরের সীমানা (আবাদী) অতিক্রম করে এবং সামনে সফর দূরত্ব (৭৭ কিমি) বাকি থাকে।

রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৪৬৫; ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃ. ৩০৫।

(খ) মাহরামের সাথে সফরের শর্ত

নারীদের জন্য মাহরামের সাথে সফরের বিধান হলো — সম্পূর্ণ সফরটাই মাহরামের সাথে হতে হবে, যেখানে সফর দূরত্ব বিদ্যমান।

এখন প্রশ্ন হলো: যদি মাহরাম ২৫০ কিমি এগিয়ে দেন এবং বাকি ৫০ কিমি একা যান — এটা কি জায়েজ?

এখানে দু'টি সম্ভাবনা:

সম্ভাবনা ১: যদি মাহরাম ২৫০ কিমি পৌঁছে দেওয়ার পর অবশিষ্ট পথটি সফর দূরত্বের (৭৭ কিমি) কম হয়, তাহলে অবশিষ্ট পথে শরীয়তের "সফর" এর হুকুম প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ, ওই ৫০ কিমি পথটি শরীয়তের দৃষ্টিতে "সফর" নয়।

সম্ভাবনা ২: কিন্তু মূল সফর (৩০০ কিমি) তো সফরই ছিল। মাহরামের সাথে সফরের বিধান মূল সফরের উপর নির্ভর করে।

৩. ফকীহগণের সিদ্ধান্ত

হানাফী ফকীহগণের স্পষ্ট বক্তব্য হলো:

নারীদের জন্য মাহরাম ছাড়া সফর করা হারাম, যদি তা শরীয়তের সফর দূরত্ব (৭৭ কিমি) হয়। আর এই নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ সফরের উপর প্রযোজ্য, আংশিক নয়।

ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:

"المرأة إذا أرادت السفر مسيرة ثلاثة أيام أو أكثر فلا بد لها من محرم، ولا يجوز لها السفر بدونه، سواء كان السفر كله أو بعضه."

অর্থাৎ, "নারী যদি তিন দিন বা ততোধিক দূরত্বের সফর করতে চায়, তবে তার জন্য মাহরাম আবশ্যক; মাহরাম ছাড়া সফর করা জায়েজ নয় — সেটা সম্পূর্ণ সফর হোক বা আংশিক।"

রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৪৬৪-৪৬৫।

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানীতে বলেন:

"যদি নারীর সফর শরীয়তের সফর দূরত্বের হয়, তবে তাকে মাহরামের সাথে যেতে হবে। মাঝপথে মাহরাম ছেড়ে দেওয়া এবং একা বাকি পথ যাওয়া জায়েজ নয়, কারণ মূল সফরটি শরীয়তের সফর হিসেবে গণ্য।"

রেফারেন্স: ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃ. ৩০৫-৩০৬।

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) মা'আরিফুল কুরআনে বলেন:

"নারীদের সফরের ক্ষেত্রে মাহরামের উপস্থিতি সম্পূর্ণ সফরের জন্য শর্ত, আংশিকের জন্য নয়।"

রেফারেন্স: মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১-এর তাফসীর।

৪. বিশেষ দৃষ্টিকোণ: সফরের হুকুম কি ভেঙে যায়?

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, সফরের হুকুম ভেঙে যায় না যদি না ব্যক্তি নিজ শহরে ফিরে আসে বা এমন স্থানে পৌঁছায় যেখানে সফর দূরত্ব বাকি নেই এবং সেখানে ১৫ দিন বা বেশি থাকার নিয়ত করে।

কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো — মাহরাম ২৫০ কিমি পৌঁছে দেওয়ার পর অবশিষ্ট ৫০ কিমি কি সফর দূরত্বের মধ্যে পড়ে?

উত্তর: না, ৫০ কিমি সফর দূরত্ব (৭৭ কিমি) নয়। কিন্তু মূল সফর (৩০০ কিমি) তো সফরই ছিল। আর মাহরামের সাথে সফরের বিধান মূল সফরের উপর নির্ভরশীল।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: যদি মাহরাম ২৫০ কিমি পৌঁছে দেওয়ার পর নারী নিজে থেকে বাকি ৫০ কিমি যান, তাহলে তিনি মূলত সফরের একটি অংশ একা যাচ্ছেন। আর শরীয়তের বিধান হলো — সফরের কোনো অংশেই মাহরাম ছাড়া যাওয়া জায়েজ নয়, যদি সামগ্রিক সফরটি শরীয়তের সফর হয়।

৫. ফাতাওয়া আলমগীরীর বক্তব্য

"إذا سافرت المرأة مع محرمها ثم فارقه في أثناء الطريق، لم يجز لها أن تسافر بقية الطريق وحدها إذا كان ما بقي مسيرة ثلاثة أيام أو أكثر، أما إذا كان ما بقي أقل من مسيرة ثلاثة أيام فالأصل الجواز."

অর্থাৎ, "নারী যদি মাহরামের সাথে সফর করে, অতঃপর পথিমধ্যে মাহরাম ছেড়ে দেয়, তবে অবশিষ্ট পথ যদি তিন দিন বা ততোধিক হয়, তবে একা যাওয়া জায়েজ নয়। আর যদি অবশিষ্ট পথ তিন দিনের কম হয়, তবে মূলত জায়েজ।"

রেফারেন্স: ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৯।

কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয়: ফাতাওয়া আলমগীরীর এই বক্তব্য অবশিষ্ট পথের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, যদি অবশিষ্ট পথ সফর দূরত্বের কম হয়, তবে একা যাওয়া জায়েজ।

তবে হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত হলো: সম্পূর্ণ সফরটাই মাহরামের সাথে হওয়া আবশ্যক, যদি মূল সফর শরীয়তের সফর হয়। কারণ নিষেধাজ্ঞা মূল সফরের উপর আরোপিত, আংশিকের উপর নয়।

রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৪৬৫; ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃ. ৩০৫।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী:

  • মূল গন্তব্যের দূরত্ব: ৩০০ কিমি (শরীয়তের সফর দূরত্বের অন্তর্ভুক্ত)
  • মাহরাম ২৫০ কিমি পর্যন্ত এগিয়ে দেন
  • অবশিষ্ট পথ: ৫০ কিমি (সফর দূরত্বের কম)

হানাফী মাযহাবের প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত অনুযায়ী:

১. যদি মূল সফরটি শরীয়তের সফর দূরত্বের হয় (৭৭ কিমি বা বেশি), তবে সম্পূর্ণ সফরে মাহরামের সাথে থাকা আবশ্যক। মাঝপথে মাহরাম ছেড়ে দেওয়া এবং বাকি পথ একা যাওয়া জায়েজ নয়

২. তবে যদি অবশিষ্ট পথটি সফর দূরত্বের কম হয় এবং নারী নিজ শহর থেকে বের হওয়ার পর মাহরাম ছেড়ে দেয়, তবে ফাতাওয়া আলমগীরীর বক্তব্য অনুযায়ী জায়েজ হওয়ার সুযোগ আছে — তবে এটি অপ্রাধান্য মত এবং সতর্কতা (ইহতিয়াত) হলো মাহরামের সাথে সম্পূর্ণ সফর করা।

৩. সর্বোত্তম ও নিরাপদ পথ: মাহরামকে সম্পূর্ণ গন্তব্য পর্যন্ত সাথে নেওয়া, অথবা গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর পর কোনো নির্ভরযোগ্য মাহরামের সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার ব্যবস্থা করা।

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.)-এর ফাতাওয়া অনুযায়ী: এই অবস্থায় এগিয়ে দিয়ে আসা এবং বাকিটুকু নিজে নিজে চলে যাওয়া জায়েজ নয়, কারণ মূল সফরটি শরীয়তের সফর হিসেবে গণ্য এবং সফরের কোনো অংশেই মাহরাম ছাড়া যাওয়া নারীর জন্য বৈধ নয়।

রেফারেন্স: ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃ. ৩০৫-৩০৬; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৪৬৪-৪৬৫; ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৯; আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ৮০।


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|------| | মূল সফর ৩০০ কিমি (সফর দূরত্ব) | মাহরাম আবশ্যক | | মাহরাম ২৫০ কিমি এগিয়ে দেওয়া | যথেষ্ট নয় | | অবশিষ্ট ৫০ কিমি একা যাওয়া | জায়েজ নয় (প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত) | | ফাতাওয়া আলমগীরীর মত | অবশিষ্ট পথ সফর দূরত্বের কম হলে জায়েজের সুযোগ | | সতর্কতা (ইহতিয়াত) | সম্পূর্ণ সফর মাহরামের সাথে করা |

উত্তর: প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী, এগিয়ে দিয়ে আসা এবং বাকিটুকু নিজে নিজে চলে যাওয়া জায়েজ হবে না। কারণ মূল সফরটি শরীয়তের সফর দূরত্বের অন্তর্ভুক্ত, আর নারীর জন্য শরীয়তের সফরে সম্পূর্ণ পথ মাহরামের সাথে থাকা আবশ্যক। হ্যাঁ, যদি অবশিষ্ট পথ সফর দূরত্বের কম হয় এবং কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা থাকে, তবে ফাতাওয়া আলমগীরীর মত অনুযায়ী জায়েজের সুযোগ আছে — তবে সতর্কতামূলক পথ হলো মাহরামের সাথে সম্পূর্ণ সফর করা



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.