ইস্তিখারা কি কেন ও কিভাবে করতে হয়? বিস্তারিত জানতে চাই
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: ইস্তিখারার বিস্তারিত মাসআলা
প্রশ্ন:
১. ইস্তিখারার নিয়ম
২. ইস্তিখারার দুআ
৩. ইস্তিখারার দুআ কয়বার পড়তে হবে?
৪. ইস্তিখারার ফলাফল বুঝবেন কীভাবে?
৫. এক দিনের মধ্যে ইস্তিখারার উত্তর পাওয়া সম্ভব? কালকের মধ্যে উত্তর লাগলে কী করব?
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
শরিয়তে ইস্তিখারা একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল, যা কোনো বৈধ কাজের ভালো-মন্দ বুঝতে ও আল্লাহর নিকট কল্যাণ প্রার্থনায় করা হয়। নিম্নে পাঁচটি বিষয়ের উত্তর হানাফি ফিকহের কিতাব ও সহিহ হাদিসের আলোকে দেওয়া হলো।
১. ইস্তিখারার নিয়ম
ইস্তিখারা করার পূর্বে নিম্নলিখিত শর্ত ও নিয়মাবলি পালন করা কর্তব্য:
- পবিত্রতা: ইস্তিখারা পড়ার সময় ওযু করা সুন্নত। নামাজের মতো পবিত্র থাকা উত্তম।
- তাহাজ্জুদের সময়: ইস্তিখারা সাধারণত তাহাজ্জুদের সময় উত্তম, তবে যেকোনো সময় পড়া যাবে।
- নফল নামাজ: দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে সালাম ফিরানোর পর ইস্তিখারার দুআ পড়তে হয়। এই নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা নয়, বরং নফল হিসেবে আদায় করতে হবে।
- নিয়ত: মনে মনে নিয়ত করা যে, "আমি ইস্তিখারার নিয়তে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ছি।"
- সূরা পাঠ: প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কাফিরুন (قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ) এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ) পাঠ করা মুস্তাহাব। তবে অন্য সূরা পড়লেও চলবে। (বাহেশতি জেওর, পৃষ্ঠা ২৩১)
নামাজের পর দুআ: নামাজ শেষে আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ শরিফ পড়ে নিম্নলিখিত দুআ পড়তে হয়।
২. ইস্তিখারার দুআ
দুআটি হাদিস শরিফে এসেছে। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের সব কাজে ইস্তিখারা শেখাতেন যেমন কুরআনের সূরা শেখাতেন। তিনি বলতেন:
আরবি: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ، فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلاَ أَقْدِرُ، وَتَعْلَمُ وَلاَ أَعْلَمُ، وَأَنْتَ عَلاَّمُ الْغُيُوبِ، اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي - أَوْ قَالَ: عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ - فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي، ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ، وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي - أَوْ قَالَ: فِي عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ - فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ، وَاقْدُرْ لِيَ الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ، ثُمَّ أَرْضِنِي بِهِ.
উচ্চারণ:
"আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্তাখিরুকা বিইলমিকা, ওয়া আস্তাক্বদিরুকা বি-কুদরাতিকা, ওয়া আসআলুকা মিন ফাদলিকাল আজীম। ফাআন্নাকা তাক্বদিরু ওয়া লা আক্বদিরু, ওয়া তা‘লামু ওয়া লা আ‘লামু, ওয়া আন্তা ‘আল্লামুল গুয়ূব। আল্লাহুম্মা ইন কুনতা তা‘লামু আন্না হাযাল আমরা খায়রুল লি ফী দীনী ওয়া মাআশী ওয়া ‘আকিবাতি আমরী - আও ক্বালা: ফী ‘আজিলি আমরী ওয়া আজিলিহি - ফাক্বদিরহু লী ওয়া ইয়াসসিরহু লী, সুম্মা বারিক লী ফীহি। ওয়া ইন কুনতা তা‘লামু আন্না হাযাল আমরা শাররুল লি ফী দীনী ওয়া মাআশী ওয়া ‘আকিবাতি আমরী - আও ক্বালা: ফী ‘আজিলি আমরী ওয়া আজিলিহি - ফাসরিফহু ‘আন্নী ওয়াসরিফনী ‘আনহু, ওয়াক্বদির লিয়াল খায়রা হাইসু কানা, সুম্মা আরদিনী বিহী।"
অর্থ:
"হে আল্লাহ! আমি তোমার জ্ঞানের মাধ্যমে তোমার কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করছি, তোমার ক্ষমতার মাধ্যমে তোমার কাছে শক্তি চাচ্ছি এবং তোমার মহা অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমতাবান, আমি ক্ষমতাবান নই; তুমি জান, আমি জানি না; আর তুমি অদৃশ্যের জ্ঞানী। হে আল্লাহ! যদি তুমি জানো যে, এই কাজটি (এখানে কাজের নাম বলবে) আমার দীন, দুনিয়া ও পরিণতির জন্য কল্যাণকর, তাহলে তা আমার জন্য নির্ধারণ করো, সহজ করে দাও এবং তাতে বরকত দাও। আর যদি তুমি জানো যে, এই কাজটি আমার দীন, দুনিয়া ও পরিণতির জন্য অকল্যাণকর, তাহলে তা আমার থেকে সরিয়ে নাও এবং আমাকে তা থেকে সরিয়ে দাও। আর যেখানেই কল্যাণ রয়েছে, আমার জন্য তা নির্ধারণ করো, তারপর আমাকে তাতে সন্তুষ্ট করে দাও।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬২; তিরমিজি, হাদিস: ৪৮০)
দুআ পড়ার নিয়ম:
- প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা (আলহামদু লিল্লাহ) ও রাসূলের প্রতি দরুদ শরিফ পাঠ করবেন।
- তারপর উপরের দুআটি পড়বেন। দুআয় 'হাযাল আমরা' বলার সময় যে কাজের জন্য ইস্তিখারা করছেন, তার নাম মনে মনে বলবেন।
- শেষে আবার দরুদ পড়বেন। (আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৩৩; ইমাম নববী, আল-আযকার)
৩. ইস্তিখারার দুআ কয়বার পড়তে হবে?
ইস্তিখারা করার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। একবার করলেই যথেষ্ট। তবে উত্তম হলো সাতবার বা ততক্ষণ পর্যন্ত পড়া যতক্ষণ না মনে প্রশান্তি আসে। হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করলে সে যেন দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে..." (বুখারি) – এখানে একবারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ইমাম ইবনুল হুমাম (রহ.)-এর মতো হানাফি ফকিহগণ বলেছেন: প্রয়োজনে বারবার ইস্তিখারা করা জায়েজ। (ফাতাওয়া উসমানি, ৫/৪২; রদ্দুল মুহতার, ২/৪৫৭)
সংক্ষেপে:
- ন্যূনতম একবার দুই রাকাত নামাজ ও দুআ পড়া ফরজ নয়, তবে সুন্নত।
- সাতবার পর্যন্ত পড়া মুস্তাহাব।
- যতক্ষণ না মন সায় দেয়, ততক্ষণ পড়তে পারেন। (বাহেশতি জেওর)
৪. ইস্তিখারার ফলাফল বুঝবেন কীভাবে?
ইস্তিখারার ফলাফল সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে যে, স্বপ্নে কিছু দেখতে হবে। আসলে ইস্তিখারার মূল ফলাফল হলো মনে প্রশান্তি বা অনীহা সৃষ্টি হওয়া। হানাফি ফিকহের কিতাবে এসেছে:
- ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার (২/৪৫৭) এ বলেন: "ইস্তিখারা করার পর যদি কাজটি করা সহজ হয় এবং মনে প্রশান্তি আসে, তাহলে বুঝতে হবে তা কল্যাণকর। আর যদি বাধা-বিপত্তি দেখা দেয় বা মন সংকুচিত হয়, তাহলে তা অকল্যাণকর।"
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ফাতাওয়া উসমানি (৫/৪২-৪৩) এ বলেন: "ইস্তিখারার ফলাফল বুঝতে স্বপ্নের প্রয়োজন নেই। বরং কাজ করতে গেলে যদি সহজ হয় এবং অন্তর সায় দেয়, তাহলে ভালো। আর যদি কষ্ট হয় ও মন না মানে, তাহলে পরিহার করাই উচিত।"
- মুফতি তকী উসমানি (দা.বা.) এর মতে: "ইস্তিখারার পর কিছু স্বপ্ন দেখাও হতে পারে, কিন্তু তা শর্ত নয়। বাস্তবে কাজের সুবিধা-অসুবিধা ও মানসিক অবস্থাই মূল মাপকাঠি।" (ইসলাহি খুতুবাত, ২/২৩৪)
সতর্কতা:
ইস্তিখারার উত্তর পেতে কোনো বস্তু বা ব্যক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণী করা, কোরআন খোলা বা তাস পড়া হারাম। এটি শিরকি কাজ। ইস্তিখারা শুধু আল্লাহর কাছে দুআ, তাই ধৈর্য ধরে আল্লাহর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে।
৫. এক দিনের মধ্যে ইস্তিখারার উত্তর পাওয়া সম্ভব? কালকের মধ্যে উত্তর লাগলে কী করব?
এক দিনের মধ্যে উত্তর পাওয়া সম্ভব?
হ্যাঁ, সম্ভব। তবে সময়সীমা নির্ধারণ করার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ যেকোনো সময় উত্তর দিতে পারেন। কখনো কখনো ইস্তিখারা করার সাথে সাথেই অন্তরে প্রশান্তি চলে আসে, আবার কখনো কয়েক দিন বা সপ্তাহও লাগতে পারে। হাদিসে এসেছে: "তোমাদের কেউ ইস্তিখারা করলে, সে যেন ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করে এবং অন্তরের প্রশান্তি অনুভব করে।" (বুখারি) – অর্থাৎ উত্তর এলেই কাজ করা উচিত, কিন্তু তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। (তিরমিজি, হাদিস: ৪৮০)
কালকের মধ্যে উত্তর লাগলে কী করবেন?
যদি জরুরি প্রয়োজন হয়, তাহলে নিম্নলিখিত পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন:
- বেশি বেশি ইস্তিখারা করুন: সাতবার বা তার বেশি নামাজ পড়ুন ও দুআ করুন। হাদিসে এসেছে: "তিনবার ইস্তিখারা করো" (ইবনে হিব্বান) – এটি জরুরি অবস্থায় বেশি পড়ার প্রমাণ।
- ইসলাহ (পরামর্শ) নিন: ইস্তিখারার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদের সাথে পরামর্শ করতেন। (সুরা শুরা: ৩৮)
- অন্তরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করুন: নামাজ-দুআ শেষে যদি কোনো দিকেই মন সায় না দেয়, তাহলে যেটি করতে বেশি ভালো লাগে, সেটি করুন। কেননা হাদিসে আছে: "ইস্তিখারা করা ব্যক্তি যেন তার মনের দিকে তাকায়, যদি মনে প্রশান্তি পায়, তাহলে সে কাজ করবে।" (বুখারি)
- মাসজিদের শায়খের কাছে যান: চরম জরুরি অবস্থায় কোনো বড় আলেমের নিকট ইস্তিখারা করানো ও দোয়া চাওয়াও জায়েজ। তবে সাধারণত নিজেই আমল করা উত্তম। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৮)
মনে রাখবেন:
ইস্তিখারার উত্তর না পাওয়া মানে আল্লাহ আপনার জন্য ভালো কিছু ঠিক করছেন। ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। যদি সময় কম থাকে এবং কোনো স্পষ্ট উত্তর না পান, তাহলে এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন বা সবচেয়ে নিরাপদ পথ বেছে নিন। আল্লাহ তাআলা বলেন: "যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সুরা তালাক: ৩)
সারসংক্ষেপ:
| বিষয় | উত্তর | |--------|--------| | ১. নিয়ম | দুই রাকাত নফল নামাজ (সূরা কাফিরুন ও ইখলাস পড়া উচিত), নামাজের পর দরুদ ও ইস্তিখারার দুআ পড়া। | | ২. দুআ | উল্লিখিত দুআ (বুখারি) পাঠ করা। | | ৩. কতবার | ন্যূনতম একবার, উত্তম সাতবার বা যতক্ষণ না মন প্রশান্ত হয়। | | ৪. ফলাফল | স্বপ্ন দেখার প্রয়োজন নেই; কাজ সহজ হওয়া, অন্তরের প্রশান্তি বা অনীহা ইত্যাদি দ্বারা বোঝা যায়। | | ৫. সময় | আল্লাহ যেকোনো সময় উত্তর দিতে পারেন; জরুরি অবস্থায় অধিক ইস্তিখারা ও পরামর্শ করা জায়েজ। |
গ্রন্থসূত্র:
- সহিহ বুখারি (হাদিস: ১১৬২)
- সহিহ মুসলিম (হাদিস: ৭৩৯)
- তিরমিজি (হাদিস: ৪৮০)
- রদ্দুল মুহতার (২/৪৫৭) – ইবনে আবেদীন
- ফাতাওয়া উসমানি (৫/৪২-৪৩) – মুফতি মুহাম্মদ শফি
- বাহেশতি জেওর (পৃষ্ঠা ২৩১-২৩২) – মাওলানা আশরাফ আলী থানভী
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩৫৮)
- উসুলুশ শাশী (ফিকহি উসুল)