মদিনাকে ইয়াসরিব ডাকা প্রসঙ্গে
Halal and Haram · Hanafi
Question
প্রশ্ন হলো, রাসুল ﷺ মদিনাকে ইয়াসরিব ডাকতে নিষেধ করেছিলেন। এই লিখা যুক্ত ছবি কেউ প্রচার করলে বা কেউ প্রোফাইল পিকচারে দিলে রাসুল ﷺ এর কথার অবমাননা হবে না? উনি ﷺ তো এটা নিষেধ করেছলেন।
Answer
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
একটি চ্যানেল থেকে আবেগঘন লেখা দিয়ে পোস্টার তৈরি করা হয়েছে। লেখাটি হলো: "ইয়াসরিব হে ইয়াসরিব! এ কাকে বুকে নিয়ে তুমি মদিনা হলে। এ কাকে হারিয়ে আমি বিরান হলাম!" প্রশ্ন হলো—রাসূল ﷺ মদিনাকে 'ইয়াসরিব' নামে ডাকতে নিষেধ করেছিলেন। এই লেখাযুক্ত ছবি কেউ প্রচার করলে বা প্রোফাইল পিকচারে দিলে রাসূল ﷺ-এর কথার অবমাননা হবে কি না?
বিস্তারিত উত্তর
১. মদিনাকে 'ইয়াসরিব' নামে ডাকা নিষিদ্ধ হওয়ার দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনার পুরনো নাম 'ইয়াসরিব' ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছেন। হাদিসে এসেছে—
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «مَنْ قَالَ لِلْمَدِينَةِ يَاسِرِيبَ فَلْيَقُلْ الْمَدِينَةَ»
আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি মদিনাকে 'ইয়াসরিব' বলবে, সে যেন (সংশোধন করে) 'মদিনা' বলে।"
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৭৭; মুসনাদে আহমাদ: ৮৯৭১; সহীহ ইবনে হিব্বান: ৩৭৪১)
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, মদিনার প্রকৃত নাম ছিল 'ইয়াসরিব', কিন্তু রাসূল ﷺ তা পরিবর্তন করে 'মদিনা' (বা 'তাইবা') নামকরণ করেন এবং পুরনো নাম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন। (ফাতহুল বারী, খণ্ড: ৪, পৃ: ৯৭)
আল্লামা আইনী (রহ.) বলেন, নিষেধের কারণ হলো—'ইয়াসরিব' শব্দটি আরবি 'তাসরীব' (ভৎসনা/দোষারোপ) শব্দ থেকে উদ্ভূত, যা নিন্দাসূচক। (উমদাতুল কারী, খণ্ড: ১৭, পৃ: ২৩৫)
২. প্রশ্নে উল্লিখিত লেখার বিশ্লেষণ
প্রশ্নে উল্লিখিত লেখাটি একটি আবেগঘন শোকগাঁথা—যা মূলত হিজরতের সময় মদিনার (তৎকালীন ইয়াসরিবের) প্রতি সম্বোধন করে বলা হয়েছে। এখানে লক্ষণীয়:
- লেখাটিতে 'ইয়াসরিব' শব্দটি সরাসরি মদিনাকে সম্বোধন করে ব্যবহার করা হয়েছে।
- রাসূল ﷺ স্পষ্টভাবে মদিনাকে 'ইয়াসরিব' নামে ডাকতে নিষেধ করেছেন।
- লেখাটি যদি রাসূল ﷺ-এর নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে অজ্ঞতাবশত লেখা হয়, তবে তা ভিন্ন বিষয়; কিন্তু জেনে-শুনে প্রচার করা নিষেধাজ্ঞার সরাসরি লঙ্ঘন।
৩. ফিকহি বিধান
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী:
- রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ বা নির্দেশের বিপরীত কোনো কাজ করা—বিশেষত তা যদি তাঁর নিষেধাজ্ঞার সরাসরি লঙ্ঘন হয়—তা গুনাহ।
- তবে তা কুফর বা সরাসরি অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে কি না, তা নির্ভর করে নিয়ত ও উদ্দেশ্যের উপর।
ইমাম ইবনে আবিদিন শামী (রহ.) বলেন:
"الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى"
"কাজগুলো নিয়তের উপর নির্ভরশীল; প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তা-ই রয়েছে, যা সে নিয়ত করেছে।"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ১, পৃ: ১৩৫)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন, রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহর বিপরীত কাজ—যদি তা ইচ্ছাকৃতভাবে এবং অবহেলাবশত করা হয়—তা থেকে বিরত থাকা wajib। তবে সাধারণ মুসলিম যদি অজ্ঞতাবশত করে, তবে তাকে সদুপদেশ দেওয়া উচিত, সরাসরি তাকফির করা নয়। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ১, পৃ: ২৪৭)
৪. সিদ্ধান্ত
| বিষয় | বিধান | |------|------| | মদিনাকে 'ইয়াসরিব' বলা | রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী নিষিদ্ধ | | জেনে-শুনে এই লেখা প্রচার করা | গুনাহ, কারণ এটি রাসূল ﷺ-এর নিষেধাজ্ঞার সরাসরি লঙ্ঘন | | প্রোফাইল পিকচারে দেওয়া | একই বিধান—নিষিদ্ধ, কারণ এতে নিষেধাজ্ঞার প্রচার হয় | | অজ্ঞতাবশত করলে | সদুপদেশ দেওয়া কর্তব্য; তাওবা করতে হবে | | সরাসরি কুফর/অবমাননা | নিয়তের উপর নির্ভরশীল; সাধারণভাবে কুফর নয়, তবে গুনাহে কবিরার কাছাকাছি |
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) এর বক্তব্য:
"রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ বা নির্দেশের বিপরীত কাজ করা—যদি তা ইচ্ছাকৃত হয়—তা থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলিমের উপর wajib। আর যদি কেউ তা জেনে-শুনে করে, তবে সে গুনাহগার হবে।"
(মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড: ১, পৃ: ২৩৫)
৫. করণীয়
- এই লেখাযুক্ত ছবি প্রচার করা থেকে বিরত থাকুন।
- প্রোফাইল পিকচারে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
- যদি কেউ অজ্ঞতাবশত করে থাকে, তবে তাকে সদুপদেশ দিন।
- তাওবা করুন এবং ভবিষ্যতে রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহর প্রতি সম্মান রক্ষা করুন।
- মদিনাকে সর্বদা 'মদিনা' বা 'মদিনাতুল মুনাওয়ারা' নামে ডাকুন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
রাসূল ﷺ মদিনাকে 'ইয়াসরিব' নামে ডাকতে নিষেধ করেছেন (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৭৭)। প্রশ্নে উল্লিখিত লেখাটিতে সরাসরি 'ইয়াসরিব' শব্দটি মদিনাকে সম্বোধন করে ব্যবহার করা হয়েছে, যা রাসূল ﷺ-এর নিষেধাজ্ঞার সরাসরি লঙ্ঘন। জেনে-শুনে এই লেখা প্রচার করা বা প্রোফাইল পিকচারে দেওয়া গুনাহ। তবে এটি সরাসরি কুফর বা অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে না—যদি না নিয়ত খারাপ হয়। অজ্ঞতাবশত করলে সদুপদেশ ও তাওবা কর্তব্য।
রেফারেন্স
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৭৭
- মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৮৯৭১
- সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৩৭৪১
- ফাতহুল বারী, খণ্ড: ৪, পৃ: ৯৭
- উমদাতুল কারী, খণ্ড: ১৭, পৃ: ২৩৫
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ১, পৃ: ১৩৫
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ১, পৃ: ২৪৭
- মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড: ১, পৃ: ২৩৫