মাজুর ব্যক্তির মসজিদে যেতে পারবে কিনা
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: প্রস্রাবের পর দু-এক ফোঁটা বের হওয়া এবং ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ আসা — এ অবস্থায় মসজিদে নামায পড়া যাবে কি?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, তিনি মসজিদে গিয়ে নামায পড়তে পারবেন, তবে শর্ত হলো — তিনি "সাহিবে উযর" (معذور) হিসেবে গণ্য হবেন কি না তা নির্ধারণ করতে হবে। যদি তিনি সাহিবে উযর হন, তাহলে প্রত্যেক নামাযের ওয়াক্তে একবার উযু করে মসজিদে গিয়ে জামাতে নামায পড়তে পারবেন, এমনকি নামাযের মধ্যে ফোঁটা বের হলেও নামায ভঙ্গ হবে না। আর যদি সাহিবে উযর না হন, তাহলে নামাযের আগে উযু করে, পবিত্র কাপড় পরে, মসজিদে গিয়ে নামায পড়তে পারবেন — তবে নামাযের মধ্যে যদি নাপাকি বের হয়ে কাপড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে।
বিস্তারিত আলোচনা
১. সমস্যাটি কী — "সালসুল বাওল" (سلس البول)
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থা — প্রস্রাবের পর দু-এক ফোঁটা বের হওয়া, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাবের পরপরই আবার বেগ আসা — এটিকে ফিকহের পরিভাষায় "সালসুল বাওল" (প্রস্রাবের অসংযম) বলা হয়। এটি একটি রোগ, যা অনেকের হয়। ইসলাম এ ব্যাপারে সহজ বিধান দিয়েছে।
২. "সাহিবে উযর" বা "মা'যুর" কে?
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, কেউ সাহিবে উযর (معذور) হবেন তখনই, যখন নিম্নলিখিত শর্ত পূরণ হবে:
এক নামাযের ওয়াক্ত থেকে পরবর্তী নামাযের ওয়াক্ত পর্যন্ত পুরো সময়ে অন্তত একবারও এমন বিরতি পাওয়া যায় না, যাতে উযু করে নামায পড়া যায়।
অর্থাৎ, যদি ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়া থেকে যোহরের ওয়াক্ত শুরু হওয়া পর্যন্ত পুরো সময়ে একবারও এমন সুযোগ না হয় যে, তিনি উযু করে নামায আদায় করতে পারবেন — তখন তিনি মা'যুর হবেন।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: মা'যুর হওয়ার জন্য পুরো ওয়াক্তে ওযর থাকা শর্ত। যদি ওয়াক্তের কিছু অংশে ওযর থাকে এবং কিছু অংশে না থাকে, তবে তিনি মা'যুর হবেন না।
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত: ওয়াক্তের অধিকাংশ সময়ে ওযর থাকলেই মা'যুর হবে।
ফতোয়ার জন্য প্রাধান্য: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতই প্রাধান্য পায়, তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতও গ্রহণযোগ্য। [রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৩০৫-৩০৬; ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৪১]
৩. মা'যুর ব্যক্তির বিধান
যদি তিনি সাহিবে উযর হন, তাহলে:
- প্রত্যেক নামাযের ওয়াক্তে একবার উযু করবেন — এই উযু দিয়ে ওই ওয়াক্তের ফরজ, সুন্নত, নফল সব নামায পড়তে পারবেন।
- নামাযের মধ্যে ফোঁটা বের হলেও নামায ভঙ্গ হবে না।
- মসজিদে গিয়ে জামাতে নামায পড়তে পারবেন। মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ নয়।
- কাপড়ে নাপাকি লাগলে — যদি কাপড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা এক দিরহাম পরিমাণ (হাতের তালুর গভীরতা) বা তার বেশি হয়, তাহলে নামাযের আগে ধুয়ে নিতে হবে। তবে মা'যুরের ক্ষেত্রে বারবার ধোয়া আবশ্যক নয়; একবার ধুয়ে নামায পড়লে, নামাযের মধ্যে আবার লাগলেও ক্ষতি নেই। [রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৩০৬; ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ১, পৃ. ১৪৫]
৪. যদি তিনি মা'যুর না হন
যদি তিনি মা'যুর না হন (অর্থাৎ ওয়াক্তের মধ্যে কিছু সময় বিরতি পান), তাহলে:
- প্রত্যেক নামাযের জন্য আলাদা উযু করবেন।
- নামাযের আগে পবিত্র কাপড় পরবেন।
- মসজিদে গিয়ে নামায পড়তে পারবেন — তবে নামাযের মধ্যে যদি নাপাকি বের হয়ে কাপড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা এক দিরহাম পরিমাণ বা বেশি হয়, তাহলে নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং পুনরায় উযু করে নামায পড়তে হবে।
- বাসায় নামায পড়া জরুরি নয় — মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ নয়। তবে যদি তিনি জানেন যে, নামাযের মধ্যে নাপাকি বের হবে এবং কাপড় নাপাক হয়ে যাবে, তাহলে বাসায় নামায পড়া উত্তম, যাতে মসজিদ নাপাক না হয়।
৫. মসজিদে যাওয়ার বিধান
মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ নয় — বরং জামাতে নামাযের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়া উচিত নয়। তবে শর্ত হলো:
- মসজিদে নাপাকি ছড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকা। যদি তিনি নিশ্চিত হন যে, নামাযের মধ্যে নাপাকি বের হবে এবং মসজিদের ফ্লোর বা কার্পেট নাপাক হবে, তাহলে বাসায় নামায পড়া উত্তম।
- পবিত্র কাপড় পরে যাওয়া। নাপাক কাপড়ে মসজিদে প্রবেশ করা উচিত নয়।
- মসজিদে প্রবেশের আগে ভালোভাবে ইস্তিঞ্জা করা এবং সম্ভব হলে প্রস্রাবের ফোঁটা বন্ধ করার চেষ্টা করা (যেমন — প্রস্রাবের পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা, হাঁটাচলা করা, বা টিস্যু ব্যবহার করা)।
হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন —
"মসজিদে থুথু ফেলা গুনাহ, আর তার কাফফারা হলো তা মাটিতে পুঁতে ফেলা।" [সহিহ বুখারি, হাদিস ৪১৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৫২]
অর্থাৎ মসজিদকে পবিত্র রাখা জরুরি। তাই যদি নাপাকি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, বাসায় নামায পড়া উত্তম।
৬. ব্যবহারিক পরামর্শ
- প্রস্রাবের পর অন্তত ৫-১০ মিনিট অপেক্ষা করুন — যাতে শেষ ফোঁটাগুলো বের হয়ে যায়।
- টিস্যু বা কাপড়ের টুকরো ব্যবহার করুন — প্রস্রাবের শেষ ফোঁটা শুষে নেওয়ার জন্য।
- প্রস্রাবের পর হাঁটাচলা করুন — এতে ফোঁটা বের হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
- প্রয়োজনে চিকিৎসা নিন — এটি একটি শারীরিক সমস্যা, চিকিৎসা করালে উপকার হবে।
- নামাযের আগে উযু করুন এবং পবিত্র কাপড় পরুন।
- মসজিদে যাওয়ার সময় — যদি নিশ্চিত হন যে নাপাকি ছড়াবে না, তাহলে মসজিদে যান; অন্যথায় বাসায় নামায পড়ুন।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|------| | মা'যুর (সাহিবে উযর) হলে | প্রত্যেক ওয়াক্তে একবার উযু; মসজিদে নামায জায়েয; নামাযের মধ্যে ফোঁটা বের হলেও নামায ভঙ্গ হবে না | | মা'যুর না হলে | প্রত্যেক নামাযের জন্য উযু; মসজিদে যাওয়া জায়েয, তবে নামাযের মধ্যে নাপাকি বের হলে নামায ভঙ্গ | | মসজিদে যাওয়া | নিষিদ্ধ নয়; তবে নাপাকি ছড়ানোর আশঙ্কা থাকলে বাসায় পড়া উত্তম | | কাপড় নাপাক হলে | এক দিরহাম পরিমাণ বা বেশি হলে ধুয়ে নিতে হবে |
মূল কথা: তিনি মসজিদে নামায পড়তে পারবেন — বাসায় নামায পড়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে যদি তিনি মা'যুর না হন এবং নামাযের মধ্যে নাপাকি বের হওয়ার নিশ্চিত আশঙ্কা থাকে, তাহলে বাসায় নামায পড়া উত্তম, যাতে মসজিদ নাপাক না হয় এবং নামায ভঙ্গ না হয়।
রেফারেন্স
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ১, পৃ. ৩০৫-৩০৭ — সাহিবে উযরের বিধান
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৪১ — মা'যুরের উযু ও নামায
- ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ১, পৃ. ১৪৫ — সালসুল বাওল সম্পর্কিত মাসায়েল
- ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৫-১৩৮ — আধুনিক মাসায়েল
- বেহেশতী জেওর, পৃ. ৪৮-৫০ — পবিত্রতার বিধান
- মা'আরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা, আয়াত ২২২-এর তাফসির — পবিত্রতার গুরুত্ব
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৪১৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৫২ — মসজিদের পবিত্রতা