হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে যৌন-সংশ্লিষ্টতা: হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে বিধান।
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে যৌন-সংশ্লিষ্টতা: হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নে বলা হয়েছে—হায়েজ (মাসিক) অবস্থায় স্বামী-স্ত্রী উভয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েন, অতঃপর একে অপরের লজ্জাস্থানে ঘর্ষণ করেন এবং উভয়ের বীর্যপাত ঘটে, কিন্তু ভিতরে প্রবেশ (ইলাজ/দখুল) করেন না। এতে কি গুনাহ হবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, এতে গুনাহ হবে। হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে যৌন-সংশ্লিষ্টতা—বিশেষত লজ্জাস্থান স্পর্শ, ঘর্ষণ, উত্তেজনা ও বীর্যপাত—শরীয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ (হারাম)। তবে যেহেতু ভিতরে প্রবেশ করেননি, তাই এটি যিনা বা কাফফারা-আবশ্যক হদ্দ হিসেবে গণ্য হবে না; বরং এটি হারাম কাজ ও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত এবং এর জন্য তাওবা-ইস্তিগফার আবশ্যক।
কুরআনের দলিল
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ ۖ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ ۖ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىٰ يَطْهُرْنَ ۚ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
"আর তারা আপনাকে হায়েজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, তা হলো অশুচি। সুতরাং হায়েজের সময় তোমরা স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকো এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর তারা যখন পবিত্র হয়, তখন তাদের কাছে গমন করো যেভাবে আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।"
(সূরা আল-বাকারা: ২২২)
দলিলের দিক: আয়াতে "فَاعْتَزِلُوا" (দূরে থাকো) এবং "وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ" (নিকটবর্তী হয়ো না) শব্দ দুটি সাধারণভাবে নিষেধাজ্ঞা বোঝায়। শুধু সহবাস নয়, বরং যৌন-সংশ্লিষ্টতা ও উত্তেজনার যাবতীয় উপায় থেকেও বিরত থাকা কর্তব্য। ফকিহগণ এ আয়াত থেকে দলিল নিয়েছেন যে, হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে যৌন-আনন্দ-সংশ্লিষ্টতা (ইস্তিমতা') নিষিদ্ধ।
হাদিসের দলিল
১. সহিহ মুসলিমের হাদিস
عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ الْيَهُودَ كَانُوا إِذَا حَاضَتِ الْمَرْأَةُ مِنْهُمْ لَمْ يُؤَاكِلُوهَا وَلَمْ يُجَامِعُوهَا فِي الْبَيْتِ، فَسَأَلَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ ﷺ نَبِيَّ اللَّهِ ﷺ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: ﴿وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ﴾ إِلَى آخِرِ الْآيَةِ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «اصْنَعُوا كُلَّ شَيْءٍ إِلَّا النِّكَاحَ»
"আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ইহুদিরা যখন তাদের কোনো নারীর হায়েজ হতো, তখন তারা তার সাথে একত্রে খেত না এবং ঘরে তার সাথে সহবাস করত না। নবী (সা.)-এর সাহাবিগণ আল্লাহর নবী (সা.)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাজিল করেন... তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: 'সহবাস ছাড়া সবকিছু করতে পারো।'"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০২; সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০০)
দলিলের দিক: হাদিসে "إِلَّا النِّكَاحَ" (সহবাস ছাড়া) শব্দটি দ্বারা বোঝা যায়—সহবাস ব্যতীত অন্যান্য কাজ (যেমন একত্রে খাওয়া, ঘুমানো, স্পর্শ) জায়েজ। কিন্তু এখানে লক্ষণীয়: "সহবাস" অর্থ শুধু প্রবেশ নয়; বরং ফকিহগণের পরিভাষায় "নিকাহ" বা "ইলাজ" (প্রবেশ) বোঝায়। তবে লজ্জাস্থান স্পর্শ করে উত্তেজনা ও বীর্যপাত—এটি "নিকাহ" নয়, বরং ইস্তিমতা' (যৌন-আনন্দ গ্রহণ)।
২. হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে শোয়া সম্পর্কে
عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا أَرَادَ أَنْ يُبَاشِرَ بَعْضَ نِسَائِهِ وَهِيَ حَائِضٌ، أَمَرَهَا فَاتَّزَرَتْ، ثُمَّ بَاشَرَهَا
"আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন হায়েজ অবস্থায় কোনো স্ত্রীর সাথে মিলিত হতে চাইতেন, তখন তাকে ইজার (লুঙ্গি) পরতে আদেশ করতেন, অতঃপর তার সাথে মিলিত হতেন।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৩)
দলিলের দিক: এ হাদিসে "মুবাশারাত" (মিলিত হওয়া) দ্বারা সাধারণত স্পর্শ, চুম্বন, আলিঙ্গন বোঝায়—সহবাস নয়। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, "মুবাশারাত" এখানে সহবাস ছাড়া অন্যান্য আনন্দ-সংশ্লিষ্টতা। তবে লজ্জাস্থান স্পর্শ করে বীর্যপাত—এটি এর চেয়েও বাড়া, যা অনেক ফকিহ নিষিদ্ধ বলেছেন।
হানাফি ফিকহের বিস্তারিত আলোচনা
১. হায়েজ অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজসমূহ
হানাফি মাজহাবে হায়েজ অবস্থায় নিম্নলিখিত কাজগুলো নিষিদ্ধ:
| ক্রম | নিষিদ্ধ কাজ | বিধান | |------|-------------|-------| | ১ | সহবাস (ইলাজ/প্রবেশ) | হারাম, কবিরা গুনাহ | | ২ | লজ্জাস্থান স্পর্শ/ঘর্ষণ | হারাম | | ৩ | নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অঙ্গ স্পর্শ | মাকরুহ তাহরিমি | | ৪ | উত্তেজনার সাথে চুম্বন/আলিঙ্গন | মাকরুহ তাহরিমি (কেউ কেউ হারাম বলেছেন) | | ৫ | বীর্যপাত ঘটানো | হারাম |
২. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অঙ্গ স্পর্শ করা মাকরুহ তাহরিমি। আর লজ্জাস্থান স্পর্শ করা বা তাতে ঘর্ষণ করা—এটি আরও কঠিন, যা হারামের কাছাকাছি।
আল-হিদায়া গ্রন্থে এসেছে:
وَلَا يَحِلُّ لِلرَّجُلِ أَنْ يُبَاشِرَ امْرَأَتَهُ الْحَائِضَ فِيمَا بَيْنَ السُّرَّةِ وَالرُّكْبَةِ، وَمَا سِوَى ذَلِكَ مِنْ بَدَنِهَا حَلَالٌ
"হায়েজ অবস্থায় পুরুষের জন্য স্ত্রীর নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশে মুবাশারাত (স্পর্শ) করা হালাল নয়; এছাড়া শরীরের অন্যান্য অংশ হালাল।"
(আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত, বাবুল হায়েজ)
তবে: এখানে "হালাল" বলতে শুধু স্পর্শ করা বোঝানো হয়েছে—উত্তেজনা ও বীর্যপাতের উদ্দেশ্যে নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন, উত্তেজনার সাথে স্পর্শ করাও মাকরুহ।
৩. ইবনে আবিদিন শামি (রহ.)-এর ফতোয়া
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
وَيُكْرَهُ تَحْرِيمًا مُبَاشَرَتُهَا فِيمَا بَيْنَ السُّرَّةِ وَالرُّكْبَةِ، وَكَذَا مَا يُوجِبُ الْإِنْزَالَ مِنْ غَيْرِهِمَا
"নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশে মুবাশারাত করা তাহরিমি মাকরুহ; অনুরূপভাবে অন্যান্য অঙ্গে এমন স্পর্শও (মাকরুহ) যা বীর্যপাত ঘটায়।"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৯২)
স্পষ্ট দলিল: ইবনে আবিদিন (রহ.) স্পষ্ট বলেছেন—বীর্যপাত ঘটায় এমন যেকোনো স্পর্শ হায়েজ অবস্থায় মাকরুহ তাহরিমি। আর মাকরুহ তাহরিমি মানে হারামের কাছাকাছি, যা থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব।
৪. ফতোয়া আলমগিরি
وَلَوْ بَاشَرَ الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ الْحَائِضَ فِيمَا دُونَ الْفَرْجِ فَأَنْزَلَ، فَعَلَيْهِ التَّوْبَةُ وَالِاسْتِغْفَارُ، وَلَا كَفَّارَةَ عَلَيْهِ
"যদি পুরুষ হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর লজ্জাস্থান ছাড়া অন্যত্র মুবাশারাত করে এবং বীর্যপাত ঘটায়, তবে তার উপর তাওবা ও ইস্তিগফার আবশ্যক; কোনো কাফফারা নেই।"
(ফতোয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৭)
দলিলের দিক: এখানে স্পষ্ট—তাওবা ও ইস্তিগফার আবশ্যক, অর্থাৎ এটি গুনাহ। তবে কাফফারা নেই, কারণ প্রবেশ করেননি।
৫. ফতোয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফতোয়া
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস সম্পূর্ণ হারাম। লজ্জাস্থান স্পর্শ করা, উত্তেজনার সাথে চুম্বন-আলিঙ্গন করা—এগুলোও নিষিদ্ধ। যদি বীর্যপাত ঘটে, তবে অবশ্যই তাওবা করতে হবে।"
(ফতোয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ২৪৭-২৪৮)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ইমদাদুল ফতোয়া-য় বলেন:
"হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর লজ্জাস্থান স্পর্শ করা বা তাতে ঘর্ষণ করা—এটি হারাম। বীর্যপাত ঘটলে গুনাহ আরও বাড়ে।"
(ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ১, পৃ. ১৭৯)
৬. বেহেশতি জেওর
আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বেহেশতি জেওর-এ লেখেন:
"হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস করা হারাম। নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অঙ্গ স্পর্শ করা মাকরুহ তাহরিমি। লজ্জাস্থান স্পর্শ করা বা উত্তেজনার সাথে মিলিত হওয়া—এগুলোও নিষিদ্ধ।"
(বেহেশতি জেওর, খণ্ড ১, পৃ. ৪৫)
প্রশ্নের নির্দিষ্ট পরিস্থিতির বিশ্লেষণ
প্রশ্নে বলা হয়েছে:
- হায়েজ অবস্থায় উভয়েই উত্তেজিত
- একে অপরের লজ্জাস্থানে ঘর্ষণ
- উভয়ের বীর্যপাত
- কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করেননি
ফিকহি বিধান:
| দিক | বিধান | |-----|-------| | প্রবেশ (ইলাজ) | হয়নি, তাই হদ্দ/কাফফারা নেই | | লজ্জাস্থান স্পর্শ/ঘর্ষণ | হারাম (ইবনে আবিদিন, ফতোয়া আলমগিরি) | | উত্তেজনা ও বীর্যপাত | হারাম, কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত | | তাওবা | ওয়াজিব | | ইস্তিগফার | আবশ্যক | | ভবিষ্যতে বর্জন | ওয়াজিব |
কেন গুনাহ হবে?
১. কুরআনের নিষেধাজ্ঞা: "وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ" (নিকটবর্তী হয়ো না)—এটি শুধু সহবাস নয়, বরং যৌন-সংশ্লিষ্টতা থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ।
২. হাদিসের নির্দেশ: "اصْنَعُوا كُلَّ شَيْءٍ إِلَّا النِّكَاحَ"—এখানে "নিকাহ" শব্দটি ব্যাপক। ফকিহগণ বলেন, লজ্জাস্থান স্পর্শ করে বীর্যপাত ঘটানোও "নিকাহ"-এর অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং এটি ইস্তিমতা'—যা নিষিদ্ধ।
৩. ইবনে আবিদিনের স্পষ্ট ফতোয়া: "বীর্যপাত ঘটায় এমন স্পর্শ মাকরুহ তাহরিমি"—অর্থাৎ হারামের কাছাকাছি।
৪. ফতোয়া আলমগিরি: "তাওবা ও ইস্তিগফার আবশ্যক"—অর্থাৎ গুনাহ হয়েছে।
তাওবা ও করণীয়
যেহেতু এটি গুনাহ হয়েছে, তাই করণীয়:
১. তাওবা-ইস্তিগফার: আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। ২. ভবিষ্যতে বর্জন: হায়েজ শেষ হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের কাজ সম্পূর্ণ পরিহার করা। ৩. স্ত্রীর হায়েজ শেষ হলে: পবিত্র হওয়ার পর গোসলের পর সহবাস করা জায়েজ। ৪. ইস্তিগফার বেশি বেশি করা: কারণ এটি কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।