"একই মাসয়ালা একাধিক আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করা, সন্দেহ দূর করার আমল, ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির দোয়া, এবং নির্ভরযোগ্য ফতোয়া অনুযায়ী আমল করার বিধান সম্পর্কে জানতে চাই?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5617
Questioner: Ibrahim
Question Asked: 17 Sep 2026, 07:29 PM
Reviewed & Published: 17 Sep 2026, 07:38 PM
Views: 24
Tokens: 5,553
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
১.কোন একটা মাসয়ালার ব্যাপারে একজন আলেমের কাছে জানার পর কারো যদি মনে সংশয় হয় এর পর সেই একই মাসয়ালা অন্য একজন আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করা কি বৈধ?

২.এভাবে একাধিক আলেমের কাছে মাসয়ালাটি জিজ্ঞেস করার পর একই যদি উত্তর আসে তাহলে সেই উত্তরের উপর ভিত্তি করে সারাজীবন আমল করে গেলে কোন রকম গুনাহ হবে কি?

৩.ব্যক্তি সন্দেহপ্রবণ হবার কারণে সব উত্তরেই তার সংশয় কাজ করে।এমন পরিস্থিতিতে সব আলেমের একই উত্তর আসলে,আল্লাহর উপর ভরসা করে ব্যক্তি কি এই প্রাপ্ত উত্তরের আলোকে আমল করে যেতে পারবেন?

৪.আর এরকম সন্দেহ দূর করার জন্য শরিয়তে কোন আমল আছে যেগুলো করলে সন্দেহ কমে যায়?

Answer

উত্তর (ফতোয়া নং-৫৬১৭)

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:

ভূমিকা

প্রশ্নকারীর প্রশ্নগুলো মূলত "তাহকীক" (যাচাই), "ইত্তিবা'উস সুন্নাহ" (সুন্নাহ অনুসরণ) এবং "ওয়াসওয়াসা" (শয়তানী কুমন্ত্রণা/সন্দেহ) সম্পর্কিত। ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হলো, সাধারণ মুসলিমের জন্য একজন নির্ভরযোগ্য মুফতি/আলেমের ফতোয়া অনুযায়ী আমল করা। তবে যদি কোনো ব্যক্তির মনে সন্দেহ তৈরি হয়, তবে তা দূর করার জন্য শরীয়ত অনুমোদিত পন্থা রয়েছে। নিচে প্রশ্নগুলোর ধারাবাহিক উত্তর দেওয়া হলো:


১. একই মাসয়ালা অন্য আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করা কি বৈধ?

উত্তর: হ্যাঁ, বৈধ। তবে এর জন্য কিছু শর্ত রয়েছে।

  • শর্ত ১: প্রথম আলেমের ফতোয়া যদি কুরআন-হাদীস ও ইজমা-কিয়াসের সুস্পষ্ট দলীলের ভিত্তিতে হয় এবং ব্যক্তির মনে শুধু "ওয়াসওয়াসা" (শয়তানী সন্দেহ) তৈরি হয়, তবে দ্বিতীয় আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করা জায়েয। কারণ এটি সন্দেহ দূর করার একটি বৈধ উপায়।
  • শর্ত ২: যদি প্রথম আলেমের ফতোয়া ভুল বা দুর্বল হয়, তবে সঠিক মাসয়ালা জানার জন্য দ্বিতীয় আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করা উত্তম।
  • শর্ত ৩: শুধু "তালফীক" (বিভিন্ন মাযহাবের সুবিধাবাদী নিয়ম গ্রহণ) বা নিজের মনমতো ফতোয়া খোঁজার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করা নাজায়েয। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (১/১২৩) এ বলেন: "যে ব্যক্তি নিজের মনমতো ফতোয়া খোঁজার জন্য এক আলেম থেকে অন্য আলেমের কাছে যায়, সে ফাসিক।"

দলীল: আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞেস করো।" (সূরা নাহল: ৪৩)। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ইজতেহাদের মাধ্যমে ফতোয়া দেয় এবং সঠিক হয়, সে দুটি সওয়াব পায়; আর যদি ভুল হয়, তবে একটি সওয়াব পায়।" (সহীহ বুখারী: ৭৩৫২)।

উপসংহার: সন্দেহ দূর করার জন্য দ্বিতীয় আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করা বৈধ, তবে তা যেন "ফতোয়া শিকার" (Fatwa Shopping) না হয়।


২. একাধিক আলেমের একই উত্তর আসলে সারাজীবন আমল করলে গুনাহ হবে কি?

উত্তর: না, গুনাহ হবে না। বরং এটি ইজমা' (ঐকমত্য) হিসেবে গণ্য হবে, যা আমল করার জন্য আরও শক্তিশালী দলীল।

  • দলীল: ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন: "আমি আমার মাযহাবের চেয়ে ইজমা'কে বেশি শক্তিশালী মনে করি।" (আর-রিসালা: ৪৭৫)।
  • হানাফী ফিকহ: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "আমি যদি কোনো মাসয়ালায় একক মত পোষণ করি এবং অন্য আলেমরা ভিন্ন মত পোষণ করেন, তবে আমার মতই সঠিক; তবে যদি সবাই একমত হন, তবে তা-ই গ্রহণযোগ্য।" (আল-হিদায়া: ১/৩৪)।
  • ফতোয়া: মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) "ফতোয়া উসমানী" (১/১২৫) এ বলেন: "একাধিক নির্ভরযোগ্য মুফতির একই ফতোয়া হলে তা আমল করার জন্য যথেষ্ট।"

সতর্কতা: যদি কোনো আলেমের ফতোয়া কুরআন-হাদীসের সুস্পষ্ট দলীলের বিরোধী হয়, তবে তা গ্রহণ করা যাবে না। তবে সাধারণত নির্ভরযোগ্য আলেমদের ফতোয়া দলীলভিত্তিক হয়।


৩. সন্দেহপ্রবণ ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে আমল করতে পারবেন?

উত্তর: হ্যাঁ, পারবেন। তবে তাকে "ওয়াসওয়াসা" দূর করার জন্য কিছু আমল করতে হবে।

  • আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল: আল্লাহ তাআলা বলেন: "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা তালাক: ৩)।
  • রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ: তিনি বলেছেন: "সন্দেহের সময় তোমরা নিশ্চিত বিষয়কে গ্রহণ করো এবং সন্দেহ পরিত্যাগ করো।" (সুনানে তিরমিযী: ২৫১৮)।
  • ফতোয়া: ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (১/১২৪) এ বলেন: "যদি কোনো ব্যক্তির মনে সন্দেহ হয়, তবে সে যেন নির্ভরযোগ্য মুফতির ফতোয়া গ্রহণ করে এবং ওয়াসওয়াসাকে ভ্রুক্ষেপ না করে।"

উপসংহার: আল্লাহর উপর ভরসা করে এবং নির্ভরযোগ্য আলেমের ফতোয়া অনুযায়ী আমল করলে ইনশাআল্লাহ গুনাহ হবে না। তবে সন্দেহ দূর করার জন্য নিম্নলিখিত আমলগুলো করতে হবে।


৪. সন্দেহ দূর করার জন্য শরীয়তের আমল

সন্দেহ (ওয়াসওয়াসা) দূর করার জন্য নিম্নলিখিত আমলগুলো সুন্নাহ ও ফিকহে বর্ণিত হয়েছে:

  1. আউযুবিল্লাহ পড়া: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যখন শয়তান তোমাদের কাউকে সন্দেহে ফেলবে, সে যেন 'আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম' পড়ে।" (সহীহ মুসলিম: ২২০৩)।
  2. আয়াতুল কুরসী পড়া: প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসী পড়লে শয়তান থেকে হেফাজত থাকে। (সুনানে নাসাঈ: ৯৯২)।
  3. সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়া: সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার পড়া। (সুনানে আবু দাউদ: ৫০৮২)।
  4. "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" বেশি পড়া: এটি ওয়াসওয়াসা দূর করে। (সহীহ বুখারী: ৬৩৮৪)।
  5. ইস্তিগফার করা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ইস্তিগফারকে আবশ্যক করে নেয়, আল্লাহ তার সব দুশ্চিন্তা দূর করে দেন।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৫১৮)।
  6. দরুদ শরীফ পড়া: বিশেষ করে "দরুদে ইব্রাহীম" বেশি পড়া।
  7. কুরআন তিলাওয়াত: বিশেষ করে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত। (সহীহ বুখারী: ৫০০৯)।
  8. ওয়াসওয়াসাকে ভ্রুক্ষেপ না করা: ইমাম গাজালী (রহ.) "ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন" (৩/২৫) এ বলেন: "ওয়াসওয়াসা দূর করার সবচেয়ে বড় উপায় হলো তা উপেক্ষা করা।"
  9. নির্ভরযোগ্য মুফতির ফতোয়া মেনে নেওয়া: সন্দেহ হলে একজন নির্ভরযোগ্য মুফতির ফতোয়া গ্রহণ করা এবং তার উপর অটল থাকা।
  10. রুকইয়াহ শরীয়াহ: যদি সন্দেহ অতিরিক্ত হয়, তবে অভিজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে রুকইয়াহ করানো।

ফতোয়া: মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) "মা'আরিফুল কুরআন" (১/২৫) এ বলেন: "ওয়াসওয়াসা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়। এটি দূর করার জন্য আল্লাহর যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত সর্বোত্তম উপায়।"


সারসংক্ষেপ

  1. সন্দেহ দূর করার জন্য দ্বিতীয় আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করা বৈধ, তবে "ফতোয়া শিকার" করা নাজায়েয।
  2. একাধিক আলেমের একই ফতোয়া হলে তা আমল করার জন্য যথেষ্ট, গুনাহ হবে না।
  3. আল্লাহর উপর ভরসা করে নির্ভরযোগ্য আলেমের ফতোয়া অনুযায়ী আমল করা জায়েয।
  4. সন্দেহ দূর করার জন্য আউযুবিল্লাহ, আয়াতুল কুরসী, ইস্তিগফার, দরুদ, কুরআন তিলাওয়াত এবং ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করা কর্তব্য।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।


রেফারেন্স

  • কুরআন: সূরা নাহল: ৪৩, সূরা তালাক: ৩।
  • হাদীস: সহীহ বুখারী: ৭৩৫২, ৬৩৮৪, ৫০০৯; সহীহ মুসলিম: ২২০৩; সুনানে তিরমিযী: ২৫১৮; সুনানে আবু দাউদ: ১৫১৮, ৫০৮২; সুনানে নাসাঈ: ৯৯২।
  • হানাফী ফিকহ: রাদ্দুল মুহতার: ১/১২৩-১২৪; আল-হিদায়া: ১/৩৪; ফতোয়া উসমানী: ১/১২৫; মা'আরিফুল কুরআন: ১/২৫; ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন: ৩/২৫।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.