অনার্সে সহশিক্ষা বেছে নেওয়া উচিত হবে কি?
Family Life · Hanafi
Question
কিছুদিন পরেই অ্যাডমিশন দিবো। বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে হওয়াতে পরিবার থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—আমি যে সেক্টরেই পড়ি না কেন, ভবিষ্যতে আমাকে জব করতেই হবে।
নার্সিং বেছে না নেওয়ার কারণে মা অসন্তুষ্ট। বাবা বলেছেন, “এমনিতে কোনো মহিলা কলেজে অনার্সে ভর্তি হতে চাইলে হতে পারো, সিদ্ধান্ত তোমার।” ইচ্ছে ছিল এমনিতে কোনো মহিলা কলেজে অ্যাপ্লাই করার, কিন্তু আম্মুর অসন্তুষ্টি থেকে বুঝতে পারছি, পরবর্তীতে এটা নিয়ে পরিবারে ঝামেলা সৃষ্টি হতে পারে।
ইন্টারে আমি সহশিক্ষায় ছিলাম। পরিবারের বর্তমানে আর্থিক সংকট পরিস্থিতি, আমার নিজের দ্বিধা এবং দ্বীনি দিক—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছি।
এখন আমার প্রশ্ন হলো—এখন অনার্সের ক্ষেত্রেও কি আমার সহশিক্ষা বেছে নেওয়াটা উচিত হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
না। শরীয়তের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা (ইখতিলাত/সহশিক্ষা) নিষিদ্ধ। তাই সামর্থ্য ও বিকল্প থাকলে মেয়েদের জন্য শুধু মহিলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বা নারীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনায়) পড়া উচিত। তবে বাস্তবতার নিরিখে যদি মহিলা কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভব না হয়, আর সহশিক্ষা ছাড়া পড়ার কোনো পথই না থাকে, তাহলে শরীয়তের সীমা রক্ষা করে (পর্দা, দৃষ্টি সংযত, নির্জনতা বর্জন, প্রয়োজনীয় যোগাযোগে শিষ্টাচার) পড়াশোনা করা জায়েজ হতে পারে—এটি সাধারণ অনুমতি নয়, বরং বাধ্যবাধকতাজনিত ছাড় (রুখসত)।
১) মূল নীতি: সহশিক্ষা বা অবাধ মেলামেশা ইসলামে নিষিদ্ধ
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا “আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।” — (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ “মুমিনদের বলো, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে; এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।” — (সূরা আন-নূর: ৩০)
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا “আর মুমিন নারীদের বলো, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে, লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে এবং যা প্রকাশ্য তা ছাড়া নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না।” — (সূরা আন-নূর: ৩১)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ “আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।” — (সহীহ বুখারী: ৫০৯৬; সহীহ মুসলিম: ২৭৪০)
إِنَّ الْمَرْأَةَ عَوْرَةٌ، فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ “নারী (সতর্কতার দিক থেকে) আওরাহ; সে যখন বের হয়, শয়তান তার দিকে তাক করে/আকর্ষণ তৈরি করে।” — (সুনানে তিরমিজি: ১১৭৩; মুসনাদে আহমাদ: ১৯২৮৪)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেন:
وَالْخَلْوَةُ بِالْأَجْنَبِيَّةِ حَرَامٌ بِالْإِجْمَاعِ، وَكَذَا النَّظَرُ إلَى وَجْهِهَا لِشَهْوَةٍ “নারী-পুরুষের নির্জন মিলন সর্বসম্মতভাবে হারাম; তেমনি কামনার সাথে পরনারীর মুখ দেখা হারাম।” — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৬৭–৩৬৮, দারুল ফিকর)
ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগিনানি (রহ.) বলেন:
وَلَا يَجُوزُ لِلرَّجُلِ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى الْمَرْأَةِ الْأَجْنَبِيَّةِ إِلَّا إِلَى وَجْهِهَا وَكَفَّيْهَا عِنْدَ الْحَاجَةِ “প্রয়োজন ছাড়া পরনারীর দিকে দেখা জায়েজ নয়; প্রয়োজনে কেবল মুখ ও হাতের কব্জি পর্যন্ত দেখা যাবে।” — (আল-হিদায়া, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
২) সহশিক্ষা বেছে নেওয়ার আগে যা বিবেচ্য
(ক) সামর্থ্য থাকলে মহিলা প্রতিষ্ঠান অগ্রাধিকারযোগ্য
যদি মহিলা কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়, অনলাইন প্রোগ্রাম, বা নারীদের জন্য পৃথক ক্লাস/শাখা থাকে—তাহলে সহশিক্ষার চেয়ে সেটাই বেছে নেওয়া উচিত। কারণ এতে ফিতনার দরজা বন্ধ থাকে এবং দ্বীনি দিক রক্ষা হয়।
(খ) বাধ্যবাধকতা থাকলে ছাড়
যদি—
- মহিলা কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না থাকে,
- পরিবারের আর্থিক সংকট থাকে,
- ভবিষ্যতে চাকরি করার বাধ্যবাধকতা থাকে,
- এবং সহশিক্ষা ছাড়া পড়ার কোনো বিকল্পই না থাকে,
তাহলে শরীয়তের সীমা রক্ষা করে পড়া যেতে পারে। তবে এটি “উচিত” নয়; বরং “বাধ্য হলে অনুমোদিত”।
(গ) পর্দা ও শিষ্টাচার অপরিহার্য
সহশিক্ষায় পড়লে অবশ্যই:
- হিজাব/পর্দা পূর্ণভাবে রক্ষা করা,
- পুরুষ সহপাঠী/শিক্ষকের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা ও মেলামেশা বর্জন,
- নির্জনতা (খালওয়া) এড়িয়ে চলা,
- দৃষ্টি সংযত রাখা,
- প্রয়োজনীয় যোগাযোগে সংক্ষিপ্ত ও শালীন ভাষা ব্যবহার করা।
৩) আপনার প্রশ্নের সরাসরি জবাব
প্রশ্ন: এখন অনার্সের ক্ষেত্রেও কি আমার সহশিক্ষা বেছে নেওয়াটা উচিত হবে?
উত্তর:
- যদি মহিলা কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভব হয়, তাহলে সহশিক্ষার চেয়ে মহিলা প্রতিষ্ঠানকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এটাই দ্বীনি দিক থেকে নিরাপদ ও উত্তম।
- যদি মহিলা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া সম্ভব না হয়, আর পরিবারের আর্থিক সংকট ও ভবিষ্যতের চাকরির বাধ্যবাধকতা থাকে, তাহলে শরীয়তের সীমা রক্ষা করে সহশিক্ষায় পড়া জায়েজ হতে পারে। তবে এটি “উচিত” নয়; বরং “বাধ্য হলে অনুমোদিত”।
- মায়ের অসন্তুষ্টি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ও তাদের সাথে সদাচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا “তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে।” — (সূরা আল-ইসরা: ২৩)
তাই মায়ের সাথে পরামর্শ করে, তার অসন্তুষ্টির কারণ বোঝার চেষ্টা করুন। যদি নার্সিং বাদ দেওয়ার কারণে অসন্তুষ্টি হয়, তাহলে বিকল্প কোনো দ্বীনি-সম্মত পেশা/শিক্ষার বিষয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
৪) ব্যবহারিক পরামর্শ
- মহিলা কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা তৈরি করুন—যেখানে ভর্তি হওয়া সম্ভব।
- অনলাইন/ডিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম খুঁজুন—যেখানে সহশিক্ষার পরিবেশ নেই।
- পরিবারের সাথে পরামর্শ করুন—বিশেষ করে মায়ের সাথে; তার দুশ্চিন্তা ও অসন্তুষ্টি দূর করার চেষ্টা করুন।
- ইস্তিখারা করুন—আল্লাহর কাছে ভালো সিদ্ধান্তের জন্য দোয়া করুন।
- দ্বীনি জ্ঞান অর্জন চালিয়ে যান—যেকোনো পরিবেশে দ্বীনি শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধি জরুরি।
- যদি সহশিক্ষায় পড়তেই হয়, তাহলে পর্দা, দৃষ্টি সংযত, নির্জনতা বর্জন—এসব বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক থাকুন।
৫) উপসংহার
সহশিক্ষা ইসলামে মূলত নিষিদ্ধ; তবে বাধ্যবাধকতা ও বিকল্পের অভাব থাকলে শরীয়তের সীমা রক্ষা করে পড়া জায়েজ হতে পারে। আপনার ক্ষেত্রে যদি মহিলা কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভব হয়, তাহলে সেটাই বেছে নেওয়া উচিত। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে পরিবারের সাথে পরামর্শ করে, দ্বীনি সীমা রক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিন। মনে রাখবেন—দুনিয়ার শিক্ষা ও চাকরির পাশাপাশি আখিরাতের হিসাবও দিতে হবে।
আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে হালাল পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।