বিয়ের উদ্দেশ্যে তেল-পানি পড়া, ঝাঁড়-ফুঁক ব্যবহার করা শরিয়তসম্মত কি?

Family Life · Hanafi

Question No: 5594
Questioner: আফরিন
Question Asked: 17 Sep 2026, 12:13 PM
Reviewed & Published: 17 Sep 2026, 12:34 PM
Views: 21
Tokens: 4,453
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
বিয়ের উদ্দেশ্যে তেল পড়া, পানি পড়া ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে কি?
আমার বিয়ে বিলম্ব হওয়ায় আমার পরিবার মনে করছেন আমার কোন প্রবলেম আছে এই জন্য উনারা একজন ব্যক্তি যিনি ঝাঁড় ফুঁকের মাধ্যমে চিকিৎসা করে থাকেন তার কাছে গিয়েছে তো তিনি বলেছেন তেল, পানি এগুলো পড়ে দিবেন ব্যবহার করার জন্য।

এটা শরিয়াহ সম্মত হবে?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
বিয়ের উদ্দেশ্যে তেল-পানি পড়া, ঝাঁড়-ফুঁক ইত্যাদি ব্যবহার করা শরিয়তসম্মত কি না? আর বিলম্বিত বিবাহের কারণ জানতে গিয়ে ঝাঁড়-ফুঁককারীর কাছে যাওয়া এবং তার দেওয়া তেল-পানি ব্যবহার করা জায়েয হবে কি না?

উত্তর:

সংক্ষেপে:
শরিয়তসম্মত ঝাঁড়-ফুঁক (রুকইয়াহ) জায়েয, তবে তা হতে হবে কুরআনের আয়াত, মাসনূন দুআ ও আল্লাহর নাম দ্বারা, আর বিশ্বাস হতে হবে যে নিরাময় ও উপকার কেবল আল্লাহরই হাতে; তেল-পানিতে পড়া বা ফুঁ দেওয়া নিজে থেকে কোনো প্রভাব ফেলে না। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত অনেক ঝাঁড়-ফুঁককারীর কাজ শরিয়তবিরোধী হয়—তারা গায়রুল্লাহর নাম নেয়, জিন-আসরফের সাহায্য নেয়, অশ্লীল বা শিরকি বাক্য ব্যবহার করে, হাতের রেখা বা অদৃশ্য জ্ঞানের দাবি করে। এমন ব্যক্তির কাছে যাওয়া এবং তার দেওয়া তেল-পানি ব্যবহার করা জায়েয নয়। বিশেষ করে বিবাহ বিলম্বের কারণ জানার জন্য তার কাছে যাওয়া ভবিষ্যৎবাণী ও গায়বের দাবির অন্তর্ভুক্ত, যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।


বিস্তারিত দলিল ও আলোচনা

১. শরিয়তসম্মত ঝাঁড়-ফুঁকের বৈধতা

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ» — সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২০০

অর্থ: “ঝাঁড়-ফুঁকে কোনো দোষ নেই, যতক্ষণ না তাতে শিরক থাকে।”

আউফ ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, আমরা জাহেলি যুগে ঝাঁড়-ফুঁক করতাম। আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার অভিমত কী? তিনি বললেন:

«اعْرِضُوا عَلَيَّ رُقَاكُمْ، لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ» — সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২০০

অর্থাৎ তোমাদের ঝাঁড়-ফুঁক আমার কাছে পেশ করো; শিরকমুক্ত হলে তা জায়েয।

২. তেল-পানি পড়া বা ফুঁ দেওয়ার হুকুম

কুরআনের আয়াত বা মাসনূন দুআ পড়ে পানিতে ফুঁ দেওয়া এবং তা পান করা বা গোসল করা—এটি সালাফদের আমল হিসেবে বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ লিখেছেন:

وَيُكْرَهُ أَنْ يَقْرَأَ عَلَى الْمَاءِ وَالزَّيْتِ وَيَبِيعَهُ، وَأَمَّا إذَا قَرَأَ وَلَمْ يَبِعْهُ بَلْ يَسْتَعْمِلُهُ هُوَ أَوْ يُعْطِيهِ لِلْمَرِيضِ فَلَا بَأْسَ بِهِ — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ৬৬৭ (দারুল ফিকর)

অর্থ: “পানি বা তেলের উপর কুরআন পড়ে তা বিক্রি করা মাকরূহ। কিন্তু যদি নিজে ব্যবহার করে বা রোগীকে দেয়, তবে তাতে দোষ নেই।”

তবে শর্ত হলো:

  • পড়তে হবে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম ও মাসনূন দুআ।
  • বিশ্বাস রাখতে হবে যে প্রভাব কেবল আল্লাহরই হুকুমে হয়; তেল-পানি নিজে থেকে কিছু করতে পারে না।
  • ঝাঁড়-ফুঁককারীকে আকীদা-বিশ্বাসে সহীহ হতে হবে।

৩. বর্তমান যুগে ঝাঁড়-ফুঁককারীদের অবস্থা ও সতর্কতা

বর্তমানে অনেক তথাকথিত ঝাঁড়-ফুঁককারী:

  • জিন-আসরফের সাথে সম্পর্ক রাখে,
  • গায়রুল্লাহর নাম নেয়,
  • হাতের রেখা, তারা, সংখ্যা ইত্যাদি দেখে গায়বের দাবি করে,
  • কুরআনের আয়াতের সাথে শিরকি বাক্য মিশায়,
  • অশ্লীল বা অর্থহীন মন্ত্র পড়ে।

এমন ব্যক্তির কাছে যাওয়া, তার দেওয়া তেল-পানি ব্যবহার করা বা তার কাছে ভবিষ্যৎ বা অদৃশ্য বিষয় জানতে চাওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েয। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً» — সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২৩০

অর্থ: “যে ব্যক্তি কোনো গণক/গায়বের দাবিদারের কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করে, তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হয় না।”

আর যে ব্যক্তি তার কথা বিশ্বাস করে, সে কুফরি করে:

«مَنْ أَتَى عَرَّافًا أَوْ كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ» — মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ৯৫৩২; সহীহ ইবনে হিব্বান

অর্থ: “যে ব্যক্তি গণক বা গায়বের দাবিদারের কাছে গিয়ে তার কথা সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদ ﷺ-এর উপর নাযিলকৃত কিতাবকে অস্বীকার করল।”

৪. বিবাহ বিলম্বের কারণ ও সমাধান

বিবাহ বিলম্ব হওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা, অথবা কোনো প্রাকৃতিক কারণ (পাত্র-পাত্রীর খোঁজ, আর্থিক অবস্থা, পারিবারিক সিদ্ধান্ত ইত্যাদি) হতে পারে। এটি জানার জন্য ঝাঁড়-ফুঁককারীর কাছে যাওয়া শরিয়তে নিষিদ্ধ। বরং করণীয় হলো:

  • ইস্তিগফার ও তাওবা করা,
  • নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা,
  • সূরা ইয়াসিন, সূরা ওয়াকিয়া, সূরা মুযাম্মিল ইত্যাদি তিলাওয়াত করা,
  • “রাব্বি ইন্নি লিমা আনযালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফাকির” (সূরা কাসাস: ২৪) বেশি পড়া,
  • সদকা করা,
  • বিবাহের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা,
  • পাত্র-পাত্রীর খোঁজে সক্রিয় প্রচেষ্টা চালানো।

৫. ফতোয়ায়ে উসমানি ও ইমদাদুল ফতোয়ার বক্তব্য

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফতোয়ায়ে উসমানি»-তে লিখেছেন:

“যদি ঝাঁড়-ফুঁককারী কুরআনের আয়াত পড়ে এবং শিরকি কিছু না করে, তবে তার কাছে ঝাঁড়-ফুঁক করানো জায়েয। কিন্তু যদি সে জিনের সাহায্য নেয়, গায়বের দাবি করে বা শিরকি কাজ করে, তবে তার কাছে যাওয়া জায়েয নয়।” — ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৫

হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.) «ইমদাদুল ফতোয়া»-তে বলেন:

“তেল-পানি পড়া যদি কুরআন-সুন্নাহর দুআ দ্বারা হয় এবং বিশ্বাস সহীহ থাকে, তবে জায়েয। কিন্তু বর্তমানে অনেক ঝাঁড়-ফুঁককারী শিরকি কাজ করে; তাদের থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব।” — ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৭৮


সিদ্ধান্ত

  1. শরিয়তসম্মত ঝাঁড়-ফুঁক (কুরআন, মাসনূন দুআ, আল্লাহর নাম দ্বারা, শিরকমুক্ত) জায়েয। তেল-পানিতে পড়ে নিজে ব্যবহার করা বা রোগীকে দেওয়া জায়েয, তবে বিক্রি করা মাকরূহ।
  2. বর্তমান প্রচলিত ঝাঁড়-ফুঁককারীদের কাছে যাওয়া—যারা জিনের সাহায্য নেয়, গায়বের দাবি করে, শিরকি বাক্য পড়ে—সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম
  3. বিবাহ বিলম্বের কারণ জানতে ঝাঁড়-ফুঁককারীর কাছে যাওয়া ভবিষ্যৎবাণী ও গায়বের দাবির অন্তর্ভুক্ত, যা কুফরির দিকে নিয়ে যায়।
  4. আপনার পরিবারকে বোঝান যে এটি শরিয়তে নিষিদ্ধ। বরং দুআ, ইস্তিগফার, সদকা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
  5. যদি কোনো নির্ভরযোগ্য, সুন্নাহপন্থী আলিম বা রাকী পাওয়া যায় যিনি শিরকমুক্ত ঝাঁড়-ফুঁক করেন, তবে তার কাছ থেকে কুরআনি রুকইয়াহ করানো যেতে পারে; তবে গায়ব জানার উদ্দেশ্যে নয়।

আল্লাহ তাআলা আপনার বিবাহে বরকত দান করুন এবং উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.