খারাপ স্বপ্ন দেখলে কী করবেন?
Family Life · Hanafi
Question
আমি আজ সপ্নে দেখি, যে আমাকে কেউ বলছে যে আমি তোর পেটের বাচ্চা জাদু করে নষ্ট করে দিবোন,সপ্নটা হয়তো ফজরের আগে বা আজানের পরে, তো আমাকে যেন কেউ আকাশে অনেক উচুতে একটা তাল গাছ এর উপরে ভাসিয়ে রাখছে, আর একটা কালো ধোয়ার মত কী জানি আমার পেটে লাগালো, সপ্নের ভিতর সময় টা ছিল ২ টা বা ২:৩০, আমি অনেক চিৎকার পাড়ি কান্না করি কেউ শুনে না, আমাকে যেন আমাদের বাড়ির উঠানে রেখে যায় তখন আমার দাদি বের হয়ে আসে ঘর থেকে, আর আমার পেট থেকেও যেন বাচ্চা শরীর বের না হয়ে হার গোড় বের হচ্ছে। আমার বাচ্চা হয় না ৭-৮ বছর অনেক চেষ্টা করছি এখন হয়নি ,আমি এখন ডাক্তার দেখাচ্ছি ঔষধ খাচ্ছি ৩ মাস হলো, এই মাসে ২ তারিখ হায়েজ হওয়ার কথা হয়নি দেখে আমি ১২- তারিখ পরিক্ষা করি কিন্তু কিছু ই নেই, কখনো এমন সপ্ন দেখিনি আজ প্রথম দেখলাম। এটার কী কোন খারাপ দিক হতে পারে
Answer
খারাপ স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও করণীয়
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার স্বপ্নটি শুনে আমরা প্রথমেই বলতে চাই—এটি নিয়ে ভয় পাওয়ার বা দুশ্চিন্তা করার কোনো কারণ নেই ইনশাআল্লাহ। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের ভয়ংকর স্বপ্নকে "স্বপ্নে শয়তানের খেলা" বা "দুঃস্বপ্ন" বলা হয়, যা শয়তান মানুষের মনে ভয় ও দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করার জন্য দেখিয়ে থাকে। এটি ভবিষ্যতের কোনো অশুভ সংকেত নয়।
১. দুঃস্বপ্ন সম্পর্কে হাদীসের নির্দেশনা
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
"সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, আর দুঃস্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় দেখানো। সুতরাং কেউ যদি অপছন্দনীয় কিছু স্বপ্নে দেখে, সে যেন (বাম দিকে) তিনবার থুথু ফেলে এবং শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে; নিশ্চয়ই তা তার কোনো ক্ষতি করবে না।"
— (সহীহ বুখারী: ৫৭৪৭; সহীহ মুসলিম: ২২৬১)
অন্য হাদীসে এসেছে:
"দুঃস্বপ্ন তিন প্রকার: (১) শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় দেখানো, (২) মানুষের দৈনন্দিন চিন্তা-ভাবনার প্রতিচ্ছবি, (৩) ...। সুতরাং কেউ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে সে যেন দাঁড়িয়ে তিনবার থুথু ফেলে, শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায় এবং যে পাশে শুয়ে ছিল তা পরিবর্তন করে।"
— (সহীহ মুসলিম: ২২৬১)
অর্থাৎ আপনার স্বপ্নটি দুঃস্বপ্নের অন্তর্ভুক্ত, যা শয়তানের কুমন্ত্রণা। এটিকে ভবিষ্যদ্বাণী বা অশুভ লক্ষণ মনে করা সম্পূর্ণ ভুল।
২. দুঃস্বপ্ন দেখলে যা করণীয়
হাদীসের আলোকে করণীয় হলো:
- বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলা (হালকা, মুখে লালা থাকলে সমস্যা নেই)।
- আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম পড়া।
- যে পাশে শুয়ে ছিলেন, অন্য পাশে ফিরে শোয়া।
- কারও কাছে স্বপ্নের কথা না বলা (বিশেষত যারা অশুভ ব্যাখ্যা দিতে পারে)।
- দুই রাকাত নামাজ পড়া (মুস্তাহাব)।
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখা এবং মনে শান্তি রাখা।
রাসূল ﷺ বলেছেন: "সে যেন কারও কাছে তা বর্ণনা না করে।" — (সহীহ মুসলিম: ২২৬৩)
৩. আপনার সন্তান না হওয়ার বিষয়ে
বোন, ৭-৮ বছর সন্তান না হওয়া এবং চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া—এটি একটি পরীক্ষা, যা আল্লাহ তা'আলা আপনার জন্য নির্ধারণ করেছেন। এটি কোনো জাদু-টোনার কারণে হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ইসলামে জাদু-টোনার অস্তিত্ব আছে, তবে প্রতিটি সমস্যাকে জাদুর সাথে সম্পর্কিত করা ভুল। বরং করণীয় হলো:
- আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখা — তিনিই সন্তান দান করেন।
- ইস্তিগফার ও দোয়া করা — বিশেষত হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর দোয়া:
رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ "হে আমার রব! আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পবিত্র সন্তান দান করুন; নিশ্চয়ই আপনি দোয়া শ্রবণকারী।" — (সূরা আলে ইমরান: ৩৮)
- সূরা আম্বিয়া: ৮৯ — হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর দোয়া।
- সদকা করা — নিয়মিত সদকা দুঃখ-কষ্ট দূর করে।
- ডাক্তারের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া — এটি শরীয়তসম্মত কারণ গ্রহণ (আসবাব গ্রহণ)।
- সকাল-সন্ধ্যা আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়া এবং ঘরে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়া।
৪. জাদু থেকে সুরক্ষার দোয়া
নিয়মিত পড়ুন:
- আয়াতুল কুরসি (সূরা বাকারা: ২৫৫)
- সূরা ফালাক ও সূরা নাস (৩ বার সকাল-সন্ধ্যা)
- সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (রাতে)
- "বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মা'আ ইসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামা'ই ওয়া হুয়াস সামিউল আলীম" (৩ বার সকাল-সন্ধ্যা)
- "আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক" (৩ বার)
৫. সিদ্ধান্ত
- আপনার স্বপ্নটি দুঃস্বপ্ন — শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় দেখানো। এটি কোনো অশুভ সংকেত নয়।
- এটি নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না — বরং হাদীসের নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করুন।
- সন্তান না হওয়ার বিষয়ে — আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, দোয়া-ইস্তিগফার করুন, চিকিৎসা চালিয়ে যান।
- জাদুর ভয় — নিয়মিত কুরআনী সুরক্ষার আমল করুন। জাদু-টোনার ভয়ে ডুবে থাকবেন না।
- কারও কাছে স্বপ্নের অশুভ ব্যাখ্যা চাইবেন না — এটি আরও দুশ্চিন্তা বাড়ায়।
আল্লাহ তা'আলা আপনার দুশ্চিন্তা দূর করুন, আপনাকে ধৈর্য দান করুন এবং উত্তম সন্তান দান করুন। আমীন।