স্বপ্নে বিষাক্ত শতপদী, কণখাজুর, সাপ ও মৃত্যু-পুনর্জীবন দেখার ইসলামী ব্যাখ্যা।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5540
Questioner: Yahya Umar
Question Asked: 16 Sep 2026, 09:00 AM
Reviewed & Published: 16 Sep 2026, 11:37 AM
Views: 27
Tokens: 5,370
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একজন বোন ঘুমের মধ্যে বিষাক্ত শতপদী বা কণখাজুর দেখতে পায়‌ শরীর হলুদ রঙের মুখের কাছে ডটের মতন লাল রং। ঘুমের মাঝে মেরেও ফেলে পরে দেখে আবার জীবিত দেখে কিন্তু সেটার কিছু লাল ডট চেঞ্জ হয়ে পুরো হলুদ হয়ে যায় । আগে শুয়ে ছিল মারার পর সাপের মতন আঁকাবাঁকা নড়ে সাপের ফনার মতন ছোবল দেখায় । লেজ পড়ে যায়। এই ফাঁকে বোনটি অন্য কারো দিকেও যেন তাকায় চেহারা মনে নেই। কাজও করে এর ফাঁকে অনেক। এটির ব্যাখ্যা কি হতে পারে ?
উল্লেখ্য,গতকাল একটি বিছা দেখেছিল।

Answer

স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

ভূমিকা

প্রশ্নে উল্লেখিত স্বপ্নটি একটি বিশদ ও অস্বাভাবিক স্বপ্ন। ইসলামী শরীয়তে স্বপ্নের ব্যাখ্যা একটি স্বতন্ত্র বিষয়, যা মূলত ইলমে তাবীর (স্বপ্নের ব্যাখ্যাশাস্ত্র) এর অন্তর্ভুক্ত। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন:


১. স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলা কি ফরজ বা ওয়াজিব?

না। স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলা কোনো ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা নয়। এটি একটি ঐচ্ছিক বিষয় (মুবাহ/মুস্তাহাব পর্যায়ের), যা কেবল কুরআন-হাদীস ও ইলমে তাবীরের সুস্পষ্ট নীতির আলোকে করা যায়।

ইমাম ইবন সীরীন (রহ.)-এর মতো মুফাসসিরে স্বপ্নগণ স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তবে সাধারণ মানুষের জন্য স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত হওয়া বা ভয় পাওয়া উচিত নয়।


২. হাদীসের আলোকে স্বপ্নের প্রকারভেদ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالْحُلْمُ مِنَ الشَّيْطَانِ

"সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর (অশুভ) স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৮৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬৩

অন্য হাদীসে এসেছে:

الرُّؤْيَا ثَلَاثَةٌ: رُؤْيَا صَالِحَةٌ بُشْرَى مِنَ اللَّهِ، وَرُؤْيَا تَحْزِينٌ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَرُؤْيَا مِمَّا يُحَدِّثُ بِهِ الرَّجُلُ نَفْسَهُ

"স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) সুসংবাদের সৎ স্বপ্ন — যা আল্লাহর পক্ষ থেকে, (২) দুঃস্বপ্ন — যা শয়তানের পক্ষ থেকে, (৩) এবং যা মানুষের নিজের মনের কল্পনা।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬৩

সুতরাং প্রশ্নে উল্লেখিত স্বপ্নটি সম্ভবত দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত — অর্থাৎ শয়তানী দুঃস্বপ্ন অথবা মনের কল্পনা/দৈনন্দিন চিন্তার প্রতিফলন।


৩. এই স্বপ্নের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা

(ক) দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার প্রতিফলন

প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে — "গতকাল একটি বিছা দেখেছিল।" এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। ইমাম ইবন সীরীন (রহ.) ও ইমাম নাবুলসী (রহ.)-এর নীতিমালা অনুযায়ী, দিনের কোনো ভয়ংকর বা অস্বাভাবিক দৃশ্য রাতে স্বপ্নে প্রতিফলিত হতে পারে। এটি "হাদীসুন নাফস" (মনের কল্পনা) শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।

(খ) শয়তানী দুঃস্বপ্ন

বিষাক্ত পোকা, সাপ, মৃত্যু ও পুনর্জীবন — এসব দুঃস্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে, যা মুমিনকে ভয় দেখানোর জন্য হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

إِنَّمَا النَّجْوَىٰ مِنَ الشَّيْطَانِ لِيَحْزُنَ الَّذِينَ آمَنُوا

"নিশ্চয়ই (গোপন) কুমন্ত্রণা শয়তানের পক্ষ থেকে, যাতে সে মুমিনদের দুঃখ দেয়।" — সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত ১০

(গ) স্বপ্নে মৃত্যু ও পুনর্জীবন

স্বপ্নে কাউকে মৃত দেখে আবার জীবিত দেখা — এটি সাধারণত দীর্ঘায়ু, সুস্থতা বা কোনো সংকট থেকে উত্তরণের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ইমাম ইবন সীরীন (রহ.) তাঁর "তাফসীরুল আহলাম" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্নে মৃত্যু সবসময় প্রকৃত মৃত্যুর ইঙ্গিত নয়; বরং অনেক সময় এটি তওবা, পরিবর্তন বা নতুন অবস্থার প্রতীক।

(ঘ) হলুদ রঙ

স্বপ্নে হলুদ রঙ সাধারণত অসুস্থতা বা দুশ্চিন্তার ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়। তবে এটি সর্বদা সত্য নয় — অনেক সময় এটি কেবল মনের অবস্থার প্রতিফলন।

(ঙ) সাপের আঁকাবাঁকা নড়াচড়া ও ছোবল

স্বপ্নে সাপ সাধারণত শত্রু বা ঈর্ষাকারী ব্যক্তির প্রতীক। ইমাম ইবন সীরীন (রহ.) বলেন, সাপ স্বপ্নে দেখা শত্রুর ইঙ্গিত দেয়। তবে সাপ যদি ছোবল দেয় কিন্তু ক্ষতি না করে, তবে তা শত্রুর ব্যর্থতার ইঙ্গিত।


৪. ইসলামী শরীয়তের নির্দেশনা — দুঃস্বপ্ন দেখলে কী করবেন?

রাসূলুল্লাহ ﷺ দুঃস্বপ্ন দেখলে নিম্নলিখিত আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন:

إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يَكْرَهُهَا فَلْيَتْفُلْ عَنْ يَسَارِهِ ثَلَاثًا، وَلْيَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَلْيَتَحَوَّلْ عَنْ جَنْبِهِ الَّذِي كَانَ عَلَيْهِ

"যখন তোমাদের কেউ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে, সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে, শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং যে পার্শ্বে শুয়ে ছিল তা পরিবর্তন করে।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬২

অন্য হাদীসে এসেছে:

وَلَا يُحَدِّثْ بِهَا أَحَدًا

"এবং সে যেন তা কারো কাছে বর্ণনা না করে।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬৩

অর্থাৎ:

  1. বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলা (হালকা)
  2. আউযুবিল্লাহ পড়া
  3. শোয়ার পার্শ্ব পরিবর্তন করা
  4. কারো কাছে বর্ণনা না করা
  5. নামাজ পড়া

৫. এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কে সতর্কতা

গুরুত্বপূর্ণ: স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলা একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয়। ইমাম ইবন সীরীন (রহ.) বলতেন, স্বপ্নের ব্যাখ্যা কুরআন, হাদীস, আরবি ভাষার অর্থ ও প্রবাদ-প্রবচনের উপর নির্ভর করে। ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া মারাত্মক হতে পারে।

আপনার প্রশ্নের স্বপ্নটি সম্পর্কে:

  • এটি একটি দুঃস্বপ্ন বা মনের কল্পনা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
  • গতকাল বিছা দেখার কারণে মস্তিষ্কে যে ভয় সৃষ্টি হয়েছে, তা স্বপ্নে প্রতিফলিত হয়েছে।
  • বিষাক্ত পোকা, সাপ, মৃত্যু — এসব ভয়ের প্রতীক, যা শয়তান মুমিনের মনে ঢেলে দেয়।
  • এটি কোনো অশুভ সংকেত বা ভবিষ্যদ্বাণী নয়।

৬. করণীয়

  1. ভয় পাওয়ার কিছু নেই — এটি সাধারণত শয়তানী দুঃস্বপ্ন।
  2. দুঃস্বপ্নের আমলগুলো নিয়মিত পালন করুন।
  3. আয়াতুল কুরসিসূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ে ঘুমান।
  4. স্বপ্নটি কারো কাছে বর্ণনা করবেন না — বিশেষত যারা স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানেন না।
  5. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
  6. বিছা বা বিষাক্ত পোকা থেকে সতর্ক থাকুন — বাস্তব জীবনে সতর্কতা অবলম্বন করুন।
  7. স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করবেন না — এটি দ্বীনের মূল বিষয় নয়।

৭. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিতে স্বপ্নের ব্যাখ্যা

ইমাম ইবন আবিদীন শামী (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলা ইলমে তাবীর নামক একটি পৃথক শাস্ত্র, যা কেবল বিশেষজ্ঞ আলিমগণ জানেন। সাধারণ মানুষের জন্য এটি নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত নয়।

ফাতাওয়া উসমানীইমদাদুল ফাতাওয়া গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করা জায়েয, তবে এর উপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বা ভয় পাওয়া উচিত নয়।


উপসংহার

প্রশ্নে উল্লেখিত স্বপ্নটি শয়তানী দুঃস্বপ্ন বা দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এটি কোনো অশুভ সংকেত নয়। বোনটির উচিত:

  • দুঃস্বপ্নের সুন্নত আমলগুলো পালন করা
  • আয়াতুল কুরসি ও মুআওবিযাত পড়া
  • স্বপ্নটি নিয়ে দুশ্চিন্তা না করা
  • আল্লাহর উপর ভরসা রাখা

মনে রাখবেন: স্বপ্নের ব্যাখ্যা কেবল আল্লাহই ভালো জানেন। আমরা কেবল সম্ভাব্য ইঙ্গিত দিতে পারি। প্রকৃত জ্ঞান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন এবং উত্তম স্বপ্ন দেখার তাওফিক দিন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.