স্বপ্নে অজানা জিনিস খোঁজা, একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে যাওয়া কিন্তু না পাওয়ার স্বপ্নের ইসলামী ব্যাখ্যা।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি প্রায়ই স্বপ্ন দেখি,কোনো একটা জিনিসের খোঁজে আমি বিভিন্ন অচেনা জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছি।বিভিন্ন মানুষের সাথে সাক্ষাৎ করি।স্বপ্নে একেকসময় একেক জায়গা দেখি(কখনো অনেক বড় মাঠ পাড় হয়ে যাচ্ছি,কখনো অনেক আগের দিনের মতো প্রশস্ত বড় বড় মাটির বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছি, কখনো এক জনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছি এমন)অর্থাৎ একজনের কাছে গেলে খোঁজ দেয় অমুকের কাছে পাবা আমি সেখানে যায়,আবার সে আরেক জায়গায় পাঠায়,আমি সেখানে যায়,এমন।কখনো দল বেধে কয়েকজন মিলে ঘুরে বেড়ায়,কখনো একা।কিন্তু,স্বপ্নের শেষে জিনিসটা আমি পায় না।একদম,শেষ মানুষটা আমাকে অপারগতা জানায় যে সে এখন দিতে পারছে না।পরে পাবো এরকম আশ্বাস দেয়,আমি ফিরে আসি।কিন্তু, জিনিসটা কী তা আমি জানি না।কেন খোঁজ করছি তাও জানি না।
এই একই স্বপ্ন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গা নিয়ে আমি বেশ কয়েকবার দেখেছি।আজও দেখেছি।
এখন আমার প্রশ্ন হলো এই স্বপ্নের মাধ্যমে আল্লাহ কী আমাকে কোনো বার্তা দিতে চাচ্ছেন?বার্তা টা কী?
প্রতিবার স্বপ্নের শেষে আমার ঘুম ভেঙে যায় স্বাভাবিকভাবে,মানে কোনো অস্থিরতা বা পেরেশানি থাকে না।স্বপ্নের ঘটনাও অধিকাংশ মনে থাকে।
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: আপনি প্রায়ই একই ধরনের স্বপ্ন দেখেন—কোনো অজানা বস্তু খুঁজতে অচেনা জায়গায় ঘোরাঘুরি, একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে যাওয়া, কিন্তু শেষে বস্তুটি না পাওয়া। জানতে চেয়েছেন—এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বার্তা কি না, আর বার্তাটি কী?
উত্তর:
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি মনে রাখা দরকার। ইসলামী শরীয়তে স্বপ্নকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الرُّؤْيَا ثَلَاثَةٌ: رُؤْيَا الصَّالِحَةِ بُشْرَى مِنَ اللهِ، وَرُؤْيَا تَحْزِينٌ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَرُؤْيَا مِمَّا يُحَدِّثُ بِهِ الْمَرْءُ نَفْسَهُ» — সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩ (ইমাম মুসলিম, রাহিমাহুল্লাহ)
অর্থাৎ স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) সুসংবাদের স্বপ্ন—আল্লাহর পক্ষ থেকে সুখবর; (২) দুঃস্বপ্ন—শয়তানের পক্ষ থেকে কষ্ট দেওয়া; (৩) মন-মগজের ভাবনা বা দৈনন্দিন চিন্তা-কল্পনার প্রতিফলন।
আপনার স্বপ্নটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—এতে কোনো ভয়ংকর দৃশ্য, কষ্ট, আতঙ্ক বা দুঃস্বপ্নের লক্ষণ নেই; বরং স্বপ্ন শেষে স্বাভাবিকভাবে ঘুম ভাঙে, কোনো অস্থিরতা থাকে না। এ ধরনের পুনরাবৃত্ত স্বপ্ন সাধারণত তৃতীয় প্রকার—অর্থাৎ মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, অসম্পূর্ণতার অনুভূতি বা দৈনন্দিন জীবনের কোনো অজানা দুশ্চিন্তার প্রতিফলন। বিশেষ করে "কিছু খুঁজছি কিন্তু পাচ্ছি না"—এটি মানুষের অন্তরের সেই স্বাভাবিক ব্যাকুলতার প্রতিচ্ছবি, যা প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে অনুভব করে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: শরীয়তের নিয়ম হলো—স্বপ্নের ব্যাখ্যা (তাবীর) করা একটি স্বতন্ত্র ইলম, যা কেবল কুরআন-সুন্নাহর আলোকে যোগ্য আলিমগণ করে থাকেন, তাও কেবল সম্ভাব্য অর্থ হিসেবে; নিশ্চিতভাবে "এটাই আল্লাহর বার্তা" বলে ঘোষণা দেওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। ইমাম ইবনে সীরীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতো মুহাদ্দিসীন স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বহু সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং বলতেন, স্বপ্নের ব্যাখ্যা অনেক সময় ব্যক্তির অবস্থা, চরিত্র ও প্রেক্ষাপটের উপর নির্ভর করে।
তবে আপনার স্বপ্নের বিষয়ে কয়েকটি দিক বিবেচনা করা যেতে পারে:
১. এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট বার্তা নয়। আল্লাহ তাআলা ওহী ও রাসূলের মাধ্যমে দ্বীন পূর্ণ করে দিয়েছেন। রাসূল ﷺ-এর ইন্তেকালের পর নতুন কোনো ওহী বা শরীয়তের বিধান আসবে না। সুতরাং স্বপ্নকে দ্বীনের বিধান বা আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রাহিমাহুল্লাহ) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন, স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো হুকুম-আহকাম বা ইবাদত নির্ধারণ করা যায় না।
২. স্বপ্নটি ইতিবাচক দিকেও ইঙ্গিত করতে পারে। আপনি যা খুঁজছেন কিন্তু পাচ্ছেন না—এটি কখনো কখনো অন্তরের সেই স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, যা মানুষ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের সাফল্যের জন্য অনুভব করে। দুনিয়ার কোনো বস্তুই অন্তরকে পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারে না; কেবল আল্লাহর যিকির ও তাঁর নৈকট্যই অন্তরকে প্রশান্তি দেয়। আল্লাহ বলেন:
«أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ» — সূরা আর-রা'দ, আয়াত ২৮
৩. স্বপ্নকে কেন্দ্র করে দুশ্চিন্তা বা অস্থির হওয়ার প্রয়োজন নেই। যেহেতু স্বপ্ন শেষে আপনার কোনো কষ্ট বা ভয় থাকে না, বরং স্বাভাবিকভাবে ঘুম ভাঙে—এটি ইঙ্গিত দেয় যে এটি আপনার মনের স্বাভাবিক প্রবাহ, কোনো বিপদের সংকেত নয়।
৪. করণীয়:
- স্বপ্নকে দ্বীনের নির্দেশ মনে না করে বরং আল্লাহর যিকির, কুরআন তিলাওয়াত, পাঁচ ওয়াক্ত নামায ও দৈনন্দিন দুআ-আযকারে মনোযোগী হোন।
- ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস-ফালাক-নাস পড়ে এবং ডান কাত হয়ে ঘুমানোর সুন্নত পালন করুন।
- দুঃস্বপ্ন বা অস্থির স্বপ্ন দেখলে বাম দিকে থুথু ফেলা, শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং কাত পরিবর্তন করে শোয়ার সুন্নত রয়েছে (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬২)।
- আপনার স্বপ্নের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা জানতে চাইলে কোনো নির্ভরযোগ্য আলিমের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারেন; তবে তা কেবল সম্ভাব্য ধারণা হিসেবে, নিশ্চিত বার্তা হিসেবে নয়।
সারকথা: আপনার স্বপ্নটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট বার্তা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না; বরং এটি মনের গভীর চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে মনোযোগী হওয়াই কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমীন।
References:
- সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬২, ২২৬৩
- সূরা আর-রা'দ, আয়াত ২৮
- ইমাম ইবনে আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার
- ইমাম ইবনে সীরীন, তাফসীরুল আহলাম
- মুফতি মুহাম্মদ শফী, মা'আরিফুল কুরআন
- মুফতি তাকী উসমানী, ফাতাওয়া উসমানী