রুকইয়াহ সম্পর্কে বিস্তারিত ইসলামিক নির্দেশনা.।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5521
Questioner: Sadman
Question Asked: 15 Sep 2026, 10:43 PM
Reviewed & Published: 15 Sep 2026, 10:58 PM
Views: 22
Tokens: 5,783
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ।
এই হাদিসের ব্যাখ্যাটা জানতে চাচ্ছিলাম। এখানে কি রাক্বীদের কাছে যেয়ে রুকইয়াহ করতে নিষেধ করা হয়েছে? পাশাপাশি রুকইয়াহ্ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাচ্ছিলাম।

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত:

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: আমার উম্মতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবেই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা হবে এমন লোক, যারা ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নেয় না, শুভ-অশুভ মানে না এবং তাদের প্রতিপালকের উপরই ভরসা রাখে।

সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬৪৭২
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

আপনার প্রশ্ন দুটি অংশে বিভক্ত: ১. সহীহ বুখারীর ৬৪৭২ নং হাদীসের ব্যাখ্যা — এতে কি রাক্বীদের কাছে গিয়ে রুকইয়াহ করাতে নিষেধ করা হয়েছে? ২. রুকইয়াহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা।


প্রথম অংশ: হাদীসের ব্যাখ্যা

হাদীসের শাব্দিক বিশ্লেষণ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন:

«يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مِنْ أُمَّتِي سَبْعُونَ أَلْفًا بِغَيْرِ حِسَابٍ، هُمُ الَّذِينَ لَا يَسْتَرْقُونَ، وَلَا يَتَطَيَّرُونَ، وَلَا يَكْتَوُونَ، وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ»

অনুবাদ: "আমার উম্মতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা এমন লোক — যারা ইস্তিরকা (রুকইয়াহ করায়) করে না, তাতায়্যুর (কুলক্ষণ) মানে না, কাইয়্য (লোহার দাগ দিয়ে চিকিৎসা) করায় না, এবং তারা তাদের রবের উপরই তাওয়াক্কুল করে।"

(সহীহ বুখারী: ৬৪৭২, সহীহ মুসলিম: ২২০)

মূল শব্দ: «لَا يَسْتَرْقُونَ» (লা ইয়াসতারকূন)

এখানে লক্ষণীয় যে, হাদীসে «لَا يَرْقُونَ» (নিজেরা রুকইয়াহ করে না) বলা হয়নি; বরং «لَا يَسْتَرْقُونَ» (অন্য কারো কাছে রুকইয়াহ করাতে চায় না / রুকইয়াহ করানোর অনুরোধ করে না) বলা হয়েছে। এটি ইফতিআল বাব — যার অর্থ হলো "কোনো কিছু চাওয়া বা অনুরোধ করা"।

হাফেজ ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ)-এর ব্যাখ্যা

ফাতহুল বারীতে ইমাম ইবনু হাজার (রহঃ) বলেন:

"এখানে নিষেধাজ্ঞা রুকইয়াহর মূল বিষয়ের উপর নয়; বরং রুকইয়াহ করানোর প্রতি ঝোঁক ও নির্ভরতা স্থাপনের উপর। কারণ হাদীসের শেষ অংশ «وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ» (তারা রবের উপরই ভরসা করে) — এটাই মূল কারণ। অর্থাৎ যারা চিকিৎসা-সহায়তার উপর ভরসা না করে সরাসরি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে, তারাই এই মর্যাদার অধিকারী।"

(ফাতহুল বারী, হাদীস ৬৪৭২-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)

ইমাম নববী (রহঃ)-এর ব্যাখ্যা

শরহে মুসলিমে ইমাম নববী (রহঃ) বলেন:

"উলামাগণ বলেছেন — এই হাদীসে রুকইয়াহ, কাইয়্য ইত্যাদির নিষেধাজ্ঞা হলো তাওয়াক্কুল পরিপূর্ণ না হওয়ার কারণে। অর্থাৎ যারা এগুলোর উপর ভরসা করে এবং আল্লাহর উপর ভরসা দুর্বল করে ফেলে, তাদের জন্য এগুলো মাকরূহ। আর যারা আল্লাহর উপর ভরসা রেখে শুধু উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করে, তাদের জন্য এতে কোনো নিষেধ নেই।"

(শরহে মুসলিম, কিতাবুল ঈমান)

ইমাম তাহাবী (রহঃ)-এর ব্যাখ্যা

শরহু মা'আনিল আছারে ইমাম তাহাবী (রহঃ) বলেন:

"রুকইয়াহ নিজে নিষিদ্ধ নয়; বরং নিষিদ্ধ হলো রুকইয়াহর উপর ভরসা করা এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল ছেড়ে দেওয়া।"

সিদ্ধান্ত: রাক্বীদের কাছে যাওয়া কি নিষিদ্ধ?

উত্তর: না, সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। হাদীসে যে বিষয়টি নিষিদ্ধ বা কম মর্যাদার কারণ হয়েছে, তা হলো:

  1. রুকইয়াহর উপর ভরসা করা — অর্থাৎ মনে করা যে রুকইয়াহ নিজেই রোগ সারাবে, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া।
  2. তাওয়াক্কুল দুর্বল হয়ে যাওয়া — আল্লাহর উপর ভরসা কমে যাওয়া।

তবে যদি কেউ:

  • আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রেখে,
  • রুকইয়াহকে শুধু একটি উপকরণ (আসবাব) হিসেবে গ্রহণ করে,
  • এবং রুকইয়াহটি শরীয়তসম্মত হয় (কুরআনের আয়াত, দুআ, আল্লাহর নাম দ্বারা),

তাহলে তার জন্য রুকইয়াহ করানো জায়েয ও বৈধ। বরং এটি সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।


দ্বিতীয় অংশ: রুকইয়াহ সম্পর্কে বিস্তারিত

১. রুকইয়াহ কী?

রুকইয়াহ (الرُّقْيَة) শাব্দিক অর্থ: ঝাড়ফুঁক, মন্ত্র, দুআ পড়ে ফুঁ দেওয়া। শরীয়তের পরিভাষায়: কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম, বা মাসনূন দুআ পড়ে রোগীর উপর ফুঁ দেওয়া বা পড়ে শোনানো — যার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে শিফা প্রার্থনা করা হয়।

২. রুকইয়াহর প্রকারভেদ

| প্রকার | বিবরণ | হুকুম | |--------|--------|-------| | শরীয়তসম্মত রুকইয়াহ | কুরআন, আল্লাহর নাম, মাসনূন দুআ দ্বারা | জায়েয, সুন্নাহ | | শিরকী রুকইয়াহ | জিন, শয়তান, অলি-আউলিয়ার নামে, অশ্লীল বা অর্থহীন শব্দে | হারাম, শিরক | | বিদআতী রুকইয়াহ | শরীয়তে অপ্রমাণিত পদ্ধতি, নির্দিষ্ট সংখ্যা-নিয়ম ছাড়া | মাকরূহ/বিদআত |

৩. রুকইয়াহর শরীয়তসম্মত পদ্ধতি

শর্তসমূহ:

  1. কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম বা দুআ দ্বারা হতে হবে।
  2. আরবি বা অর্থবোধক ভাষায় হতে হবে।
  3. বিশ্বাস রাখতে হবে যে রুকইয়াহ নিজে নয়; আল্লাহই শিফা দেন
  4. শিরকী কোনো শব্দ বা বিশ্বাস থাকা যাবে না।

প্রমাণ: আউফ ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, আমরা জাহেলিয়াতের যুগে রুকইয়াহ করতাম। আমরা নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার অভিমত কী?" তিনি বললেন:

«اعْرِضُوا عَلَيَّ رُقَاكُمْ، لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ»

অনুবাদ: "তোমাদের রুকইয়াহগুলো আমার কাছে পেশ করো। রুকইয়াহতে কোনো দোষ নেই, যতক্ষণ না তাতে শিরক থাকে।"

(সহীহ মুসলিম: ২২০০)

৪. নবী (ﷺ) নিজে রুকইয়াহ করতেন

আয়েশা (রাঃ) বলেন:

«كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا أَوَى إِلَى فِرَاشِهِ كُلَّ لَيْلَةٍ جَمَعَ كَفَّيْهِ ثُمَّ نَفَثَ فِيهِمَا فَقَرَأَ: قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ... ثُمَّ مَسَحَ بِهِمَا مَا أَقْبَلَ مِنْ جَسَدِهِ...»

অনুবাদ: "রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রতি রাতে বিছানায় গেলে দুই হাতের তালু একত্র করতেন, তাতে ফুঁ দিতেন, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়তেন, তারপর শরীরের সামনের অংশে হাত বুলাতেন।"

(সহীহ বুখারী: ৫০১৭)

৫. ফুকাহায়ে কেরামের মত

ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর মাযহাব:

  • রুকইয়াহ জায়েয, যদি তা কুরআন বা আল্লাহর নাম দ্বারা হয়।
  • তবে উজরাত (পারিশ্রমিক) নেওয়া — ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর মতে মাকরূহ; ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর মতে জায়েয।

(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ইজারাহ; আল-হিদায়া)

ইবনু আবিদীন শামী (রহঃ) বলেন:

"রুকইয়াহ দ্বারা চিকিৎসা করা জায়েয; বরং এটি সুন্নাহ। তবে শর্ত হলো — শিরকমুক্ত হওয়া এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল থাকা।"

(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬)

মুফতি তাকী উসমানী (দাঃবাঃ) বলেন:

"রুকইয়াহ শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে জায়েয। তবে বর্তমানে অনেক রাক্বী তা ব্যবসায় পরিণত করেছে, অতিরিক্ত টাকা নেয়, অপ্রমাণিত পদ্ধতি ব্যবহার করে — এগুলো থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।"

(ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২)

৬. রুকইয়াহ করানোর সময় করণীয়

  1. নিজে দুআ পড়া: সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত।
  2. নবী (ﷺ)-এর মাসনূন দুআ:
    • «أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ»
    • «بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ...»
  3. রাক্বীর প্রতি লক্ষ্য রাখা: সে যেন শরীয়তসম্মত পদ্ধতি ব্যবহার করে, শিরকী কথা না বলে, অতিরিক্ত টাকা না নেয়।
  4. তাওয়াক্কুল: মনে রাখতে হবে — রুকইয়াহ উপকরণ মাত্র; শিফা আল্লাহর হাতে।

৭. রুকইয়াহ সম্পর্কে সতর্কতা

  • জিন-শয়তানের নামে রুকইয়াহ: হারাম।
  • অতিরিক্ত টাকা নেওয়া: মাকরূহ।
  • গায়েবের খবর দেওয়া: হারাম।
  • নারী-পুরুষের খালওয়া: নিষিদ্ধ।
  • অপ্রমাণিত পদ্ধতি: বিদআত।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | শরীয়তসম্মত রুকইয়াহ করানো | জায়েয, সুন্নাহ | | রুকইয়াহর উপর ভরসা করা | নিষিদ্ধ | | শিরকী রুকইয়াহ | হারাম | | আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রেখে রুকইয়াহ | উত্তম | | রাক্বীকে পারিশ্রমিক দেওয়া | জায়েয (ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদের মতে) |

মূল কথা: হাদীসে নিষেধাজ্ঞা রুকইয়াহর উপর নির্ভরতাতাওয়াক্কুল দুর্বলতার কারণে। শরীয়তসম্মত রুকইয়াহ করানো জায়েয; বরং সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। তবে রাক্বী নির্বাচনে সতর্কতা জরুরি।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.