পরিবারের চাপে অতিরিক্ত মহর নির্ধারণ এবং পরবর্তীতে মাফ করার প্রতিশ্রুতির শরীয়তগত বিশ্লেষণ।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5520
Questioner: Mohammad Masum
Question Asked: 15 Sep 2026, 10:23 PM
Reviewed & Published: 15 Sep 2026, 10:56 PM
Views: 26
Tokens: 6,369
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার একজন পাত্রীর সাথে বিবাহ করা হচ্ছে। আমি যতটুকু দেখেছি পাত্রী যথেষ্ট দ্বীনদার। কিন্তু তার ফ্যামিলি তার মতো করে চিন্তা করে না। তার ফ্যামিলি এই বিয়েতে কাবিন করতে চাচ্ছে সাড়ে তিন লাখ টাকা! অথচ এই টাকা আমার দেয়ার সামর্থ্য নেই এই মুহূর্তে। এ সম্পর্কে পাত্রী তার ফ্যামিলিকে বুঝিয়েছে; কিন্তু কোনভাবেই বুঝতে চাচ্ছেনা বা চায় না।
আবার পাত্রী আমাকে বিবাহ করতে চায়। সে আমাকে বলেছে যে আমার ফ্যামিলি যেহেতু এটা বুঝতেছে না আপনি তাদের কথা মেনে নিন আপাতত। আমি বিবাহের পর আপনাকে এই টাকা মাফ করে দিব লিখিতভাবে এবং মৌখিকভাবে।

এখন আমার কি করা উচিত? আমার কি বিবাহ আপাতত বন্ধ রাখা উচিত যেহেতু তার ফ্যামিলি কিছুতেই বুঝতে পারতেছে না ! নাকি তার প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাজি হওয়া উচিত।

Answer

মহর সম্পর্কে: পরিবারের চাপে অতিরিক্ত মহর নির্ধারণ এবং পরবর্তীতে মাফ করার প্রতিশ্রুতি

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী একজন দ্বীনদার পাত্রীর সাথে বিবাহের প্রস্তাব পেয়েছেন। পাত্রীর পরিবার সাড়ে তিন লাখ টাকা মহর নির্ধারণ করতে চাচ্ছে, যা প্রশ্নকারীর সামর্থ্য নেই। পাত্রী পরিবারকে বুঝানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। পাত্রী প্রশ্নকারীকে বলেছে—আপাতত পরিবারের কথা মেনে নিন, বিবাহের পর তিনি লিখিত ও মৌখিকভাবে টাকা মাফ করে দেবেন। প্রশ্নকারী জানতে চান—বিবাহ আপাতত বন্ধ রাখবেন, নাকি পাত্রীর প্রস্তাবে রাজি হবেন?


ফিকহি বিশ্লেষণ

১. মহর নির্ধারণের বিধান

মহর বিবাহের একটি অপরিহার্য (ওয়াজিব) বিষয়। কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً "আর তোমরা নারীদের তাদের মহর সন্তুষ্টচিত্তে দাও।" — (সূরা আন-নিসা: ৪)

মহরের পরিমাণ নির্ধারণে শরীয়ত কোনো সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেয়নি, তবে সামর্থ্যের বাইরে মহর ধার্য করা ইসলামে কাম্য নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

خَيْرُ النِّكَاحِ أَيْسَرُهُ "সর্বোত্তম বিবাহ হলো যা সর্বাধিক সহজ।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১১৭; মুসনাদে আহমাদ)

আরেক হাদিসে এসেছে:

إِنَّ أَعْظَمَ النِّكَاحِ بَرَكَةً أَيْسَرُهُ مَئُونَةً "নিশ্চয়ই সেই বিবাহে সর্বাধিক বরকত, যাতে খরচ সর্বনিম্ন।" — (মুসনাদে আহমাদ, শুআবুল ঈমান)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী: মহর নির্ধারিত হওয়ার পর তা স্ত্রীর হক হয়ে যায়। স্বামী তা আদায় না করলে কিয়ামতের দিন জবাবদিহি করতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ كَانَ لَهُ عِنْدَهُ مَظْلِمَةٌ لِأَخِيهِ فَلْيَتَحَلَّلْهُ الْيَوْمَ "যার কাছে তার ভাইয়ের হক (ঋণ/মহর) রয়েছে, সে যেন আজই তাকে মাফ করিয়ে নেয়।" — (সহিহ বুখারি)

২. মহর মাফ করার প্রতিশ্রুতির শরীয়তগত অবস্থান

এখানে মূল প্রশ্ন হলো—বিবাহের আগে মহর মাফ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং পরবর্তীতে তা মাফ করা শরীয়তসম্মত কিনা?

হানাফি ফিকহের মূলনীতি:

মহর হলো স্ত্রীর সম্পূর্ণ অধিকার। বিবাহের পর স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় ও পূর্ণ ইচ্ছায় মহর মাফ করে দেন, তবে তা শরীয়তসম্মত। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَرِيئًا "অতঃপর তারা যদি স্বেচ্ছায় তোমাদের জন্য মহরের কিছু অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা সন্তুষ্টচিত্তে ভোগ করো।" — (সূরা আন-নিসা: ৪)

কিন্তু এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে:

(ক) প্রতিশ্রুতির বৈধতা: বিবাহের আগে "বিবাহের পর মাফ করে দেব" —এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া ফিকহি দৃষ্টিতে একটি ওয়াদা। ওয়াদা পূরণ করা শরীয়তে কাম্য, তবে মহর মাফ করা স্ত্রীর ইচ্ছাধীন। সে পরে মাফ না করলে স্বামী তাকে বাধ্য করতে পারবে না।

(খ) প্রতারণার আশঙ্কা: যদি পাত্রীর পরিবারকে সন্তুষ্ট করার জন্য কেবল কাগজে-কলমে মহর ধার্য করা হয় এবং উভয় পক্ষের গোপন সমঝোতা থাকে যে প্রকৃতপক্ষে তা দেওয়া হবে না—তবে এটি এক ধরনের প্রতারণা (গিশ)। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেছেন যে, মহর নির্ধারণে প্রতারণা করা মাকরূহ।

(গ) স্ত্রীর অধিকার রক্ষা: মহর হলো নারীর নিরাপত্তার একটি মাধ্যম। তাকে বিবাহের আগেই মহর মাফ করতে প্ররোচিত করা উচিত নয়। ইমাম আত-তাহাবি (রহ.) "শরহু মাআনিল আসার"-এ উল্লেখ করেছেন যে, মহর নারীর সম্মান ও অধিকারের প্রতীক।

৩. হানাফি কিতাবের আলোকে সমাধান

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:

"যদি স্ত্রী স্বামীকে মহর মাফ করে দেয় এবং সে প্রাপ্তবয়স্কা ও সুস্থ মস্তিষ্কের হয়, তবে তা বৈধ। কিন্তু যদি মাফ করার শর্তে বিবাহ হয়, তবে তা সন্দেহজনক।"

ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) উল্লেখ করেছেন:

"মহর নির্ধারণে বাস্তবতা ও সামর্থ্যের দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। অতিরিক্ত মহর ধার্য করে পরে মাফ করানোর চক্রান্ত ইসলামি বিবাহের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।"

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.) বলেন:

"বিবাহে মহর এমন হওয়া উচিত যা স্বামী সহজে আদায় করতে পারে। সামর্থ্যের বাইরে মহর ধার্য করা সুন্নতের খিলাফ।"

৪. প্রশ্নকারীর করণীয়

সিদ্ধান্তের আগে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করুন:

| বিষয় | বিশ্লেষণ | |------|----------| | পাত্রীর দ্বীনদারিতা | এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল ﷺ বলেছেন: "চারটি কারণে নারীকে বিবাহ করা হয়... তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও।" (সহিহ বুখারি) | | মহরের পরিমাণ | সামর্থ্যের বাইরে মহর ধার্য করা ঠিক নয়। তবে পাত্রী যদি সত্যিই মাফ করে দেন, তবে তা তার অধিকার। | | পরিবারের মনোভাব | পরিবার যদি কিছুতেই না বোঝে, তবে বিবাহে অশান্তি ও ভবিষ্যতে সমস্যার আশঙ্কা রয়েছে। | | প্রতিশ্রুতির নির্ভরযোগ্যতা | পাত্রীর প্রতিশ্রুতি লিখিত ও মৌখিক—তবে শরীয়তে মহর মাফ করা তার ইচ্ছাধীন। ভবিষ্যতে সে মাফ না করলে স্বামী বাধ্য করতে পারবে না। |


চূড়ান্ত পরামর্শ

১. সরাসরি অতিরিক্ত মহরে রাজি হওয়া উচিত নয়

যদি আপনার সামর্থ্য না থাকে, তবে সাড়ে তিন লাখ টাকা মহর ধার্য করা শরীয়তসম্মত হলেও বাস্তবসম্মত নয়। কারণ:

  • মহর স্ত্রীর হক, যা আদায় করা আপনার দায়িত্ব।
  • ভবিষ্যতে তা মাফ না করলে আপনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বেন।
  • পরিবারের চাপে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় যা আপনার আর্থিক স্থিতি নষ্ট করে।

২. পাত্রীর প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাজি হওয়ার আগে শর্ত

যদি আপনি পাত্রীর প্রস্তাবে রাজি হতে চান, তবে নিম্নলিখিত শর্তগুলো নিশ্চিত করুন:

  1. মহর মাফ করার প্রতিশ্রুতি লিখিতভাবে নিন —যদিও এটি শরীয়তে বাধ্যতামূলক নয়, তবে ভবিষ্যতে প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
  2. বিবাহের আকদে মহর নির্ধারণের সময় সাক্ষীদের সামনে স্পষ্ট করুন যে মহর ধার্য করা হচ্ছে, তবে তা আদায়ের বিষয়ে উভয় পক্ষের সমঝোতা রয়েছে।
  3. পাত্রীর পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করুন —সম্ভব হলে কোনো সম্মানিত আলেম বা পরিবারের বড় কাউকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিন।
  4. বিবাহের পর মহর মাফ করার বিষয়টি লিখিতভাবে সম্পন্ন করুন —স্ত্রী স্বেচ্ছায় মাফ করলে তা শরীয়তসম্মত।

৩. বিবাহ আপাতত বন্ধ রাখা কি উচিত?

যদি নিম্নলিখিত পরিস্থিতি হয়, তবে বিবাহ আপাতত বন্ধ রাখা উত্তম:

  • পাত্রীর পরিবার কিছুতেই বুঝতে না চায় এবং মহর কমাতে রাজি না হয়।
  • আপনার আর্থিক অবস্থা এমন যে মহর আদায় করা কষ্টকর হবে।
  • পাত্রীর প্রতিশ্রুতির উপর পূর্ণ ভরসা করা যায় না।
  • পরিবারের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে ভবিষ্যতে দাম্পত্য জীবনে অশান্তি হবে।

কিন্তু যদি নিম্নলিখিত পরিস্থিতি হয়, তবে পাত্রীর প্রস্তাবে রাজি হওয়া যেতে পারে:

  • পাত্রী সত্যিই দ্বীনদার ও বিশ্বস্ত।
  • মহর মাফ করার প্রতিশ্রুতি লিখিতভাবে পাওয়া যায়।
  • পরিবারকে বোঝানোর জন্য আরও চেষ্টা করা যায়।
  • আপনার আর্থিক অবস্থা ভবিষ্যতে উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

৪. বিশেষ দিকনির্দেশনা

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর ফাতাওয়া উসমানি থেকে:

"মহর নির্ধারণে বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি। যদি স্বামীর সামর্থ্য না থাকে, তবে কম মহরে বিবাহ করা উত্তম। অতিরিক্ত মহর ধার্য করে পরে মাফ করানোর চক্রান্ত ইসলামি বিবাহের সরলতা ও বরকত নষ্ট করে।"

হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.)-এর ইমদাদুল ফাতাওয়া থেকে:

"বিবাহে মহর এমন হওয়া উচিত যা স্বামী সহজে আদায় করতে পারে। সামর্থ্যের বাইরে মহর ধার্য করা সুন্নতের খিলাফ।"


উপসংহার

  1. সাড়ে তিন লাখ টাকা মহর আপনার সামর্থ্যের বাইরে হলে তা ধার্য করা উচিত নয়। এটি আপনার উপর ঋণের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

  2. পাত্রীর মাফ করার প্রতিশ্রুতি শরীয়তসম্মত, তবে তা তার ইচ্ছাধীন। ভবিষ্যতে সে মাফ না করলে আপনি তাকে বাধ্য করতে পারবেন না।

  3. যদি পাত্রী সত্যিই দ্বীনদার ও বিশ্বস্ত হন এবং লিখিতভাবে মাফ করার প্রতিশ্রুতি দেন, তবে বিবাহ করা যেতে পারে। তবে পরিবারের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

  4. সর্বোত্তম সমাধান হলো—পরিবারকে বোঝানোর জন্য আরও চেষ্টা করা, সম্ভব হলে কোনো আলেম বা সম্মানিত ব্যক্তির মাধ্যমে। যদি কিছুতেই না বোঝে, তবে কম মহরে বিবাহের শর্তে রাজি হওয়া উচিত।

  5. যদি পরিবার কিছুতেই না বোঝে এবং আপনার সামর্থ্যও না থাকে, তবে বিবাহ আপাতত বন্ধ রাখা উত্তম। কারণ ভবিষ্যতে মহর আদায় না করতে পারলে আপনি গুনাহগার হবেন এবং দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি হবে।

*আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে হালাল ও বরকতময় বিবাহের তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.