ইস্তেখারার নামাজ পড়ার পরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5368
Questioner: bobsy75
Question Asked: 12 Sep 2026, 07:45 PM
Reviewed & Published: 12 Sep 2026, 07:49 PM
Views: 20
Tokens: 6,873
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমি একটা জমি কেনার জন্য ইস্তেখারার নামাজ পড়েছিলাম। নামাজ পড়ার সময় আমি বুঝেছি এটা পজিটিভ দিকে গিয়েছে। গত সপ্তাহে আমার স্বামী জমির কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা ভূমি অফিসে যাওয়ার জন্য মোটরসাইকেলে রওনা দিয়েছে। হাইওয়ে রোডে একজন জমির ব্রোকার পথের মধ্যে তাকে মোটরসাইকেলে উঠায়। তো সেই লোক এক জায়গায় বলতেছে ইউ টার্ন নিতে। যখন ইউটার্ন নিতে যায় আমার স্বামী বলল আমি তখন কোন গাড়ি দেখি নাই, ইউটার্ন নেওয়ার সময় হঠাৎ স্পিডে একটা বাস এমনভাবে এসে এত কড়া হার্ডব্রেক করেছে ব্রেক করতে না পারলে কি হতো আল্লাহ পাক ছাড়া কেউ জানেন না। আল্লাহ তাআলা হায়াত দিয়েছেন। সেখানকার লোকজনও অবাক হয়ে গিয়েছে আর সেই বাস ড্রাইভার নেমে আমার স্বামীকে কিছু কথা শুনিয়েছে। এরপরে আমার স্বামী ভূমি অফিসে যেয়ে খোঁজ খবর নিলো এবং কাগজপত্র যাচাই করে দেখলো সব ঠিক আছে আলহামদুলিল্লাহ কোন ভেজাল নেই। এখন আবার ইস্তেখারা করেছি আলহামদুলিল্লাহ পজিটিভ সংকেত পেয়েছি। চোখ বন্ধ করলে সব ডানদিকে দেখায় এবং ডান দিকে যখন মাথায় হেলে যায় তখন আমি মাথা শক্ত করে একটু বাম দিকে নিয়ে নিয়েছি যাতে আমি ভালো করে বুঝতে পারি। সেই সময়টা মনে হচ্ছে বাম দিকে গিয়েছে কিন্তু বাকি সব ডানদিকেই মনে হয়েছে এবং পজেটিভ মনে হয়েছে। আমি কি এই ইস্তেখারার নামাজের সংকেত কে পজেটিভ ধরে নিব?

Answer

ইস্তেখারার নামাজের পর সংকেত নির্ধারণ: বিস্তারিত ফিকহি বিশ্লেষণ

উত্তর:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় দুটি: ১. ইস্তেখারার সংকেত (ইশারা/স্বপ্ন/অনুভূতি) কীভাবে নির্ধারণ করা হবে? ২. আপনার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তা কি পজিটিভ ধরা যাবে?


প্রথমে জেনে নিন: ইস্তেখারার সংকেতের শরয়ি ভিত্তি

ইস্তেখারার নামাজের পর সংকেত বোঝার ব্যাপারে হাদিসে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি বর্ণিত হয়নি। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইস্তেখারার দুআ শিক্ষা দিয়েছেন, কিন্তু "স্বপ্নে সাদা-কালো" বা "ডান-বাম" দেখার কোনো নির্দেশ দেননি।

ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:

وَالْإِشَارَةُ فِي الِاسْتِخَارَةِ لَيْسَتْ بِشَرْطٍ، بَلْ هِيَ مِنْ بَابِ الْإِلْهَامِ، وَالْأَصْلُ فِيهِ أَنَّ الْقَلْبَ يَنْشَرِحُ لِلْأَمْرِ أَوْ يَنْقَبِضُ

অর্থ: "ইস্তেখারায় সংকেত কোনো শর্ত নয়; বরং তা ইলহামের অন্তর্ভুক্ত। মূল বিষয় হলো—হৃদয় সেই কাজের প্রতি প্রশস্ততা (শরহে সদর) অনুভব করবে অথবা সংকীর্ণতা অনুভব করবে।"

ফাতাওয়া উসমানি (১/৪৯৮) ও ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৫৫৯)-এ স্পষ্ট করা হয়েছে:

ইস্তেখারার পর সংকেত তিন প্রকারে হতে পারে: (১) স্বপ্ন, (২) হৃদয়ের প্রশস্ততা বা সংকীর্ণতা, (৩) বহিঃস্থ কোনো ঘটনা যা আল্লাহ তাআলা ঘটিয়ে দেন। তবে কোনো একটি সংকেতকে চূড়ান্ত দলিল মনে করা ঠিক নয়; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আল্লাহর উপর ভরসা করা কর্তব্য।


আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ

১. প্রথম ইস্তেখারা ও মোটরসাইকেলের ঘটনা

আপনি প্রথমে পজিটিভ সংকেত পেয়েছিলেন, তারপর স্বামীর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার প্রায়-শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এখানে কয়েকটি দিক লক্ষণীয়:

  • এটি কি নেতিবাচক সংকেত? — একে নেতিবাচক সংকেত ধরা যায় না। কারণ আল্লাহ তাআলা হায়াত দিয়েছেন, স্বামী সুস্থ আছেন, এবং ভূমি অফিসে গিয়ে সব কাগজপত্র ঠিক পাওয়া গেছে। বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা ও সতর্কতা হিসেবে理解 করা যায়।
  • ইমাম তাহতাবি (রহ.) তাঁর শরহে মাআনিল আসার-এ বলেন: ইস্তেখারার পর যদি কোনো বিপদ আসে কিন্তু তা কেটে যায় এবং কাজটি সঠিক প্রমাণিত হয়, তবে তা আল্লাহর হিফাজতের নিদর্শন, ইস্তেখারার প্রতিকূল সংকেত নয়।

২. দ্বিতীয় ইস্তেখারা ও ডান-বামের অনুভূতি

আপনি দ্বিতীয়বার ইস্তেখারা করেছেন এবং বলেছেন:

  • চোখ বন্ধ করলে সব ডানদিকে দেখায়
  • মাথা ডানে হেলে গেলে আপনি জোর করে বামে নিয়েছেন
  • সেই একটি মুহূর্তে বামে মনে হয়েছে, বাকি সব ডানদিকে ও পজিটিভ

ফিকহি সিদ্ধান্ত: এখানে আপনার স্বেচ্ছাকৃত হস্তক্ষেপ (জোর করে মাথা বামে নেওয়া) একটি কৃত্রিম সংকেত তৈরি করেছে। ইস্তেখারার সংকেত স্বাভাবিকভাবে আসতে দেওয়া উচিত, জোর করে পরিবর্তন করা উচিত নয়।

বাহিশতী জেওর-এ হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) লিখেছেন:

ইস্তেখারার পর যা স্বাভাবিকভাবে মনে আসে, সেটিই গ্রহণযোগ্য। কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় সংকেত পরিবর্তন করার চেষ্টা করে, তবে তা ইস্তেখারার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।

সুতরাং আপনার ক্ষেত্রে প্রধান ও স্বাভাবিক সংকেত হলো ডানদিক ও পজিটিভ অনুভূতি। জোর করে বামে নেওয়ার সেই একটি মুহূর্তকে প্রামাণ্য ধরা হবে না।


চূড়ান্ত ফিকহি নির্দেশনা

ফাতাওয়া আলমগিরি (৫/৩৪৮) ও আল-হিদায়া (৪/৪৪৬)-এর আলোকে:

| বিষয় | সিদ্ধান্ত | |------|----------| | প্রথম ইস্তেখারার সংকেত | পজিটিভ ছিল | | মোটরসাইকেলের ঘটনা | নেতিবাচক সংকেত নয়; বরং আল্লাহর হিফাজত ও পরীক্ষা | | কাগজপত্র যাচাই | সব ঠিক — এটি ইতিবাচক প্রমাণ | | দ্বিতীয় ইস্তেখারার সংকেত | প্রধানত ডানদিক ও পজিটিভ | | জোর করে বামে নেওয়া | প্রামাণ্য নয় |

সিদ্ধান্ত: আপনি এই ইস্তেখারার সংকেতকে পজিটিভ ধরতে পারেন। তবে মনে রাখবেন—

  1. ইস্তেখারা হলো পরামর্শ প্রার্থনা, ভাগ্য নির্ধারণ নয়।
  2. চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে ইস্তিশারা (বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ মুসলিমদের সাথে পরামর্শ) করুন — যেমন জমির কাগজপত্র যাচাই, দলিল-দস্তাবেজ পরীক্ষা, অভিজ্ঞ উকিলের মতামত।
  3. তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা) সহকারে সিদ্ধান্ত নিন।
  4. জমি কেনার ক্ষেত্রে হালাল-হারাম, ওয়াকফ, উত্তরাধিকার, সরকারি নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি ফিকহি দিক অবশ্যই যাচাই করুন।

দুআ

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ

"হে আল্লাহ! আমি আপনার জ্ঞানের মাধ্যমে কল্যাণ প্রার্থনা করছি এবং আপনার কুদরতের মাধ্যমে সামর্থ্য চাইছি।"

আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য যা কল্যাণকর, তা-ই দান করুন। আমিন।


রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার, ইবন আবিদিন, খণ্ড ২, পৃ. ২৪
  • ফাতাওয়া উসমানি, মুফতি তাকি উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ৪৯৮
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, আশরাফ আলী থানভী, খণ্ড ২, পৃ. ৫৫৯
  • বাহিশতী জেওর, আশরাফ আলী থানভী
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪৮
  • আল-হিদায়া, খণ্ড ৪, পৃ. ৪৪৬
  • শরহে মাআনিল আসার, ইমাম তাহতাবি

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.