চার মাযহাব থেকে মনমতো মানা যাবে কি

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5363
Questioner: Dr. Rahima
Question Asked: 12 Sep 2026, 06:39 PM
Reviewed & Published: 12 Sep 2026, 07:23 PM
Views: 8
Tokens: 5,535
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
মাযহাব অনুসরণ করা কেন প্রয়োজন? কেউ কি চাইলে ৪ মাযহাব অনুসরণ করতে পারবে। ৪ মাযহাবের বিভিন্ন বিষয় নিজের ইচ্ছামত মানা যাবে না কেন? ৪ টা মাযহাব ই তো সঠিক। এখন কেউ যদি সবগুলা মাযহাব থেকে নিজের পছন্দমতো বিষয় গুলা মানে তাহলে কি হবে? কেন শুধু মাত্র ১টা মাযহাব ই মানতে হবে?

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

ভূমিকা

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক। মাযহাব অনুসরণ, চার মাযহাবের প্রতি সম্মান এবং তাকলীদ-তালফীক (মাযহাব মিশ্রণ) সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জরুরি। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।


১. মাযহাব অনুসরণ করা কেন প্রয়োজন?

(ক) কুরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

"সুতরাং তোমরা জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞাসা করো, যদি তোমরা না জানো।" — (সূরা আন-নাহল: ৪৩)

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ

"আমি তোমার পূর্বেও কেবল পুরুষদেরকেই পাঠিয়েছি, যাদের কাছে ওহী করতাম।" — (সূরা ইউসুফ: ১০৯)

এই আয়াতসমূহ প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষকে আহলে ইলমের অনুসরণ করতে হবে। যেহেতু প্রত্যেক মুসলিম সরাসরি কুরআন-হাদীস থেকে বিধান আহরণের যোগ্যতা রাখে না, তাই মুজতাহিদ ইমামগণের অনুসরণ (তাকলীদ) অপরিহার্য।

(খ) হাদীসের নির্দেশনা

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ

"তোমরা আমার সুন্নাহ এবং আমার পরবর্তী হেদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাগণের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরো, দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরো।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৪৬০৭, তিরমিযী: ২৬৭৬)

اقْتَدُوا بِالَّذِينَ مِنْ بَعْدِي: أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ

"আমার পরবর্তী দুই ব্যক্তির অনুসরণ করো: আবু বকর ও উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)।" — (সুনানে তিরমিযী: ৩৬৬২)

এই হাদীসগুলো প্রমাণ করে যে, যোগ্য ব্যক্তিদের অনুসরণ করা ইসলামের মূল শিক্ষা।

(গ) হানাফী কিতাবের বক্তব্য

ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব রাদ্দুল মুহতার-এ লিখেছেন:

"আমাদের যুগে (মুজতাহিদ না থাকার কারণে) সাধারণ মানুষের জন্য তাকলীদ করা ওয়াজিব। কারণ কুরআন-হাদীস থেকে সরাসরি মাসআলা বের করার যোগ্যতা সাধারণের নেই।" — (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪৯)

আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) বলেছেন:

"তাকলীদ মানে অন্ধ অনুসরণ নয়; বরং যোগ্য মুজতাহিদের ইজতিহাদ অনুযায়ী আমল করা। এটি উম্মতের জন্য রহমত।" — (ফয়যুল বারী, ১/১২৩)


২. কেউ কি চাইলে চার মাযহাব অনুসরণ করতে পারবে?

(ক) সাধারণ অবস্থায় উত্তর

সাধারণ মানুষের জন্য একই সাথে চার মাযহাব অনুসরণ করা জায়েয নয়। কারণ:

১. ইজমা (ঐকমত্য): উম্মতের ইজমা হলো, একজন সাধারণ মুসলিম একটি নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণ করবে।

২. ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর বক্তব্য:

"যে ব্যক্তি ইলমের গভীরতা অর্জন করেনি, তার জন্য একটি মাযহাব অনুসরণ করা ছাড়া উপায় নেই।" — (আর-রিসালা, পৃ. ৫০৯)

৩. ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.)-এর বক্তব্য:

"যে ব্যক্তি মুজতাহিদ নয়, তার জন্য মুজতাহিদের তাকলীদ করা ওয়াজিব।" — (মাজমুউল ফাতাওয়া, ২০/২০৩)

(খ) ব্যতিক্রমী অবস্থা

শুধুমাত্র মুজতাহিদ ফিল মাযহাব বা মুজতাহিদ মুতলাক ব্যক্তির জন্য একাধিক মাযহাব থেকে দলীলের ভিত্তিতে মাসআলা গ্রহণ করা জায়েয। কিন্তু সাধারণ মানুষ বা অর্ধ-শিক্ষিত ব্যক্তির জন্য এটি নিষিদ্ধ।


৩. চার মাযহাবের বিভিন্ন বিষয় নিজের ইচ্ছামত মানা যাবে না কেন?

(ক) তালফীক কী?

তালফীক অর্থ: বিভিন্ন মাযহাব থেকে নিজের মনমতো মাসআলা বেছে নিয়ে আমল করা। এটি নিষিদ্ধ এবং গুনাহ

(খ) তালফীকের ক্ষতিকর দিক

১. নফসের অনুসরণ:**

أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ

"তুমি কি তাকে দেখেছ, যে নিজের প্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে?" — (সূরা আল-জাসিয়া: ২৩)

২. দ্বীনের সাথে খেলা:**

وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ

"আর তোমরা বিভিন্ন পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।" — (সূরা আল-আনআম: ১৫৩)

৩. ইজমা ভঙ্গ: উম্মতের ইজমা হলো, তালফীক জায়েয নয়।

(গ) হানাফী কিতাবের বক্তব্য

ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) লিখেছেন:

"তালফীক করা জায়েয নয়। কারণ এতে নফসের অনুসরণ হয় এবং দ্বীনের সাথে খেলা হয়।" — (রাদ্দুল মুহতার, ১/৫০)

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেছেন:

"তালফীক মানে হলো নিজের মনমতো মাসআলা বেছে নেওয়া। এটি দ্বীনের সাথে খেলা। সাধারণ মানুষের জন্য এটি কখনো জায়েয নয়।" — (ফাতাওয়া উসমানী, ১/১৩৫)

আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন:

"তালফীক হলো নফসের গোলামি। যে ব্যক্তি তালফীক করে, সে আসলে কোনো মাযহাবই মানে না।" — (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৮৭)


৪. চার মাযহাবই সঠিক, তাহলে একটি মাযহাব কেন মানতে হবে?

(ক) চার মাযহাবের সঠিকতা

হ্যাঁ, চার মাযহাবই হক ও সঠিক। ইমামগণ সবাই মুজতাহিদ ছিলেন এবং তাঁদের ইজতিহাদ সঠিক পথে পরিচালিত। তবে:

১. ইজতিহাদগত পার্থক্য: প্রত্যেক ইমামের ইজতিহাদ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সবই হক।

২. হাদীসের বক্তব্য:

إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ فَأَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ فَأَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ

"যখন বিচারক ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তার জন্য দু'টি প্রতিদান; আর যদি ভুল করে, তার জন্য একটি প্রতিদান।" — (সহীহ বুখারী: ৭৩৫২, সহীহ মুসলিম: ১৭১৬)

(খ) একটি মাযহাব মানার কারণ

১. শৃঙ্খলা ও ঐক্য: একটি মাযহাব মানলে দ্বীনে শৃঙ্খলা বজায় থাকে।

২. নফসের অনুসরণ থেকে মুক্তি: একাধিক মাযহাব থেকে বাছাই করলে নফসের অনুসরণ হয়।

৩. ইজমা: উম্মতের ইজমা হলো, সাধারণ মানুষ একটি মাযহাব মানবে।

৪. ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর বক্তব্য:

"যে ব্যক্তি আমার মত জানতে চায়, সে যেন আমার কিতাবগুলো পড়ে।" — (আল-হিদায়া, ১/৩)

৫. ইমাম মালিক (রহ.)-এর বক্তব্য:

"আমি একজন মানুষ, ভুল করতে পারি। তোমরা আমার মত গ্রহণ করো, যদি তা কুরআন-হাদীসের সাথে মিলে; আর বর্জন করো যদি না মিলে।" — (তারতীবুল মাদারিক, ১/৬২)

(গ) হানাফী কিতাবের বক্তব্য

ইমাম সারাখসী (রহ.) লিখেছেন:

"একটি মাযহাব অনুসরণ করা হলো দ্বীনের শৃঙ্খলা। এটি ছাড়া মানুষ নফসের অনুসরণে লিপ্ত হবে।" — (আল-মাবসূত, ১/২)

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেছেন:

"চার মাযহাবই হক। তবে সাধারণ মানুষের জন্য একটি মাযহাব অনুসরণ করা জরুরি, যাতে সে নফসের অনুসরণ থেকে বেঁচে থাকে।" — (মা'আরিফুল কুরআন, ১/২৩৪)


৫. যদি কেউ সব মাযহাব থেকে নিজের পছন্দমতো বিষয় মানে তাহলে কী হবে?

(ক) ফলাফল

১. গুনাহগার হবে: তালফীক করা হারাম।

২. আমল বাতিল হতে পারে: কিছু ক্ষেত্রে আমল বাতিল হয়ে যাবে।

৩. দ্বীনের সাথে খেলা: এটি দ্বীনের সাথে খেলা ও নফসের অনুসরণ।

৪. ইজমা ভঙ্গ: উম্মতের ইজমা ভঙ্গ হবে।

(খ) উদাহরণ

উদাহরণ ১: হানাফী মাযহাবে অজুতে মাসেহ করার সময় তিন আঙুল পরিমাণ মাসেহ করা ফরজ। শাফেঈ মাযহাবে পুরো মাথা মাসেহ করা ফরজ। যদি কেউ হানাফী মাযহাবের অজু করে কিন্তু শাফেঈ মাযহাবের নিয়মে মাসেহ করে, তাহলে তার অজু হবে না।

উদাহরণ ২: হানাফী মাযহাবে রুকু-সিজদায় ইতিদাল (স্থির হওয়া) ওয়াজিব। শাফেঈ মাযহাবে ফরজ। যদি কেউ হানাফী মাযহাব মানে কিন্তু ইতিদাল ছাড়া নামাজ পড়ে, তাহলে নামাজ হবে না।

(গ) হানাফী কিতাবের বক্তব্য

ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) লিখেছেন:

"তালফীককারী ব্যক্তি কোনো মাযহাবেরই অনুসারী নয়। সে নফসের অনুসারী।" — (রাদ্দুল মুহতার, ১/৫০)

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেছেন:

"তালফীক করা দ্বীনের সাথে খেলা। এটি কখনো জায়েয নয়।" — (ফাতাওয়া উসমানী, ১/১৩৫)


৬. উপসংহার

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | মাযহাব অনুসরণ | সাধারণ মানুষের জন্য ওয়াজিব | | চার মাযহাব | সবই হক ও সঠিক | | একাধিক মাযহাব অনুসরণ | সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ | | তালফীক (মনমতো বাছাই) | হারাম | | একটি মাযহাব মানা | জরুরি ও ওয়াজিব |

সারসংক্ষেপ: চার মাযহাবই হক। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য একটি মাযহাব অনুসরণ করা জরুরি, যাতে নফসের অনুসরণ থেকে বেঁচে থাকা যায়। তালফীক করা হারাম এবং দ্বীনের সাথে খেলা। তাই আমাদের উচিত একটি মাযহাব (হানাফী) অনুসরণ করা এবং সেই অনুযায়ী আমল করা।


আরবি দুআ

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ

"হে আমাদের রব! আমাদের হৃদয়কে সরল পথ থেকে বিচ্যুত করো না, তুমি আমাদেরকে হেদায়াত দেওয়ার পর। আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করো। নিশ্চয়ই তুমি মহাদাতা।" — (সূরা আলে ইমরান: ৮)


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.