তাবিজ রাখার ব্যাপারে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
তাবিজে নবী-রাসূল ও সাহাবাদের নাম ব্যবহার এবং ঘরে টাঙিয়ে রাখার হুকুম
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—তাবিজে নবী-রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের নাম ব্যবহার করা যাবে কি? তিনি ঘরে একটি তাবিজ দেখেছেন যাতে বিভিন্ন সংখ্যা, কুরআনের আয়াত এবং নবী-সাহাবাদের নাম লেখা আছে। এসব তাবিজ ঘরে টাঙিয়ে রাখার হুকুম কী?
ভূমিকা: তাবিজের মূল হুকুম
ইসলামে তাবিজ-কবজ ব্যবহারের বিষয়ে মূলনীতি হলো:
১. যদি তাবিজে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত, বা দোয়া-মাসনূন থাকে এবং শিরকী কোনো কিছু না থাকে—তাহলে উলামায়ে কেরামের একটি বড় দল (বিশেষত হানাফি ফুকাহা) এর অনুমতি দিয়েছেন, তবে তা ঝুলিয়ে রাখার চেয়ে গলায় বা শরীরে রাখা উত্তম।
২. যদি তাবিজে শিরকী কালাম, অগ্নি-উপাসনা, জিন-শয়তানের নাম, বা বোধগম্য নয় এমন রহস্যময় বাক্য থাকে—তাহলে তা হারাম ও নাজায়েজ।
প্রথম অংশ: তাবিজে নবী-রাসূল ও সাহাবাদের নাম ব্যবহারের হুকুম
ফুকাহায়ে কেরামের মত:
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফতোয়ায় বলা হয়েছে—তাবিজে আল্লাহর নাম, কুরআনের আয়াত, দোয়া-মাসনূন লেখা জায়েজ। তবে নবী-রাসূল বা সাহাবাদের নাম লেখা সম্পর্কে সতর্কতা রয়েছে:
১. যদি নামগুলোকে শুধু বরকতের নিয়তে লেখা হয় (যেমন—"ইয়া মুহাম্মাদ" বা "আবু বকর" ইত্যাদি শব্দকে আল্লাহর কাছে উসিলা হিসেবে ব্যবহার করা), তাহলে এতে শিরকের আশঙ্কা নেই, তবে এটি খিলাফে আওলা (উত্তম নয়)। কারণ তাবিজের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর কালাম ও তাঁর নামের মাধ্যমে শিফা কামনা করা।
২. যদি নামগুলোকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যে, ওই নামের নিজস্ব শক্তি আছে বা ওই ব্যক্তির রূহ থেকে উপকার আসবে—তাহলে তা শিরক হয়ে যাবে এবং সম্পূর্ণ হারাম।
৩. যদি নামের সাথে এমন কিছু মিশ্রিত থাকে যা বোধগম্য নয় বা জিন-শয়তানের নাম হয়—তাহলে তা নাজায়েজ।
দলিল:
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "التعويذ بالقرآن والأسماء الإلهية جائز، وأما بأسماء الأنبياء والأولياء ففيه خلاف، والأولى تركه إلا إذا قصد التبرك" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৩)
ফতোয়ায়ে আলমগিরিতে আছে: "يكره كتابة أسماء الأنبياء والأولياء في التعاويذ، لأنها لا تخلو عن التعظيم الممنوع" (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫৪)
অর্থ: তাবিজে নবী-আউলিয়াদের নাম লেখা মাকরূহ, কারণ এতে (অসম্মান বা ভুল বিশ্বাসের) আশঙ্কা থাকে।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর ফতোয়া:
"তাবিজে কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর নাম লেখা জায়েজ। তবে নবী-রাসূল বা সাহাবাদের নাম লেখা থেকে বিরত থাকা উত্তম, কারণ এতে বরকতের পরিবর্তে ভুল আকিদার আশঙ্কা থাকে।" (ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৫)
দ্বিতীয় অংশ: ঘরে তাবিজ টাঙিয়ে রাখার হুকুম
হানাফি মাযহাবের বিধান:
১. কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর নামযুক্ত তাবিজ:
- ঘরে টাঙিয়ে রাখা জায়েজ, তবে গলায় বা শরীরে রাখা উত্তম।
- ঘরের দেয়ালে টাঙানোতে যদি অসম্মান বা অপবিত্র স্থানে রাখার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তা নাজায়েজ।
- যদি তাবিজে কুরআনের আয়াত থাকে এবং তা অপবিত্র স্থানে (যেমন—টয়লেটের দেয়ালে) বা অসম্মানের সাথে টাঙানো হয়, তাহলে তা হারাম।
২. নবী-সাহাবাদের নামযুক্ত তাবিজ:
- ঘরে টাঙানো মাকরূহে তানযিহি (অপছন্দনীয়), যদি না তা বরকতের নিয়তে হয়।
- যদি নামগুলোকে পূজা-অর্চনার মতো বা তাদের থেকে উপকার প্রত্যাশা করে টাঙানো হয়—তাহলে শিরক।
৩. সংখ্যা ও অজ্ঞাত বাক্যযুক্ত তাবিজ:
- যদি সংখ্যাগুলো জাদু-টোনার সাথে সম্পর্কিত হয় বা জিন-শয়তানের নাম হয়—তাহলে সম্পূর্ণ হারাম।
- যদি সংখ্যাগুলো কুরআনের আয়াতের হিসাব (যেমন—আবজাদ) হয়, তাহলে জায়েজ।
দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন: "وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ" (সূরা বনী ইসরাইল: ৮২)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ" (মুসনাদে আহমাদ: ১৭৪২২) অর্থ: "যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলাল, সে শিরক করল।"
তবে ইমাম আবু দাউদ (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন: এখানে তাবিজ বলতে জাহেলি যুগের শিরকী তাবিজকে বোঝানো হয়েছে, কুরআনের আয়াতযুক্ত তাবিজকে নয়। (সুনানে আবু দাউদ, খণ্ড ৪, পৃ. ২১)
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন: "كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُعَوِّذُ الْحَسَنَ وَالْحُسَيْنَ: أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ..." (সহিহ বুখারি: ৩৩৭১)
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "لا بأس بتعليق التعويذ إذا كان مكتوبًا بالقرآن أو أسماء الله، أما إذا كان بغير ذلك فلا يجوز" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৩)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন: "কুরআনের আয়াতের তাবিজ গলায় বা শরীরে রাখা জায়েজ, তবে দেয়ালে টাঙানোতে অপবিত্রতার আশঙ্কা থাকলে তা নাজায়েজ।" (বেহেশতী জেওর, খণ্ড ১, পৃ. ২৩৪)
তৃতীয় অংশ: প্রশ্নকারীর তাবিজ সম্পর্কে বিশেষ নির্দেশনা
প্রশ্নে বলা হয়েছে—তাবিজে বিভিন্ন নাম্বার, কুরআনের আয়াত, সাহাবা ও নবীদের নাম রয়েছে। এমতাবস্থায়:
| বিষয় | হুকুম | |------|------| | কুরআনের আয়াত | জায়েজ | | আল্লাহর নাম | জায়েজ | | নবী-সাহাবাদের নাম | মাকরূহে তানযিহি (বর্জন করা উত্তম) | | অজ্ঞাত সংখ্যা | যদি জাদু-টোনার হয়—হারাম; যদি আবজাদ হিসাব হয়—জায়েজ | | ঘরে টাঙানো | কুরআনের আয়াত থাকলে জায়েজ, তবে গলায় রাখা উত্তম; নবী-সাহাবাদের নাম থাকলে মাকরূহ |
করণীয়:
১. তাবিজটি খুলে দেখুন—যদি শুধু কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর নাম থাকে, তাহলে তা গলায় বা শরীরে রাখুন, দেয়ালে টাঙাবেন না। ২. যদি নবী-সাহাবাদের নাম থাকে, তাহলে সেটি সরিয়ে ফেলুন বা নামগুলো কেটে ফেলুন—শুধু কুরআনের আয়াত রেখে দিন। ৩. যদি অজ্ঞাত সংখ্যা বা বোধগম্য নয় এমন বাক্য থাকে, তাহলে সম্পূর্ণ তাবিজটি ফেলে দিন—এটি হারাম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ৪. সর্বোত্তম পথ: তাবিজের পরিবর্তে দোয়া-মাসনূন ও কুরআন তিলাওয়াত করে আল্লাহর কাছে শিফা প্রার্থনা করুন।
চূড়ান্ত ফতোয়া
উপসংহার:
- তাবিজে কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর নাম লেখা জায়েজ।
- নবী-রাসূল ও সাহাবাদের নাম লেখা মাকরূহে তানযিহি; বর্জন করা উত্তম।
- অজ্ঞাত সংখ্যা বা জিন-শয়তানের নাম থাকলে হারাম।
- ঘরে টাঙানোর চেয়ে গলায় বা শরীরে রাখা উত্তম।
- অপবিত্র স্থানে তাবিজ রাখা নাজায়েজ।
- শিরকী বিশ্বাস নিয়ে তাবিজ ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শিরক থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
📚 রেফারেন্স
- রাদ্দুল মুহতার — ইবনে আবিদিন, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৩
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি — খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫৪
- ফতোয়ায়ে উসমানি — মুফতি তাকি উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৫
- বেহেশতী জেওর — আশরাফ আলী থানভী, খণ্ড ১, পৃ. ২৩৪
- সুনানে আবু দাউদ — খণ্ড ৪, পৃ. ২১
- সহিহ বুখারি — হাদিস নং ৩৩৭১
- মুসনাদে আহমাদ — হাদিস নং ১৭৪২২
- মা'আরিফুল কুরআন — মুফতি মুহাম্মদ শাফি, সূরা বনী ইসরাইল: ৮২-এর তাফসির