হলের সিট বাতিল না করার কারণে সৃষ্ট বিল ও ঋণের ইসলামী বিধান।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
একজন বোনের নামে হলে সিট বুকিং করা হয়েছিল। প্রথম দেড় বছর থেকেছিলেন এবং বেতনও পরিশোধ করা হয়েছিল। তারপর থেকে উনার অভিভাবক উনাকে বাড়িতে রাখেন এবং হলের সীট বাতিল করেননি। উনাকে অভিভাবক পড়ানো বাদ দিয়ে দিলে উনার বোন পড়ানোর দায়িত্ব নেন।
কিন্তু তার পক্ষে হলে রাখা সম্ভব হয়নি। সীট বাতিল করিয়ে আনাও সম্ভব হয়নি।
ঐ বোন অন্য এক বোনের মাধ্যমে সীট বাতিলের কথা হল সুপারকে জানালেও হল সুপার অভিভাবকের সাথে যোগাযোগ করতে না পারায় সীট বাতিল করেননি। সীট এভাবেই ৩ বছর ধরে পড়ে আছে৷ মাঝে মাঝে কিছু গেস্ট বুকিং দিয়েছে। কিন্তু রেগুলার কাউকে দেওয়া হয়নি। ঐ বোনের অভিভাবক হল সুপারের কল রিসিভ করছেন না এবং প্রতিমাসে সীট বিল বাড়ছে।
এতগুলো টাকা পরিশোধ করার সামর্থ্য বোনটির নেই।
এখন এই টাকাগুলো কি তাকে কখনো পরিশোধ করতে হবে? এটা কি তার উপর ঋণ হবে? যদিও বোনটির ইচ্ছার বিরুদ্ধেই এই ইস্যু চলছে।
Answer
উত্তর: হলের সিট বাতিল না করার কারণে সৃষ্ট বিল ও ঋণের বিধান
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ্
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থার ভিত্তিতে বোনটির উপর সম্পূর্ণ বিলের টাকা ঋণ হিসেবে বর্তাবে না। বরং বিষয়টি কয়েকটি স্তরে বিভক্ত:
১. প্রথম দেড় বছর — যেহেতু তিনি প্রকৃতপক্ষে হলের সিট ব্যবহার করেছেন এবং থাকার সুবিধা ভোগ করেছেন, তাই এই সময়ের বিল/ভাড়া তার উপর প্রদেয় (ঋণ) হিসেবে বর্তাবে।
২. পরবর্তী সময় (অভিভাবক তাকে বাড়িতে রেখে দেওয়ার পর) — যেহেতু তিনি নিজে হল ব্যবহার করেননি, বরং অভিভাবকের জবরদস্তিমূলক সিদ্ধান্তে হল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন এবং সিট বাতিলের চেষ্টাও করেছেন (অন্য বোনের মাধ্যমে হল সুপারকে জানিয়েছেন), সেহেতু এই সময়ের বিল তার উপর ঋণ হিসেবে বর্তাবে না। কারণ ইসলামী শরীয়তে বিনা ব্যবহারে ও বিনা সম্মতিতে কাউকে অর্থদণ্ড দেওয়া জুলুমের অন্তর্ভুক্ত।
৩. হল সুপারের দায় — হল সুপার যখন সিট বাতিলের আবেদন পেয়েও অভিভাবকের সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি, তখন তার উচিত ছিল সিটটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী বাতিল/শূন্য ঘোষণা করা। সে তা না করে সিট আটকে রেখে বিল বাড়িয়ে যাওয়া হল সুপারের অবহেলা ও জুলুম। এই বিল বোনটির উপর চাপানো শরীয়তসম্মত নয়।
বিস্তারিত দলিল-ভিত্তিক আলোচনা
১. ইসলামে ঋণ ও ক্ষতিপূরণের মূলনীতি
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ "ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির বদলে ক্ষতিও করা যাবে না।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১; মুসনাদে আহমাদ: ২৮৬৫ — হাসান)
এই হাদীসের মূলনীতি অনুযায়ী, যে ব্যক্তি কোনো সুবিধা ভোগ করেনি, তার উপর সেই সুবিধার মূল্য চাপানো যাবে না।
২. ইজারা (ভাড়া) চুক্তির শর্ত
হানাফী ফিকহে ইজারা (ভাড়া) চুক্তির মূল ভিত্তি হলো মানফাআত (সুবিধা) হস্তান্তর। ইমাম সারাখসী (রহ.) বলেন:
الإجارة عقد على المنافع، فإذا لم يسلم المعقود عليه لا يستحق الأجر "ইজারা হলো মানফাআতের চুক্তি; যখন চুক্তিকৃত বস্তু (সুবিধা) হস্তান্তরিত হয় না, তখন ভাড়া প্রাপ্য হয় না।" (আল-মাবসূত, কিতাবুল ইজারা)
ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:
ولو امتنع المؤجر من التسليم لا يستحق الأجرة "যদি ভাড়াদাতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়, তবে ভাড়া প্রাপ্য হবে না।" (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৪)
প্রয়োগ: বোনটি যখন হলের সিট ব্যবহার করেননি (কারণ অভিভাবক তাকে বাড়িতে রেখেছেন), তখন তার কাছ থেকে সেই সময়ের ভাড়া নেওয়া শরীয়তসম্মত নয়।
৩. জবরদস্তি ও বাধ্যবাধকতার বিধান
ইসলামী শরীয়তে ইকরাহ (জবরদস্তি) দ্বারা কৃত কাজের দায় আরোপিত হয় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
رُفِعَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأُ وَالنِّسْيَانُ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ "আমার উম্মত থেকে ভুল, বিস্মৃতি এবং যাতে তারা জবরদস্তির শিকার হয়েছে তা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৩; সুনানে বায়হাকী: ৬/৮৪ — সহীহ)
যেহেতু বোনটি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন এবং সিট বাতিলের চেষ্টাও করেছেন, সেহেতু তার উপর জোরপূর্বক চাপানো বিলের দায় শরীয়তসম্মতভাবে বর্তাবে না।
৪. হল সুপারের অবহেলা ও জুলুম
হল সুপার যখন:
- সিট বাতিলের আবেদন পেয়েছেন,
- অভিভাবকের সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি,
- তবুও সিট আটকে রেখে বিল বাড়িয়েছেন,
তখন এটি স্পষ্ট জুলুম ও অবহেলা। ফিকহের মূলনীতি হলো:
الضرر لا يزال "ক্ষতি দূর করা আবশ্যক।" (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম: ৮৩)
হল সুপারের উচিত ছিল সিটটি খালি/বাতিল ঘোষণা করা এবং অন্য কাউকে বুকিং দেওয়া। সে তা না করে বিল বাড়িয়ে যাওয়া তার নিজের দায়, বোনটির নয়।
সিদ্ধান্ত ও করণীয়
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | প্রথম দেড় বছরের বিল | বোনটির উপর প্রদেয় (ঋণ) — কারণ তিনি সিট ব্যবহার করেছেন | | পরবর্তী ৩ বছরের বিল | বোনটির উপর ঋণ নয় — কারণ তিনি ব্যবহার করেননি এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য হয়েছেন | | হল সুপারের দায় | সুপার জুলুম ও অবহেলার জন্য দায়ী; তার উচিত সিট বাতিল করা | | বোনের করণীয় | হল সুপারকে লিখিতভাবে জানানো যে সিট বাতিলের আবেদন পেশ করা হয়েছে এবং তিনি সিট ব্যবহার করছেন না |
করণীয় পদক্ষেপ:
১. লিখিত নোটিশ — বোনটি বা তার পক্ষ থেকে হল সুপারকে লিখিতভাবে জানান যে তিনি সিট বাতিল করতে চান এবং সিট ব্যবহার করছেন না। তারিখসহ কপি সংরক্ষণ করুন।
২. সাক্ষী রাখা — যে বোনের মাধ্যমে সিট বাতিলের কথা জানানো হয়েছিল, তাকে সাক্ষী হিসেবে রাখুন।
৩. প্রথম দেড় বছরের বিল পরিশোধ — সামর্থ্য থাকলে প্রথম দেড় বছরের বিল পরিশোধ করা উচিত, কারণ তা তার উপর প্রাপ্য।
৪. বাকি বিল পরিশোধে বাধ্য নয় — শরীয়ত অনুযায়ী বাকি বিল তার উপর বর্তাবে না। তবে সুপারের সাথে সৌজন্য ও সমঝোতার ভিত্তিতে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করুন।
৫. প্রয়োজনে অভিভাবকের সাথে যোগাযোগ — যেহেতু অভিভাবকের সিদ্ধান্তের কারণেই এই সমস্যা, তাই অভিভাবককে বিষয়টি বুঝিয়ে সমাধানে সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে।
বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ
যদি হল সুপার বা কর্তৃপক্ষ জোরপূর্বক এই বিল আদায় করতে চায়, তবে তা শরীয়তসম্মত নয়। বোনটির উপর কোনো ঋণ বর্তাবে না, কারণ:
- তিনি সিট ব্যবহার করেননি,
- তিনি সিট বাতিলের চেষ্টা করেছেন,
- তিনি জবরদস্তির শিকার হয়েছেন,
- সুপার তার দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন।
তবে প্রথম দেড় বছরের বিল তার উপর প্রাপ্য, কারণ তিনি সেই সময় সিট ব্যবহার করেছেন।
দু'আ
আল্লাহ তা'আলা বোনটিকে এই জুলুম থেকে মুক্তি দিন এবং তার উপর থেকে অন্যায় বিলের বোঝা হালকা করুন। আমীন।
والله أعلم بالصواب