বিবাহিত বোন বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অবিবাহিত বোনকে যাকাত দেওয়ার হানাফি ফিকহি বিধান।
Zakat and Charity · Hanafi
Question
আমার আপন বোন শারিরীক দিক থেকে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন, যার কারণে তার বিয়ে দেওয়া ও সম্ভব নয়। সে পুরোপুরি আমার উপর নির্ভর। আমার আর্থিক অবস্থা ও খুব একটা ভালো নয় কোনো নির্দিষ্ট আয় না থাকায়। আমার যাকাত ফরজ। এখন ওই যাকাত এর টাকা থেকে আমার বোনকে তার চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন এর জন্য অর্থ প্রদান করা যাবে কি??
Answer
উত্তর:
প্রশ্নোক্ত দুটি ক্ষেত্রেই যাকাত প্রদানের বিধান সম্পর্কে হানাফি ফিকহের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। নিচে প্রতিটি ক্ষেত্রে পৃথকভাবে বিশ্লেষণ ও ফতোয়া পেশ করা হলো।
প্রথম প্রশ্ন: বিবাহিত বোনকে যাকাত দেওয়া
আপনার বিবাহিত বোন বর্তমানে আর্থিক সংকটে রয়েছেন—স্বামীর ব্যবসায় ক্ষতি, ঋণ, সন্তানের স্কুলের বেতন ও ঘরভাড়া বকেয়া। ইসলামী শরিয়তে বিবাহিত নারীর ভরণপোষণের দায়িত্ব তার স্বামীর ওপর। আপনার (ভাই হিসেবে) তার ভরণপোষণ ফরজ নয়। তাই তিনি যাকাতের হকদারদের অন্তর্ভুক্ত (যদি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হন)।
হানাফি ফিকহের মত:
- রদ্দুল মুহতার (২/২৬৮): "যাকাত দেওয়া জায়েয নিজের ভাই-বোন, চাচা-ফুফু প্রভৃতিকে, যদি তারা যাকাতের হকদার হয় এবং দাতা তাদের ভরণপোষণের জন্য দায়ী না হয়।"
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১৯১): "বিবাহিত বোনকে যাকাত দেওয়া জায়েয, কারণ তার ভরণপোষণ স্বামীর দায়িত্ব।"
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৫২): "স্বামীর আয় কমে গেলে স্ত্রীকে যাকাত দেওয়া যাবে, যদি সে নিজে নেসাবের মালিক না হয়।"
সিদ্ধান্ত:
আপনার বোনের স্বামী বর্তমানে অসচ্ছল, তাই তিনি নিজে দরিদ্র। আপনি তাকে যাকাত দিতে পারেন। তবে শর্ত হলো—যাকাতের টাকা সরাসরি তার হাতে দিন, স্বামীর হাতে নয় (স্বামী যদি ঋণী হন তবে তাকে যাকাত দেওয়া জায়েয নয়, কারণ ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব তার নিজের)।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অবিবাহিত বোনকে যাকাত দেওয়া
আপনার বোন শারীরিকভাবে অক্ষম, অবিবাহিত ও সম্পূর্ণ আপনার ওপর নির্ভরশীল। আপনার নিজের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়, তবে আপনার ওপর যাকাত ফরজ (অর্থাৎ নেসাব পরিমাণ সম্পদ আছে)। এখন প্রশ্ন: এই বোনকে কি যাকাত দেওয়া যাবে?
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
- যাকাত দেওয়া নিষিদ্ধ যাদের ভরণপোষণ দেওয়া ফরজ—যেমন পিতা-মাতা, সন্তান, স্ত্রী।
- ভাই-বোনের ভরণপোষণ ফরজ তখনই, যখন ভাই-বোন অসহায়, উপার্জনে অক্ষম এবং ভাই-ই তার একমাত্র অভিভাবক। তবে এই ফরজিয়াত শর্তসাপেক্ষ:
- ভাইকে নিজের ও নিজ পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত সম্পদ থাকতে হবে।
- ভাই যদি নিজেই সংকটে থাকেন, তাহলে তার ওপর বোনের ভরণপোষণ ফরজ নয়।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (৩/৫৯৭): "ভাই-বোনের ভরণপোষণ ওয়াজিব যদি দাতা ধনী হয় এবং ভাই-বোন অভাবী হয়। কিন্তু দাতা নিজে অভাবী হলে তা ওয়াজিব নয়।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২২২): "নিজের নাবালিগ ভাই-বোনকে যাকাত দেওয়া জায়েয নয়, কারণ তাদের ভরণপোষণ দাতার ওপর ফরজ। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক ও উপার্জনে অক্ষম বোনের ক্ষেত্রে, যদি ভাইয়ের ওপর তার ভরণপোষণ ফরজ না হয় (যেমন ভাই নিজে সচ্ছল নয়), তাহলে যাকাত দেওয়া জায়েয।"
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৫৩): "যে ব্যক্তি নিজে দরিদ্রতার কাছাকাছি অবস্থায় আছে, তার ওপর ভাই-বোনের ভরণপোষণ ফরজ নয়। তাই সে তাদের যাকাত দিতে পারে।"
আপনার অবস্থার বিশ্লেষণ:
- আপনার কোনো নির্দিষ্ট আয় নেই, তবে যাকাত ফরজ হওয়ার অর্থ আপনার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ (সোনা/রূপা/নগদ) আছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আপনি ধনী। বরং আপনি যদি নিজের ও নিজ পরিবারের মৌলিক খরচের পর অতিরিক্ত না থাকেন, তাহলে আপনার ওপর বোনের ভরণপোষণ ফরজ নয়।
- বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বোনের চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন অত্যন্ত জরুরি। আপনি যদি তাকে নিজের অতিরিক্ত সম্পদ থেকে সাহায্য করতে অক্ষম হন (কারণ আপনার নিজের আয় নেই), তবে তাকে যাকাত দেওয়া বৈধ হবে।
সতর্কতা:
- সম্ভব হলে প্রথমে নিজের অ-যাকাত সম্পদ থেকে (যেমন নেসাবের অতিরিক্ত টাকা) তাকে সাহায্য করুন। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে যাকাত দেওয়া জায়েয।
- তবে আদর্শ হলো—যাকাত অন্যান্য দরিদ্রকে দেওয়া এবং বোনকে অন্য উপায়ে সহায়তা করা। কিন্তু বাধ্য অবস্থায় যাকাত দেওয়ায় কোনো দোষ নেই।
চূড়ান্ত ফতোয়া:
আপনার উভয় বোন যদি নেসাব পরিমান সম্পদের মালিক না হোন,সেক্ষেত্রে তাদেরকে যাকাত দেয়া জায়েজ আছে।