শাতিমে রাসুল সাঃ এর বিধান নিয়ে জানতে চাই।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।অন্য কেউ বা কোনো অমুসলিম শাতিমে রাসুল সাঃ নিশ্চিত বা নিশ্চিত ধারনা হয় কাউকে না বললে বা না জানালে কোনো কিছু বা কাজ না করলে গোনাহ বা ইমানে সমস্যা হবে কি?
Answer
উত্তর:
প্রশ্নটি ইসলামী আকীদা ও ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—যারা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে বেআদবী বা কটূক্তি করে (শাতিমে রাসূল) তাদের ব্যাপারে সাধারণ মুসলিমের কর্তব্য কী, বিশেষ করে যখন নিশ্চিত হওয়া যায় না বা নিশ্চিত ধারণা থাকে। হানাফী ফিকহ ও আকীদার আলোকে নিচে বিশদভাবে উত্তর দেওয়া হলো।
প্রথম অংশ: অনিশ্চিত অবস্থায় (নিশ্চিত না হওয়া বা সন্দেহ থাকা)
যদি কেউ (মুসলিম বা অমুসলিম) নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে এমন কিছু বলে বা করে যা শাতিমে রাসূল হিসেবে গণ্য হতে পারে, কিন্তু আপনি নিশ্চিত নন যে তার নিয়ত কী ছিল, নাকি ভুলে বা বেখেয়ালে বলেছে—এমন ক্ষেত্রে:
- গুনাহ বা ঈমানের সমস্যা হবে না যদি আপনি কিছু না বলেন বা না জানান। কারণ ইসলামে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য নিশ্চিত জ্ঞান (ইলমুল ইয়াকীন) বা নিশ্চিত ধারণা (গালিবুজ্জান) প্রয়োজন। সন্দেহের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা বা ব্যবস্থা নেওয়া জায়েজ নয়।
- কুরআন ও হাদীসে বলা হয়েছে:
- "হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকো, কারণ কোনো কোনো সন্দেহ পাপ।" (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)
- "আমার উম্মতের থেকে ভুল, ভুলে যাওয়া এবং যা করতে বাধ্য করা হয় তা ক্ষমা করা হয়েছে।" (ইবনু মাজাহ, হাদীস: ২০৪৫; সহীহ)
- হানাফী ফিকহের উসূল: কেউ যদি অজান্তে বা অসতর্কতাবশত এমন কথা বলে যা কুফরী মনে হয়, তাহলে তার নিয়ত ও উদ্দেশ্য বিবেচনা করা হবে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি কুফরী শব্দ উচ্চারণ করে, যদি তা তার জিহ্বা থেকে ভুলে বেরিয়ে যায় এবং তার অন্তর মুমিন থাকে, তবে সে কাফির হবে না।" (আল-ফিকহুল আকবর, ব্যাখ্যাসহ)
- সুতরাং: আপনার পক্ষ থেকে নিশ্চিত হওয়া ছাড়া কিছু না বলা বা না জানালে আপনার কোনো গুনাহ হবে না। বরং সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও অভিযোগ করা গুনাহ হতে পারে।
দ্বিতীয় অংশ: নিশ্চিত বা নিশ্চিত ধারণা থাকলে
যদি আপনি নিশ্চিত বা নিশ্চিত ধারণা পান (যেমন: সরাসরি শুনেছেন বা এমন প্রমাণ পেয়েছেন যে সন্দেহের অবকাশ নেই) যে কেউ (মুসলিম বা অমুসলিম) ইচ্ছাকৃতভাবে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে কটূক্তি বা বেআদবী করেছে, তাহলে আপনার কর্তব্য কী?
ক. সাধারণ নীতি:
ইসলামে ‘আমর বিল মা’রূফ ওয়ান নাহি আনিল মুনকার’ (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ) ফরজ। বিশেষ করে যেসব গুনাহ সরাসরি ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত (যেমন: শাতিমে রাসূল), সেগুলোর ব্যাপারে নীরব থাকা জায়েজ নয়, যদি নিষেধ করার সামর্থ্য থাকে এবং ফিতনার আশঙ্কা না থাকে।
খ. মুসলিম শাতিমের ক্ষেত্রে:
- যদি কোন মুসলিম এ কাজ করে, তবে সে কাফির হয়ে যায় (হানাফী মতে)। তার বিরুদ্ধে তওবা ও ইসলামের বিধান অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করাও জরুরি।
- আপনার কর্তব্য:
- প্রথমে তাকে নাসীহত করা এবং বুঝানো যে এটি কুফরী কাজ।
- যদি সে তওবা না করে, তাহলে স্থানীয় মুসলিম শাসক বা বিচারকের কাছে খবর দেওয়া। কারণ শাতিমে রাসূলের হদ্দ (শাস্তি) হলো মৃত্যুদণ্ড (হানাফী ফিকহ অনুযায়ী)।
- তবে যদি আপনি নাসীহত করতে অক্ষম হন (যেমন: আপনার কথা শোনার কেউ নেই, অথবা আপনার জানমালের ভয় থাকে), তাহলে অন্তত নিজের অন্তর থেকে ঘৃণা করা ও কাজটি খারাপ মনে করা আবশ্যক। নীরব থাকা এবং কিছু না করার কারণে সরাসরি গুনাহ হবে যদি আপনি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও উদাসীন থাকেন।
- ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ লিখেছেন: “নবীজীর বিরুদ্ধে কটূক্তি করলে তা শুনার পর নীরব থাকা জায়েজ নয়, বরং প্রতিবাদ করা ওয়াজিব; যদি প্রতিবাদ না করতে পারলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করা আর যথাসম্ভব সালামতি সহকারে প্রকাশ করা জরুরি।” (রাদ্দুল মুহতার, ৪/২৩৬)
গ. অমুসলিম শাতিমের ক্ষেত্রে:
- যদি কোনো অমুসলিম (যেমন: ইহুদী, খ্রিস্টান, মুরতাদ বা মুশরিক) নবীজীর শানে বেআদবী করে, তবে ইসলামী রাষ্ট্রে থাকলে তাকে শাস্তি দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে আপনার কর্তব্য হলো:
- তাকে প্রতিবাদ জানানো বা সংশোধন করার চেষ্টা করা (যদি সম্ভব হয়)।
- যদি প্রতিবাদে কোনো কল্যাণ না হয় বা আপনার ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে চুপ থাকা জায়েজ; তবে অন্তরে ঘৃণা পোষণ করবেন।
- গুনাহ হবে যদি আপনি এটাকে হাল্কা মনে করেন বা খুশী হন। কিন্তু যদি ভয়ে বা অপারগতায় কিছু না করেন, তাহলে ইমানে সমস্যা হবে না, যদি অন্তর বিদ্রোহী না হয়।
ঘ. নির্দিষ্ট জবাব:
- যদি নিশ্চিত বা নিশ্চিত ধারণা হন: তাহলে চুপ থাকা ও কিছু না করা গুনাহের কারণ হতে পারে, যদি আপনার কাছে প্রতিবাদ বা জানানোর সামর্থ্য থাকে এবং ফিতনার আশঙ্কা না থাকে। কিন্তু এ কারণে আপনার নিজের ঈমান চলে যাবে না, যতক্ষণ না আপনি মনে মনে সেই বেআদবীকে সত্য মনে করেন বা সমর্থন করেন।
- যদি কাউকে না জানানোই ভালো মনে করেন (যেমন: জানালে বড় ফিতনা হয়): তাহলে নীরব থাকা জায়েজ আছে। ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেছেন: “যখন দেখো যে, নিষেধ করা ফিতনা সৃষ্টি করবে বা অনিষ্ট বাড়াবে, তখন চুপ থাকাই উত্তম।” (শরহু মুশকিলিল আসার)
উপসংহার ও গুরুত্বপূর্ণ মাসয়ালা:
| অবস্থা | করণীয় | গুনাহ বা ঈমানের সমস্যা | |--------|--------|------------------------| | ১. অনিশ্চিত বা সন্দেহ থাকা | কিছু না করাই ভালো; সন্দেহের ভিত্তিতে অভিযোগ করবেন না। | কোনো গুনাহ নয়; ঈমানের সমস্যা নেই। | | ২. নিশ্চিত হওয়া (মুসলিম/অমুসলিম) | যথাসাধ্য প্রতিবাদ বা নাসীহত; সম্ভব না হলে অন্তরে ঘৃণা। | সামর্থ্য থাকলে নীরব থাকা গুনাহ, কিন্তু ঈমান নষ্ট হবে না। |
সারকথা:
- অনিশ্চিত অবস্থায় কিছু না করলে আপনার কোনো দায় হবে না। বরং সতর্কতা জরুরি।
- নিশ্চিত জানলে চুপ থাকার আগে দেখবেন প্রতিবাদ করা সম্ভব কি না। সম্ভব না হলে অন্তর থেকে বিদ্বেষ পোষণ করুন; তবে যাদের কাছে বিষয়টি পৌঁছানোর ক্ষমতা আছে তাদের জানানো উচিত (ফিকহী দৃষ্টিতে ওয়াজিব কেফায়া)।
উল্লেখ্য গ্রন্থসমূহ:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনু আবিদীন) – ৪/২৩৬, ৪/২৪০
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগীরী) – ২/২৬২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) – ৪/৩৩৫-৩৪২
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী) – ৩/৫৭৯-৫৮২
- আল-হিদায়া (মারগীনানী) – ২/২২২-২২৩
- শরহু মা‘আনিল আসার (তাহাবী) – ৩/২২৫
আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।