কুরআন তিলাওয়াতের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে 'কাফ' ও 'লাম' উচ্চারণ উল্টে গেলে কি নিকাহ ভঙ্গ হবে?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5090
Questioner: MD.NAZMUL HOSSEN SUMAN
Question Asked: 07 Sep 2026, 12:07 PM
Reviewed & Published: 07 Sep 2026, 12:17 PM
Views: 11
Tokens: 5,649
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম হুজুর,

আমি রোজার মধ্যে নিয়মিত কোরান পড়তেছি,

اَمۡ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡہِمۡ سُلۡطٰنًا فَہُوَ یَتَکَلَّمُ بِمَا کَانُوۡا بِہٖ یُشۡرِکُوۡنَ (৩০,৩৫)

আজকে উক্ত আয়াতটি পড়ার সময় যখন বোল্ট করা শব্দটি উচ্চারণ করি, তখন কাফের যায়গায় লাম এবং লামের জায়গায় কাফ উচ্চারণ করি। পড়তে পড়তেই আমি বুঝছিলাম আমার উচ্চারণ সঠিন হয় নি, এবং ফাহুয়া *লাক্কা উচ্চারণ করার পরপরই কোরান শরীফ পড়া থামাই।

কিন্তু কোরান শরীফ পড়ার সময় উচ্চারিত এই শব্দ টি তো "তা*" এই শব্দ এর মত।

এতে কি বৈবাহিক কোন সমস্যা হবে? কোরান শরীফ পড়ার সময় এই শব্দ টি উচ্চারণ করার সময় যে চিন্তা হচ্ছিল (মানে ভয় হচ্ছিল কোন সমস্যা হবে কিনা?), এইটা দ্বারা উদ্দেশ্য বোঝাবে কি না?

আমি কোরান শরীফ পড়ার সময় যখন এই ধরনের শব্দ উচ্চারণ করি তখন ভয় হয়, কোন সমস্যা হবে কিনা?

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রথমে একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, তা হল কোরআন শরীফ ভুল পড়ার সাথে বিবাহ ভেঙ্গে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তাই আপনার বিবাহে কোনো সমস্যা হয়নি। শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে নিজেকে রক্ষা করুন এবং নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত চালিয়ে যান।

আসুন আমরা বিষয়টি কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ করি।

১. কুফর ও বৈবাহিক সমস্যার মূলনীতি

হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো, কোনো ব্যক্তির মুখ থেকে কুফরি শব্দ বের হলে বা এমন কাজ করলে যা কুফর হিসেবে গণ্য, তবেই সে ইসলাম থেকে খারিজ হবে এবং তার স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যাবে। তবে এর জন্য শর্ত হলো, শব্দটি ইচ্ছাকৃতভাবে (قاصداً) এবং এর কুফরি অর্থ জেনে বা বুঝে উচ্চারণ করতে হবে। যদি কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে, ভুলে (সাহু) বা উচ্চারণের অসুবিধার কারণে এমন শব্দ উচ্চারণ করে ফেলে, যার অর্থ কুফরি হয়ে যায়, তাহলে সে কাফির হবে না এবং তার বিবাহ ভঙ্গ হবে না।

কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে:

"ولا يكفر المسلم بشيء من الأقوال ما لم يقصد به الكفر أو استحلاله" অর্থ: "কোনো মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কথা দ্বারা কাফির হবে না, যতক্ষণ না সে সেই কথা দ্বারা কুফর বা কুফরিকে হালাল (বৈধ) মনে করার ইচ্ছা পোষণ করে।"

(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২২৪, কিতাবুল জিহাদ, বাবু আহকামিল মুরতাদ্দিন)

২. আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ

আপনি যে আয়াতটি পড়েছেন:

اَمۡ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡہِمۡ سُلۡطٰنًا فَہُوَ یَتَکَلَّمُ بِمَا کَانُوۡا بِہٖ یُشۡرِکُوۡنَ (সূরা ফাতির: ৪০)

এখানে মূল শব্দটি হলো يَتَكَلَّمُ (ইয়াতাকাল্লামু)। আপনি উচ্চারণের সময় কাফ (ك) এর জায়গায় লাম (ل) এবং লাম (ل) এর জায়গায় কাফ (ك) উচ্চারণ করেছেন। অর্থাৎ আপনি শব্দটি يَتَلَكَّامُ (ইয়াতালাক্কামু) এর মতো উচ্চারণ করেছেন। আপনি নিজেই লিখেছেন, এটি উচ্চারণে "তা*" (অর্থাৎ তালা বা তাল্লা) শব্দের মতো শোনা গেছে।

এখন ফিকহের দৃষ্টিতে দেখুন:

১. উদ্দেশ্য (নিয়্যত): আপনার নিয়্যত ছিল কুরআন তিলাওয়াত করা। আপনার মনে কোনো প্রকার কুফরি উদ্দেশ্য ছিল না। বরং আপনি ভয় পেয়ে গেছেন এবং সাথে সাথে তিলাওয়াত থামিয়ে দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে আপনার ঈমান অটুট এবং আপনি ভুলটি ধরতে পেরেছেন।

২. অনিচ্ছা (ইকরাহ/সাহু): এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত উচ্চারণগত ভুল। জিহ্বার অসাবধানতা বা উচ্চারণের জটিলতার কারণে এমনটি হয়েছে। এটি কোনো ইচ্ছাকৃত কুফরি বাক্য নয়।

৩. শব্দের অর্থ: আপনি যে শব্দটি উচ্চারণ করেছেন (ইয়াতালাক্কামু বা তাল্লা), এটি আরবি ভাষায় কোনো অর্থপূর্ণ শব্দ নয় যা দ্বারা আল্লাহ, রাসূল বা ইসলামকে অবমাননা বোঝায়। এটি একটি অর্থহীন বিকৃত উচ্চারণ মাত্র। কুফরি শব্দ সেজন্যেই গণ্য হয়, যার একটি নির্দিষ্ট কুফরি অর্থ রয়েছে এবং তা বুঝে উচ্চারণ করা হয়। যেহেতু আপনার উচ্চারিত শব্দটির কোনো অর্থই নেই, তাই এটি কুফর হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

ফাতাওয়া উসমানি এবং ইমদাদুল ফাতাওয়ায় উল্লেখ আছে:

"কেউ যদি কুরআন তিলাওয়াতের সময় ভুলে বা উচ্চারণের দুর্বলতার কারণে কোনো শব্দ বিকৃত করে ফেলে, যার দ্বারা অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়, কিন্তু তার নিয়ত কুরআন পড়ারই থাকে এবং সে ভুল বুঝতে পেরে সাথে সাথে থেমে যায় বা ঠিক করে নেয়, তাহলে তার ঈমানের কোনো ক্ষতি হবে না এবং তার উপর কোনো কাফফারাও ওয়াজিব হবে না।"

(সূত্র: ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৮০; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৮৫)

৩. আপনার চিন্তা ও ভয়ের প্রভাব

আপনি লিখেছেন, উচ্চারণের সময় আপনার মনে ভয় ও চিন্তা কাজ করছিল যে, "কোনো সমস্যা হবে কিনা?"। এই চিন্তা বা ভয় দ্বারা আপনার উদ্দেশ্য বোঝাবে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর হলো, না, বোঝাবে না। বরং এই ভয়ই আপনার ঈমানের প্রমাণ। একজন মুমিন যখন ভুল করে ফেলে, তখন তার অন্তরে যে আফসোস ও ভয় তৈরি হয়, এটি তার ঈমানদারির লক্ষণ। এই ভয়কে কখনো কুফরি উদ্দেশ্য হিসেবে গণ্য করা হয় না। বরং হাদিসে আছে, মুমিনের গুনাহের পর তওবা করলে তা মাফ হয়ে যায় এবং এই ভয় তাকে আরও সতর্ক করে তোলে।

৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সমাধান

আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:

  • বৈবাহিক কোনো সমস্যা হবে না। আপনার নিকাহ সহীহ এবং বৈধ রয়েছে। আপনার স্ত্রী আপনার জন্য হালাল।
  • আপনি কাফির হননি। আপনার ঈমান অটুট রয়েছে।
  • আপনার এই ভুলের জন্য কোনো কাফফারা (ক্ষতিপূরণ) ওয়াজিব হয়নি। তবে, যেহেতু কুরআন পাঠে ভুল হয়েছে, তাই উত্তম হলো, আপনি যদি সেই আয়াতটি মনে রাখতে পারেন, তবে সঠিক উচ্চারণে আবার পড়ে নেওয়া। যদি মনে না থাকে, তাহলে কোনো আলেমের কাছ থেকে শুদ্ধ উচ্চারণ শিখে নেওয়া।
  • ভবিষ্যতে করণীয়: কুরআন পড়ার সময় ধীরে ধীরে (তারতীলের সাথে) পড়ার চেষ্টা করুন, যাতে উচ্চারণে সতর্কতা থাকে। শয়তান মানুষকে কুরআন পাঠ থেকে বিরত রাখতে এবং মনে ওয়াসওয়াসা (খারাপ চিন্তা) সৃষ্টি করতে চায়। আপনার এই ভয়টি মূলত শয়তানের ওয়াসওয়াসা। আপনি যখনই কুরআন পড়বেন, শুরুতে "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ে নিবেন এবং দৃঢ় বিশ্বাস রাখবেন যে, আল্লাহ আপনার নিয়ত সম্পর্কে অবগত আছেন। অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য তিনি আপনাকে পাকড়াও করবেন না।

কুরআনের ঘোষণা:

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا অর্থ: "আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)

رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا অর্থ: "হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি, তবে আমাদেরকে পাকড়াও করো না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)

আল্লাহ তাআলা আপনার এই ছোট্ট ভুলটি মাফ করে দিন এবং আপনার ঈমানকে আরও মজবুত করুন। আপনি নির্ভাবনায় থাকুন, আপনার কোনো সমস্যা হয়নি। শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে নিজেকে রক্ষা করুন এবং নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত চালিয়ে যান।

উত্তর প্রদানে সহায়ক গ্রন্থসমূহ:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড: ৪, কিতাবুল জিহাদ
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি), খণ্ড: ২
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি কেফায়াতুল্লাহ), খণ্ড: ৫
  • ফাতাওয়া আলমগীরি, খণ্ড: ২, কিতাবুস সিয়ার

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.