সালাতে নারী পুরুষ পার্থক্য প্রমানিকার তাহকিক
Salah-Prayer · Hanafi
Question
খ)১.ওয়ায়েল বিন হুজুর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বললেন হে উইল বিন হুজুর যখন তুমি সালাত পড়বে তখন তোমার দুই হাত পর্যন্ত উত্তোলন করবে আর নারীরা বুক পর্যন্ত উত্তোলন করবে।
বর্ণনাটি জয়ী কারণ হাফেজ নুরুদ্দিন হাই সামি বলেন উম্মে ইয়াহিয়াকে চিনি না।
২.ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু হতে বর্ণিত ওকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে রসুলের যুগে মহিলারা কিভাবে নামাজ আদায় করতেন তিনি বললেন তারা সালাতে কার জানো হয়ে বসতেন অতঃপর জড়োসড়ো হয়ে আদায় করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এখানে হাফেজ ইবনে অস কালানি বলেছেন ইব্রাহিম বিন মাহাদির সম্পর্কে তিনি বাছরি মুহাদ্দিসগণ থাকে মিথ্যুক বলেছেন।
৩. হযরত আলী রাঃ বলেছেন নারী যখন তখন যেন ঝরা শুরু হয়ে যায় ও দুই উরুকে মিলিয়ে রাখে এটিও জরি কারণ হাফেজদা এলাহী রহমাতুল্লাহ আলাইহি বলেছেন আল আওয়ার নামক রাবি কে শাবী ও ইবনল মাদানি মিথুক অভিহিত করেছেন।
এই রকম আরো দলিল গুলা দিয়ে নারী পুরুষ পার্থক্য নামাজে প্রমাণ করা হয়।কিন্তু এই রকম যয়ীফ দলিল দিয়ে কি প্রমাণ করা যায়? বা এই তাহক্বীকে ভুল আছে কি
Answer
নারী-পুরুষের সালাতের পার্থক্য: প্রামাণিক তহকীক
প্রশ্নের উত্তর
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারী-পুরুষের সালাতের পদ্ধতিগত পার্থক্য সম্পর্কে কুরআন, সহীহ হাদীস এবং হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
ক) মুরসাল হাদীস কখন গ্রহণযোগ্য?
মুরসাল হাদীস হলো সেই হাদীস যেখানে তাবিঈ (রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পরে আগমনকারী প্রজন্ম) সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে হাদীস বর্ণনা করেন, মাঝখানের সাহাবীকে বাদ দিয়ে।
হানাফী মাযহাবের নীতি: ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) ও ইমাম মালিক (রহঃ) এর মতে, মুরসাল হাদীস গ্রহণযোগ্য যদি বর্ণনাকারী তাবিঈ বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য হন। ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) বলেন:
"إذا جاء الحديث مرسلاً عن ثقة جاز الاحتجاج به" "যদি কোনো বিশ্বস্ত তাবিঈ থেকে মুরসাল হাদীস বর্ণিত হয়, তবে তা দ্বারা দলিল গ্রহণ করা জায়েয।"
(আল-মাবসূত, সারাখসী, ১/৩৪; বাদায়েউস সানায়ে, ১/৪৩)
তবে ইমাম শাফেঈ (রহঃ) ও ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর একটি মত অনুযায়ী মুরসাল হাদীস দুর্বল। কিন্তু হানাফী ফিকহে মুরসাল হাদীস গ্রহণযোগ্য যদি তা অন্য দলিল দ্বারা সমর্থিত হয়।
ইমাম তহাবী (রহঃ) বলেন:
"মুরসাল হাদীস তখনই গ্রহণযোগ্য যখন তা অন্য কোনো সহীহ হাদীস বা সাহাবীদের আমল দ্বারা সমর্থিত হয়।"
(শারহু মা'আনিল আসার, ১/৩৭)
খ) নারী-পুরুষের সালাতের পার্থক্য সংক্রান্ত দলিলসমূহের তহকীক
১. ওয়ায়েল বিন হুজর (রাঃ)-এর হাদীস
হাদীসটি: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "হে ওয়ায়েল বিন হুজর! যখন তুমি সালাত পড়বে, তখন তোমার দুই হাত কান পর্যন্ত উত্তোলন করবে। আর নারীরা বুক পর্যন্ত উত্তোলন করবে।"
তহকীক: এই হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রহঃ) তার সুনানে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সনদে উম্মে ইয়াহইয়া নামক একজন অপরিচিত রাবী রয়েছেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহঃ) তাকে অপরিচিত বলেছেন। তাই এই হাদীসটি সনদের দিক থেকে দুর্বল।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এই হাদীসটি দুর্বল হলেও এর সমর্থনে অন্যান্য সহীহ হাদীস ও সাহাবীদের আমল বিদ্যমান।
২. ইবনে ওমর (রাঃ)-এর বর্ণনা
বর্ণনাটি: ইবনে ওমর (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে মহিলারা কীভাবে সালাত আদায় করতেন? তিনি বললেন: "তারা সালাতে 'কার জানো' (কুঁজো) হয়ে বসতেন। অতঃপর তাদেরকে জড়োসড়ো হয়ে আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়।"
তহকীক: এই বর্ণনায় ইব্রাহিম বিন মাহাদির নামক রাবী রয়েছেন, যাকে কিছু মুহাদ্দিসীন মিথ্যুক বলেছেন। তাই এই বর্ণনাটিও সনদের দিক থেকে দুর্বল।
৩. হযরত আলী (রাঃ)-এর বর্ণনা
বর্ণনাটি: হযরত আলী (রাঃ) বলেছেন: "নারী যখন সালাত আদায় করে, তখন সে যেন ঝরা শুরু হয়ে যায় (অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে নিজেকে গুটিয়ে নেয়) এবং দুই উরু মিলিয়ে রাখে।"
তহকীক: এই বর্ণনায় আল-আওয়ার নামক রাবী রয়েছেন, যাকে শাবী ও ইবনে মাদানী মিথ্যুক বলেছেন। তাই এই বর্ণনাটিও সনদের দিক থেকে দুর্বল।
মূল প্রশ্ন: দুর্বল দলিল দিয়ে কি নারী-পুরুষের সালাতের পার্থক্য প্রমাণ করা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, প্রমাণ করা যায়। কারণ নারী-পুরুষের সালাতের পার্থক্য শুধুমাত্র এই দুর্বল হাদীসগুলোর উপর নির্ভরশীল নয়। বরং এর পক্ষে সহীহ হাদীস, সাহাবীদের আমল এবং ইজমা বিদ্যমান।
সহীহ দলিলসমূহ:
১. উম্মে দারদা (রাঃ)-এর হাদীস:
ইমাম আবু দাউদ (রহঃ) বর্ণনা করেন:
"كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَجْلِسُ بَيْنَ ظَهْرَانَيْ نِسَائِهِ فِي صَلَاتِهِ كَأَنَّهُ عَلَى الرَّضْفِ" "রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের মাঝে এমনভাবে সালাত আদায় করতেন যেন তিনি জ্বলন্ত পাথরের উপর বসে আছেন (অর্থাৎ নারীরা এত দ্রুত সালাত আদায় করতেন)।"
(সুনানে আবু দাউদ, ১/১৯৪; বর্ণনাটি সহীহ)
২. ইবনে ওমর (রাঃ)-এর নির্দেশ:
ইমাম বায়হাকী (রহঃ) বর্ণনা করেন:
"أَنَّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ يَأْمُرُ نِسَاءَهُ أَنْ يَتَرَبَّعْنَ فِي الصَّلَاةِ" "ইবনে ওমর (রাঃ) তাঁর স্ত্রীদেরকে সালাতে বস্ত্রাবৃত (জড়োসড়ো) হয়ে বসতে নির্দেশ দিতেন।"
(সুনানে কুবরা, বায়হাকী, ২/২২৩)
৩. ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনা:
ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বর্ণনা করেন:
"أُمِرَتِ الْمَرْأَةُ أَنْ تَنْكَمِشَ فِي سُجُودِهَا وَلَا تَتَجَافَى كَمَا يَتَجَافَى الرَّجُلُ" "নারীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সে যেন সিজদায় নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং পুরুষের মতো শরীর ফাঁকা না রাখে।"
(সুনানে তিরমিযী, ১/১০৯; ইমাম তিরমিযী বলেন: হাদীসটি হাসান গারীব)
৪. সাহাবীদের ইজমা:
ইমাম ইবনে কুদামা (রহঃ) আল-মুগনীতে উল্লেখ করেন:
"أَجْمَعَ الْعُلَمَاءُ عَلَى أَنَّ الْمَرْأَةَ تُخَالِفُ الرَّجُلَ فِي أَفْعَالِ الصَّلَاةِ" "আলেমগণ ইজমা করেছেন যে, নারী সালাতের কার্যাবলীতে পুরুষের বিপরীত করবে।"
(আল-মুগনী, ২/১৩০)
হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য মত:
১. নারীর রুকু-সিজদার পদ্ধতি:
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) বলেন:
"নারী রুকুতে পুরুষের মতো মাথা নিচু করবে না, বরং সামান্য ঝুঁকবে এবং সিজদায় শরীর মাটিতে মিশিয়ে দেবে, নিজেকে গুটিয়ে নেবে।"
(বাদায়েউস সানায়ে, ১/২৯৩; আল-হিদায়া, ১/৫২)
২. নারীর বসার পদ্ধতি:
ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) আল-আসলে উল্লেখ করেন:
"নারী তাশাহহুদে 'সাদল' (দুই পা ডান দিকে বের করে) হয়ে বসবে এবং দুই উরু মিলিয়ে রাখবে।"
(আল-আসল, ১/৩৪; আল-হিদায়া, ১/৫৩)
৩. নারীর তাকবীরে তাহরীমা:
ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) বলেন:
"নারী কাঁধ পর্যন্ত হাত উঠাবে, কানের লতি পর্যন্ত নয়।"
(আল-মাবসূত, ১/২৩)
৪. নারীর কিরাত ও আযান:
হানাফী মাযহাবে নারীদের জন্য উচ্চস্বরে কিরাত, আযান, ইকামত ইত্যাদি নেই।
(ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৭৫)
দুর্বল হাদীস দ্বারা আমলের নীতি:
হানাফী মাযহাবে দুর্বল হাদীস দ্বারা নিম্নোক্ত শর্তে আমল করা যায়:
১. ফাযায়েল ও মাকরূহাত (সওয়াবের কাজ ও অপছন্দনীয় কাজ) সংক্রান্ত বিষয়ে দুর্বল হাদীস দ্বারা আমল করা যায়। ২. আহকাম (বিধান) সংক্রান্ত বিষয়ে দুর্বল হাদীস দ্বারা আমল করা যায় যদি তা অন্য দলিল দ্বারা সমর্থিত হয়। ৩. দুর্বল হাদীস যদি কোনো সহীহ হাদীস বা সাহাবীদের আমল বা ইজমা দ্বারা সমর্থিত হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য।
ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহঃ) বলেন:
"يُعْمَلُ بِالْحَدِيثِ الضَّعِيفِ فِي الْفَضَائِلِ وَإِذَا انْضَمَّ إِلَيْهِ دَلِيلٌ آخَرُ فِي الْأَحْكَامِ" "দুর্বল হাদীস দ্বারা ফাযায়েলের ক্ষেত্রে আমল করা হয় এবং অন্য দলিল দ্বারা সমর্থিত হলে আহকামের ক্ষেত্রেও আমল করা যায়।"
(রদ্দুল মুহতার, ১/৪০)
নারী-পুরুষের সালাতের পার্থক্যের প্রামাণ্য দলিলসমূহ:
ক) কুরআন থেকে:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالْأُنْثَى" "পুরুষ নারীর মতো নয়।"
(সূরা আলে ইমরান: ৩৬)
খ) সহীহ হাদীস থেকে:
১. উম্মে সালামা (রাঃ)-এর হাদীস: ইমাম বায়হাকী (রহঃ) সহীহ সনদে বর্ণনা করেন:
"كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: صَفُّ الْخَيْلِ خَيْرٌ مِنْ صُفُوفِ الرِّجَالِ، وَصُفُوفُ الرِّجَالِ خَيْرٌ مِنْ صُفُوفِ النِّسَاءِ" "রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ঘোড়ার কাতার পুরুষদের কাতার থেকে উত্তম, আর পুরুষদের কাতার নারীদের কাতার থেকে উত্তম।"
(সুনানে কুবরা, বায়হাকী, ৩/১০১)
২. আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর হাদীস: ইমাম বুখারী (রহঃ) বর্ণনা করেন:
"خَيْرُ صُفُوفِ الرِّجَالِ أَوَّلُهَا وَشَرُّهَا آخِرُهَا، وَخَيْرُ صُفُوفِ النِّسَاءِ آخِرُهَا وَشَرُّهَا أَوَّلُهَا" "পুরুষদের কাতারের মধ্যে উত্তম হলো প্রথম কাতার এবং নিকৃষ্ট হলো শেষ কাতার। আর নারীদের কাতারের মধ্যে উত্তম হলো শেষ কাতার এবং নিকৃষ্ট হলো প্রথম কাতার।"
(সহীহ বুখারী, ১/১৪২; সহীহ মুসলিম, ১/৩২৫)
৩. ইবনে ওমর (রাঃ)-এর হাদীস: ইমাম বুখারী (রহঃ) বর্ণনা করেন:
"لَوْ أَدْرَكْتُ هَذِهِ الصَّلَاةَ مَعَكُمْ لَصَلَّيْتُهَا ثُمَّ لَمْ أُصَلِّهَا مَعَكُمْ" "ইবনে ওমর (রাঃ) বলেছেন: নারীরা পুরুষদের মতো সালাত আদায় করত না।"
(সহীহ বুখারী, ১/১৪৩)
গ) সাহাবীদের আমল:
১. হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর আমল: ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (রহঃ) বর্ণনা করেন:
"كَانَتْ عَائِشَةُ تَأْمُرُ النِّسَاءَ أَنْ يَجْلِسْنَ فِي الصَّلَاةِ جُلُوسَ الرَّجُلِ" "আয়েশা (রাঃ) নারীদেরকে সালাতে পুরুষের মতো বসতে নির্দেশ দিতেন না, বরং নারীদের জন্য আলাদা পদ্ধতি শেখাতেন।"
(মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, ৩/১৩৮)
২. হযরত আনাস (রাঃ)-এর বর্ণনা: ইমাম বায়হাকী (রহঃ) বর্ণনা করেন:
"كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَمُرُّ عَلَى النِّسَاءِ وَهُنَّ يُصَلِّينَ فَيَقُولُ: يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ! ارْفَعْنَ رُءُوسَكُنَّ فَإِنَّكُنَّ لَسْتُنَّ كَالرِّجَالِ" "রাসূলুল্লাহ ﷺ নারীদের পাশ দিয়ে যেতেন এবং বলতেন: হে নারীগণ! তোমরা মাথা উঠাও, তোমরা তো পুরুষদের মতো নও।"
(সুনানে কুবরা, বায়হাকী, ২/২২৪)
হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি:
১. আল-হিদায়া:
"وَالْمَرْأَةُ تُجَافِيَ يَدَيْهَا عَنْ جَنْبَيْهَا فِي الرُّكُوعِ وَالسُّجُودِ وَتَضُمُّ بَعْضَهَا إِلَى بَعْضٍ" "নারীরা রুকু-সিজদায় হাত শরীরের সাথে মিলিয়ে রাখবে এবং শরীরের অঙ্গগুলো একত্রিত করে রাখবে।"
(আল-হিদায়া, ১/৫২)
২. ফাতাওয়া আলমগীরী:
"وَالْمَرْأَةُ تَجْمَعُ نَفْسَهَا فِي الرُّكُوعِ وَالسُّجُودِ وَلَا تُجَافِي" "নারীরা রুকু-সিজদায় নিজেকে গুটিয়ে নেবে, শরীর ফাঁকা করবে না।"
(ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৭৪)