নারীদের ঘরের বাহিরে বেড়িয়ে আলাদা পরিবেশ বানিয়ে নারীদের মিলনমেলা সম্পর্কে শরঈ বিধান কি?

Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 4934
Questioner: Mizanur Rahman
Question Asked: 04 Sep 2026, 01:58 AM
Reviewed & Published: 04 Sep 2026, 05:39 AM
Views: 6
Tokens: 7,454
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ।
বর্তমানে নারীদের দেখা যায় ।তারা অনলাইনে দ্বীনি প্রতিষ্ঠান চালান।তারা হয়তো আলেমা /উস্তাজা টাইপ কিছু।তো অনেক জেনারেল বোনেরা তাদের আলোচনার দ্বারা উপকৃত হোন এবং তারা ইসলামকে চিনে থাকে এসব এর প্রেক্ষিতে তাদের মনে অনেক আশা জাগে তাদের উস্তাজা কে সামনাসামনি দেখতে পাওয়া।এরই প্রেক্ষিতে বর্তমানে দেখা যায় প্রায় অনেক জায়গায় দ্বীনি বোনদের মিলনায়তন হয়।যেখানে শুধু মেয়েরা থাকে ।ছেলে এলাউড হয় না।

এরূপ আয়োজন করে মিলনায়তন এর ব্যাপারে ইসলামের সমর্থক আসলে কতটুকু।

এবং রিসেন্টলি আরেকটা জিনিস দেখলাম যেখানে কোনো এক আলেমা/উস্তাজা হবেন।তিনি আয়োজন করে থাকেন প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট প্লেইস এ ।নারীদের ১ দিনে সেখানে বিভিন্ন স্টল দেয়াএ সুযোগ থাকে অনলাইন এ যারা পেইজ চালান তারা সেখানে সুযোগ পান স্টল দেয়ার।
এবং ক্রেতাও শুধু মেয়েরাই হয় তার প্রেক্ষিতে দেখা যায় একই জেলা হলেও বিভিন্ন এলাকা/থানা থেকে মেয়েরা সেখানে জয়েন করেন।।
বি:দ্র: আমার এগুলাতে ফিতনা মনে হয় শুধু,তাই নিজের মাহরাম কে কখন এগুলাতে যাওয়ার অনুমতি দেই না



তো আমার।প্রশ্ন হচ্ছে এরকম ভাবে আয়োজন করে ,দ্বীনি আলোচনার জন্য মেয়েদের কতটুকু উৎসাহিত করেছে ইসলাম? নাকি তারা নির্দিষ্ট গন্ডিতে থেকে তাদের সাধ্যমত দ্বীন প্রচার করবে?

Answer

নারীদের মিলনায়তন ও দ্বীনি আলোচনা: শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি

উত্তর:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। ইসলাম নারীদের দ্বীনি শিক্ষা অর্জন ও অন্যদেরকে দ্বীন শেখানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে, তবে তা নির্দিষ্ট শর্ত ও সীমারেখার মধ্যে। নারীদের জন্য পৃথক পরিবেশে দ্বীনি আলোচনা, মিলনায়তন বা সমাবেশের বিধান সম্পর্কে নিম্নে কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনের আলোকে বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:


১. নারীদের দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের বৈধতা

ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য জ্ঞানার্জনকে ফরজ ঘোষণা করেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ "জ্ঞানার্জন প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ।" (ইবনে মাজাহ: ২২৪, সহীহুল জামি': ৩৯১৪)

নারীদের শিক্ষাদানের দৃষ্টান্ত আমরা সাহাবিয়াতদের মধ্যে পাই। আয়েশা (রাঃ) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ আলেমা, যাঁর থেকে বহু পুরুষ সাহাবীও হাদীস শিখেছেন। ইমাম যুহরী (রহঃ) বলেছেন:

"আয়েশা (রাঃ)-এর জ্ঞানের তুলনায় অন্যান্য সকল মানুষের জ্ঞান একত্র করলে তা তাঁর জ্ঞানের তুলনায় নগণ্য।" (সিয়ারু আলাম আন-নুবালা: ২/১৩৫)


২. নারীদের জন্য পৃথক মিলনায়তন/সমাবেশের বিধান

ক. বৈধতার শর্তাবলী

নারীদের জন্য পৃথক পরিবেশে দ্বীনি আলোচনা বা মিলনায়তন নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ সাপেক্ষে বৈধ হতে পারে:

১. সম্পূর্ণ পর্দা বজায় রাখা — স্থানটি এমন হতে হবে যেখানে কোনো পুরুষের প্রবেশের সুযোগ নেই এবং নারীরা বেপর্দা হতে পারবে না। ২. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ — আলোচনা যেন কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক হয়। ৩. ফিতনার কারণ না হওয়া — কোনো প্রকার গান-বাজনা, অশ্লীলতা বা অপচয় যেন না থাকে। ৪. মাহরামের অনুমতি ও সঙ্গ — সফর হলে মাহরাম ছাড়া নয়।

খ. কুরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ "আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করো এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন করো না।" (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)

ইমাম ইবনে কাসীর (রহঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন:

"অর্থাৎ নারীদের জন্য নির্দেশ হলো ঘরে অবস্থান করা। প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া যাবে, তবে পর্দা ও শালীনতা বজায় রেখে।" (তাফসীর ইবনে কাসীর: ৬/৪০৭)

গ. হাদীসের দৃষ্টান্ত

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নারীদের জন্য আলাদা শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন:

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَالَتِ النِّسَاءُ لِلنَّبِيِّ ﷺ: غَلَبَنَا عَلَيْكَ الرِّجَالُ، فَاجْعَلْ لَنَا يَوْمًا مِنْ نَفْسِكَ، فَوَعَدَهُنَّ يَوْمًا... "আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নারীরা নবী (ﷺ)-কে বলল: পুরুষেরা আপনার কাছে এসে আমাদেরকে ছাড়িয়ে গেছে। সুতরাং আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একটি দিন নির্ধারণ করুন। তখন তিনি তাদেরকে একটি দিনের ওয়াদা দিলেন..." (সহীহ বুখারী: ১০১)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন:

"নারীদের জন্য পৃথকভাবে দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করা বৈধ, যেমনটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে ছিল। তবে শর্ত হলো সম্পূর্ণ পর্দা রক্ষা এবং ফিতনা থেকে দূরে থাকা।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ২২/১৪৩)


৩. নারীদের প্রকাশ্য সমাবেশ ও স্টল প্রদর্শনের বিধান

ক. সমস্যার মূল পয়েন্টসমূহ

আপনি যে ধরনের আয়োজনের কথা উল্লেখ করেছেন (যেখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে নারীরা একত্রিত হয়, স্টল থাকে, ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই নারী), সেখানে নিম্নোক্ত সমস্যাগুলো থাকতে পারে:

১. সফরের প্রয়োজন — বিভিন্ন থানা/এলাকা থেকে আসতে হলে দূরত্বের সফর লাগতে পারে, যা মাহরাম ছাড়া নারীর জন্য জায়েয নয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

لَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ "কোনো নারী মাহরাম ছাড়া সফর করবে না।" (সহীহ বুখারী: ১০৮৮, সহীহ মুসলিম: ১৩৪১)

২. অপ্রয়োজনীয় বের হওয়া — ইসলাম নারীদের ঘরে অবস্থানকে পছন্দ করে। শুধু প্রয়োজনেই বের হওয়ার অনুমতি রয়েছে।

৩. ফিতনার আশঙ্কা — বড় সমাবেশে ফিতনার আশঙ্কা বেশি থাকে।

খ. সালাফদের বক্তব্য

ইমাম আওযাঈ (রহঃ) বলেন:

"নারীদের জন্য মসজিদে জামাআতে অংশগ্রহণ করা বৈধ, তবে যখন তারা ঘরে নামায পড়ে, তা তাদের জন্য উত্তম।" (আল-মুহাল্লা: ৩/১৩৬)

শাইখ ইবনে বায (রহঃ) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল নারীদের জন্য পৃথক দ্বীনি মাহফিলের আয়োজন সম্পর্কে। তিনি বলেন:

"যদি মাহফিলটি সম্পূর্ণ পর্দার মধ্যে হয়, কোনো পুরুষ সেখানে না থাকে, এবং বিষয়বস্তু কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক হয়, তবে ইনশাআল্লাহ এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে নারীদের জন্য উত্তম হলো ঘরে অবস্থান করা এবং ঘরেই দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করা। প্রয়োজনে বের হলে পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখতে হবে।" (মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে বায: ২৮/৩৩৫)

শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:

"নারীদের জন্য দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করা ফরজ, তবে তা পর্দার মধ্যে হতে হবে। নারীদের জন্য প্রকাশ্যে বের হওয়া, বিশেষত যখন সেখানে ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তা জায়েয নয়।" (আল-মুনতাকা: ৩/১৬৪)


৪. নারীদের দ্বীন প্রচারের সঠিক পদ্ধতি

ক. ঘর থেকেই দ্বীন প্রচার

ইসলাম নারীদের জন্য সর্বোত্তম পদ্ধতি হিসেবে ঘরে অবস্থান করাকে নির্ধারণ করেছে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন:

"নারীদের জন্য সর্বোত্তম হলো ঘরে অবস্থান করা। তারা ঘরে বসেই দ্বীনি শিক্ষা দিতে পারে, বিশেষত অন্যান্য নারীদেরকে।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ২২/১৪৮)

খ. প্রযুক্তির ব্যবহার

আধুনিক প্রযুক্তি (অনলাইন ক্লাস, সোশ্যাল মিডিয়া) ব্যবহার করে নারীরা ঘরে বসেই দ্বীন প্রচার করতে পারে। শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহঃ) বলেন:

"যদি নারী ঘরে বসে অনলাইনে বা অন্য কোনো মাধ্যমে দ্বীনি শিক্ষা দেয়, এবং তা পর্দা রক্ষা করে হয়, তবে এটি উত্তম পদ্ধতি।" (লিকাউল বাব আল-মাফতুহ: ২/২৪৫)

গ. সতর্কতা

১. নারীদের জন্য প্রকাশ্যে বের হওয়া, বিশেষত বড় সমাবেশে অংশ নেওয়া, শরীয়তসম্মত পর্দা ও শর্ত ছাড়া জায়েয নয়। ২. দ্বীন প্রচারের নামে ফিতনা সৃষ্টি করা বা অপচয় করা যাবে না। ৩. মাহরামের অনুমতি ও সঙ্গ ছাড়া সফর করা যাবে না।


৫. আপনার পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে

আপনি যে ফিতনার কথা উল্লেখ করেছেন, তা সঠিক। শাইখ আল-আলবানী (রহঃ) বলেন:

"নারীদের জন্য বের হওয়ার মূল উদ্দেশ্য যদি হয় প্রয়োজন মেটানো, তবে তা সীমিত পরিসরে হতে হবে। কিন্তু যখন তা বড় সমাবেশ, প্রদর্শনী বা মেলায় রূপ নেয়, তখন ফিতনার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়।" (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর: ৬২৫)


৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

সংক্ষেপে বলতে গেলে:

১. নারীদের দ্বীনি শিক্ষা ও শিক্ষাদান বৈধ — তবে তা পর্দা ও শালীনতা বজায় রেখে হতে হবে। ২. নারীদের পৃথক মিলনায়তন — যদি সম্পূর্ণ পর্দার মধ্যে হয়, কোনো পুরুষের প্রবেশ না থাকে, এবং ফিতনার কারণ না হয়, তবে সীমিত পরিসরে বৈধ হতে পারে। ৩. বড় সমাবেশ, স্টল প্রদর্শনী, বিভিন্ন এলাকা থেকে আগমন — এ ধরনের আয়োজনে ফিতনার আশঙ্কা বেশি, তাই তা থেকে বিরত থাকা উত্তম। ৪. সর্বোত্তম পদ্ধতি — নারীরা ঘরে অবস্থান করে, ঘর থেকেই দ্বীনি শিক্ষা ও প্রচার করবেন। প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে, পর্দা রক্ষা করে এবং মাহরামের অনুমতি নিয়ে বের হতে পারবেন।

শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহঃ) বলেন:

"নারীদের জন্য দ্বীনি কাজে অংশ নেওয়ার সর্বোত্তম উপায় হলো ঘরে বসে শিক্ষা দেওয়া, বই লেখা, এবং প্রয়োজনে অন্যান্য নারীদের সাথে সীমিত পরিসরে আলোচনা করা।" (ফাতাওয়া নুরুন আলাদ দারব: ১১/২)


আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আমরা আপনার দ্বীনি উদ্বেগ ও সতর্কতাকে সমর্থন করি। আপনার মাহরামদেরকে এ ধরনের আয়োজনে অংশ নিতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সঠিক ও প্রশংসনীয়।


দলিলভিত্তিক আরও জানতে চাইলে নিম্নোক্ত বইগুলো পড়তে পারেন:

  • মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ (২২তম খণ্ড)
  • মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে বায (২৮তম খণ্ড)
  • ফাতাওয়া নুরুন আলাদ দারব (ইবনে উসাইমীন)
  • সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর (আল-আলবানী)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.