নারীদের আয়োজন করে মিলনমেলা করার বিধান কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 4933
Questioner: Mizanur Rahman
Question Asked: 04 Sep 2026, 01:46 AM
Reviewed & Published: 04 Sep 2026, 05:32 AM
Views: 29
Tokens: 6,439
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ।
বর্তমানে নারীদের দেখা যায় ।তারা অনলাইনে দ্বীনি প্রতিষ্ঠান চালান।তারা হয়তো আলেমা /উস্তাজা টাইপ কিছু।তো অনেক জেনারেল বোনেরা তাদের আলোচনার দ্বারা উপকৃত হোন এবং তারা ইসলামকে চিনে থাকে এসব এর প্রেক্ষিতে তাদের মনে অনেক আশা জাগে তাদের উস্তাজা কে সামনাসামনি দেখতে পাওয়া।এরই প্রেক্ষিতে বর্তমানে দেখা যায় প্রায় অনেক জায়গায় দ্বীনি বোনদের মিলনায়তন হয়।যেখানে শুধু মেয়েরা থাকে ।ছেলে এলাউড হয় না।

এরূপ আয়োজন করে মিলনায়তন এর ব্যাপারে ইসলামের সমর্থক আসলে কতটুকু।

এবং রিসেন্টলি আরেকটা জিনিস দেখলাম যেখানে কোনো এক আলেমা/উস্তাজা হবেন।তিনি আয়োজন করে থাকেন প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট প্লেইস এ ।নারীদের ১ দিনে সেখানে বিভিন্ন স্টল দেয়াএ সুযোগ থাকে অনলাইন এ যারা পেইজ চালান তারা সেখানে সুযোগ পান স্টল দেয়ার।
এবং ক্রেতাও শুধু মেয়েরাই হয় তার প্রেক্ষিতে দেখা যায় একই জেলা হলেও বিভিন্ন এলাকা/থানা থেকে মেয়েরা সেখানে জয়েন করেন।।



তো আমার।প্রশ্ন হচ্ছে এরকম ভাবে আয়োজন করে ,দ্বীনি আলোচনার জন্য মেয়েদের কতটুকু উৎসাহিত করেছে ইসলাম? নাকি তারা নির্দিষ্ট গন্ডিতে থেকে তাদের সাধ্যমত দ্বীন প্রচার করবে?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। ইসলামে নারীদের দ্বীনি শিক্ষা অর্জন এবং অপর নারীদের মাঝে দ্বীন প্রচারের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে এর জন্য নির্ধারিত কিছু শর্ত ও সীমারেখা রয়েছে, যা শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত। আপনার প্রশ্নের উত্তর নিম্নে তুলে ধরা হলো:

ইসলামে নারীদের দ্বীনি শিক্ষা ও প্রচারের গুরুত্ব

ইসলাম নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের উপর দ্বীনি জ্ঞান অর্জনকে ফরজ করেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।" (ইবনে মাজাহ: ২২৪)

নারীদের জন্য দ্বীনি শিক্ষা অর্জন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অপর নারীদের মাঝে তা প্রচার করাও একটি মহান দায়িত্ব। ইতিহাসে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) সহ অসংখ্য সাহাবিয়া ও তাবেয়ী নারীদের দ্বীনি প্রচারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। তবে এই প্রচার ও শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় ইসলাম কিছু শর্ত আরোপ করেছে।

নারীদের মিলনায়তন ও দ্বীনি আলোচনার বিধান

আপনি যে ধরনের মিলনায়তনের কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে শুধুমাত্র মহিলারা অংশগ্রহণ করেন এবং কোনো পুরুষের প্রবেশ নেই, সেখানে দ্বীনি আলোচনা, জ্ঞান বিনিময় এবং পরস্পরকে উপদেশ দেওয়া ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে নীতিগতভাবে বৈধ ও উৎসাহিত। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ "আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কাজের আদেশ করে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে।" (সূরা আত-তাওবাহ: ৭১)

এই আয়াতের আলোকে নারীদের জন্য অপর নারীদের মাঝে দ্বীনি আলোচনা করা একটি প্রশংসনীয় কাজ। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত মেনে চলা আবশ্যক:

১. পর্দার সম্পূর্ণ বিধান পালন: মিলনায়তনে অংশগ্রহণকারী সকল নারীকে (আলেমা ও সাধারণ) শরয়ী পর্দা মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ, শরীরের এমন অংশ প্রকাশ করা যাবে না যা অপর নারীদের সামনেও ঢেকে রাখা ফরজ (নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত)। সাথে সাথে সৌন্দর্য প্রদর্শন ও অযথা সাজসজ্জা থেকে বিরত থাকতে হবে।

২. স্থান নিরাপদ ও গোপনীয়: মিলনায়তনের স্থানটি এমন হতে হবে যেখানে পুরুষদের প্রবেশের কোনো সম্ভাবনা নেই এবং বাইরের লোকজনের দৃষ্টি থেকে সুরক্ষিত। জানালা-দরজা এমনভাবে বন্ধ রাখতে হবে যেন বাইরের কেউ ভেতর দেখতে না পারে।

৩. আলোচনার বিষয়বস্তু শরিয়তসম্মত: আলোচনা যেন সম্পূর্ণ দ্বীনি বিষয়ক হয় এবং তাতে কোনো গুনাহের কাজ বা অশ্লীলতার মিশ্রণ না থাকে।

৪. কণ্ঠস্বরের পর্দা: ইসলামি নির্দেশনা অনুযায়ী নারীদের কণ্ঠস্বরও পর্দার অন্তর্ভুক্ত। তাই আলোচনা বা বক্তব্য প্রদানের সময় কণ্ঠস্বর যেন স্বাভাবিক থাকে এবং এমনভাবে উচ্চস্বরে না হয় যাতে বাইরের পুরুষেরা শুনতে পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ "তোমরা এমন নরম কণ্ঠে কথা বলো না, যাতে যাদের অন্তরে রোগ আছে তারা কুপ্রবৃত্তি পোষণ করে।" (সূরা আল-আহযাব: ৩২)

স্টল ও প্রদর্শনীর বিধান

আপনি দ্বিতীয় যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন—যেখানে নারীদের জন্য বিভিন্ন স্টল দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে এবং ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই নারী—তা যদি উপরোক্ত শর্তসমূহ (পুরুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, পর্দা রক্ষা, নিরাপদ স্থান) বজায় রেখে আয়োজন করা হয়, তবে তা জায়েয। এটি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সুযোগ এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে সহায়ক হতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, স্টলে বিক্রিত পণ্যসমূহ যেন সম্পূর্ণ হালাল ও শরিয়তসম্মত হয় এবং কোনো প্রকার প্রতারণা বা অশ্লীলতা না থাকে।

ইসলামের নির্দেশনা: নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থাকা

ইসলাম নারীদের জন্য নির্দিষ্ট গণ্ডির (পর্দা ও শালীনতা) মধ্যে থেকে দ্বীন প্রচারের নির্দেশ দিয়েছে। নারীদের জন্য ঘর থেকে বের হওয়া এবং জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ فَإِذَا خَرَجَتْ مِنْ بَيْتِهَا اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ "নারী সম্পূর্ণ পর্দার বিষয়। যখন সে ঘর থেকে বের হয়, তখন শয়তান তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে (তাকে ফিতনায় ফেলার চেষ্টা করে)।" (তিরমিজি: ১১৭৩)

তবে এর অর্থ এই নয় যে, নারীরা ঘর থেকে সম্পূর্ণ বের হবেন না। বরং প্রয়োজনে এবং শরয়ী শর্ত মেনে বের হওয়া জায়েয। ফিকহের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে, নারীদের জন্য দ্বীনি শিক্ষা অর্জন ও শিক্ষাদানের প্রয়োজনীয়তা থাকলে তা পর্দার শর্ত সাপেক্ষে বৈধ। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সহ অনেক ইমাম নারীদের দ্বীনি শিক্ষার জন্য মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে।

সারসংক্ষেপ ও ফতোয়া

আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো—ইসলাম নারীদের দ্বীনি আলোচনা ও প্রচারের জন্য উৎসাহিত করেছে, তবে তা সম্পূর্ণ পর্দা ও শালীনতার গণ্ডির মধ্যে থেকে। নারীদের জন্য শুধুমাত্র নারীদের নিয়ে দ্বীনি মিলনায়তন আয়োজন করা, যেখানে কোনো পুরুষের প্রবেশ নেই এবং সকল শরয়ী শর্ত পালন করা হয়, তা জায়েয ও সওয়াবের কাজ। এটি নারীদের দ্বীনি জ্ঞান বৃদ্ধি এবং ইসলাম প্রচারের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।

তবে যদি এই মিলনায়তনে শরয়ী পর্দার লঙ্ঘন ঘটে, অথবা কোনো প্রকার ফিতনার আশঙ্কা থাকে, অথবা স্থানটি নিরাপদ না হয়, তাহলে তা অনুমোদিত নয়। কেননা ইসলামের মূল লক্ষ্যই হলো ফিতনা ও অশ্লীলতা প্রতিরোধ করা।

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর তাফসিরে 'মাআরিফুল কুরআন'-এ উল্লেখ করেছেন যে, নারীদের জন্য দ্বীনি শিক্ষা অর্জন ও শিক্ষাদান ফরজে কেফায়া পর্যায়ের। তবে এর জন্য পর্দা ও শালীনতার পূর্ণ বিধান পালন করা অপরিহার্য। মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম)-ও নারীদের জন্য ঘরে অবস্থান করে বা নারীদের পৃথক পরিবেশে দ্বীনি কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন এবং বাইরের কাজ পুরুষদের উপর ছেড়ে দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

আল-হিদায়ারদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে, নারীদের জন্য মসজিদে যাওয়া বা দ্বীনি মজলিসে অংশগ্রহণ জায়েয, যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে এবং তারা সাজসজ্জা ও সুগন্ধি ব্যবহার না করে বের হয়।

সর্বশেষ পরামর্শ

আপনার বর্ণিত আয়োজনগুলো যদি উপরোক্ত শর্তসমূহ (শুধুমাত্র নারী, পর্দা রক্ষা, নিরাপদ স্থান, শরিয়তসম্মত বিষয়বস্তু) মেনে চলে, তবে তা ইসলামসম্মত এবং দ্বীন প্রচারের একটি উত্তম মাধ্যম। তবে আয়োজকদের উচিত এই শর্তগুলো কঠোরভাবে পালন করা এবং অংশগ্রহণকারীদেরও উচিত এই শর্তগুলো মেনে চলা। যদি কোনো কারণে এই শর্তগুলো লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং এমন আয়োজন থেকে বিরত থাকাই উত্তম।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীন বুঝার এবং সঠিক পদ্ধতিতে দ্বীন প্রচারের তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.