Health insurance in abroad /স্বাস্থ্য বীমা
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
Health Insurance in Secular Countries – Islamic Ruling (Hanafi Fiqh)
উত্তর
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। অনেক মুসলিম শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী পশ্চিমা দেশগুলোতে যাওয়ার সময় এই দ্বিধার সম্মুখীন হন। নিচে আমরা কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করছি।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
সেক্যুলার দেশে প্রবেশের পূর্বে ও পরবর্তীতে বাধ্যতামূলক হেলথ ইন্সুরেন্সে অংশগ্রহণ করা, যদি তা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হয় এবং বিকল্প না থাকে, তবে তা জোরপূর্বক (ইকরাহ) হওয়ার কারণে সুদের গুনাহের আওতায় পড়বে না। তবে ঐচ্ছিক (ভলান্টারি) প্রাইভেট হেলথ ইন্সুরেন্স থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ তা সুদভিত্তিক লেনদেনের অন্তর্ভুক্ত।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ
১. ইন্সুরেন্সের ফিকহি অবস্থান
হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহে বাণিজ্যিক ইন্সুরেন্স (Commercial Insurance) সুদভিত্তিক ও ঘরার (অনিশ্চয়তা) কারণে অবৈধ (হারাম) বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।
قال الإمام ابن عابدين: التأمين التجاري لا يجوز لأنه من باب الغرر والربا ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: বাণিজ্যিক ইন্সুরেন্স জায়েয নয়, কারণ এটি ঘরার (অনিশ্চয়তা) এবং রিবার (সুদের) অন্তর্ভুক্ত। (রদ্দুল মুহতার, ৫ম খণ্ড, ৩০৪ পৃষ্ঠা)
২. বাধ্যতামূলক (কমপালসারি) ইন্সুরেন্সের বিধান
যখন কোনো দেশের আইন অনুযায়ী হেলথ ইন্সুরেন্স বাধ্যতামূলক হয় এবং তা ছাড়া ভিসা, রেসিডেন্সি পারমিট বা চাকরি পাওয়া সম্ভব হয় না, তখন সেটি ইকরাহ (জবরদস্তি) এর পর্যায়ে পড়ে।
ক. ইকরাহ-এর ফিকহি নীতি
ইসলামী ফিকহের একটি স্বীকৃত নীতি হলো:
الضرورات تبيح المحظورات “বাধ্যবাধকতা নিষিদ্ধ বিষয়কে অনুমোদন করে।” (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম, ১ম খণ্ড, ৮৫ পৃষ্ঠা)
قال الله تعالى: ﴿وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ﴾ আল্লাহ তাআলা বলেন: “তিনি তোমাদের জন্য যা হারাম করেছেন তা বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, তবে সে সমস্ত ছাড়া যা গ্রহণ করতে তোমরা বাধ্য হও।” (সূরা আল-আনআম: ১১৯)
খ. হানাফি ফিকহে ইকরাহ-এর শর্ত
ইকরাহ (জবরদস্তি) দ্বারা হারাম জিনিস হালাল না হলেও, গুনাহ মাফ হয়ে যায়। ইমাম সারাখসী (রহ.) বলেন:
الإكراه الملجئ يرفع الإثم عن المكره “পূর্ণ জবরদস্তি (ইকরাহ-ই-মুলজি) বাধ্য ব্যক্তির থেকে গুনাহ দূর করে দেয়।” (আল-মাবসুত, ২৪তম খণ্ড, ৪৫ পৃষ্ঠা)
যদি ইন্সুরেন্স না করলে আপনি দেশে প্রবেশ করতে পারবেন না, পড়াশোনা করতে পারবেন না, বা চাকরি হারাবেন—তাহলে এটি ইকরাহ-ই-মুলজি (পূর্ণ জবরদস্তি) হিসেবে গণ্য হবে।
৩. পাবলিক (সরকারি) হেলথ ইন্সুরেন্স
অনেক দেশে (যেমন: যুক্তরাজ্যের NHS, কানাডার Medicare, জার্মানির GKV) পাবলিক হেলথ ইন্সুরেন্স বাধ্যতামূলক এবং এটি ট্যাক্স বা বাধ্যতামূলক চাঁদার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
- এটি মূলত একটি কর (ট্যাক্স) ব্যবস্থা, যা সরকার জনগণের চিকিৎসার জন্য আদায় করে।
- এখানে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হয় না, বরং রাষ্ট্রীয় আইনের অধীনে পড়ে।
- হানাফি ফিকহে রাষ্ট্রীয় কর আদায়কে বৈধ গণ্য করা হয়েছে, যদিও করের অর্থ অন্য কোনো কাজে ব্যবহৃত হয়।
قال الإمام أبو يوسف: ما أخذته السلطة الجائرة من المكوس لا يضمنه الرعية إذا لم يكن لهم سبيل إلى دفعه ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন: জালিম শাসক যদি জনগণের কাছ থেকে কর আদায় করে, তবে জনগণ এর জন্য দায়ী হবে না, যদি তাদের তা প্রতিরোধের কোনো উপায় না থাকে। (আল-খারাজ, ১ম খণ্ড, ৭৫ পৃষ্ঠা)
৪. প্রাইভেট (বেসরকারি) হেলথ ইন্সুরেন্স
ক. বাধ্যতামূলক প্রাইভেট ইন্সুরেন্স
কিছু দেশে (যেমন: যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড) প্রাইভেট হেলথ ইন্সুরেন্সও বাধ্যতামূলক। সেক্ষেত্রে:
- যদি আইনত বাধ্যতামূলক হয় এবং বিকল্প না থাকে, তবে ইকরাহ এর কারণে গুনাহ হবে না।
- তবে মনে রাখতে হবে, ইকরাহ হারামকে হালাল করে না, বরং গুনাহ মাফ করে। তাই চেষ্টা করা উচিত যাতে এই অর্থ থেকে কোনো সুদ না নেওয়া হয় বা অন্যায়ভাবে লাভ না করা হয়।
খ. ঐচ্ছিক প্রাইভেট ইন্সুরেন্স
যদি প্রাইভেট ইন্সুরেন্স ঐচ্ছিক হয় (যেমন: অতিরিক্ত কভারেজের জন্য), তবে তা থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ:
- এতে সুদ (রিবা) রয়েছে—ইন্সুরেন্স কোম্পানি প্রিমিয়ামের অর্থ বিনিয়োগ করে সুদভিত্তিক লেনদেন করে।
- এতে ঘরার (অনিশ্চয়তা) রয়েছে—কখন কী হবে তা অনিশ্চিত।
- এটি জুয়া (মাইসির) এর মতো—এক পক্ষ লাভ করে, অন্য পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
قال رسول الله ﷺ: «لعن الله آكل الربا وموكله وكاتبه وشاهديه» রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন: “আল্লাহ লানত করেছেন সুদখোরকে, সুদদাতাকে, সুদের লেখককে এবং তার দুই সাক্ষীকে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৫৯৮)
৫. জেনে শুনে সেক্যুলার দেশে যাওয়ার প্রসঙ্গ
প্রশ্নকারী বলেছেন, “যেহেতু জেনে শুনেই ঐসব দেশে যাওয়া হয়”—এ প্রসঙ্গে বলব:
- দেশে যাওয়া নিজেই হারাম নয়। ইসলাম বিদেশে পড়াশোনা বা বৈধ উপার্জনের জন্য যাওয়ার অনুমতি দেয়, যদি দ্বীন রক্ষা করা সম্ভব হয়।
- জ্ঞাতসারে হারামে লিপ্ত হওয়ার ইচ্ছা থাকলে তা গুনাহ, কিন্তু যদি উদ্দেশ্য থাকে পড়াশোনা বা হালাল উপার্জন, এবং ইন্সুরেন্স শুধুমাত্র আইনগত বাধ্যবাধকতা হিসেবে করে, তবে তা ইকরাহ এর আওতায় পড়বে।
- তবে নিয়ত (ইন্তেনশন) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি নিয়ত থাকে যে, “আমি শুধু আইন মানতে বাধ্য বলেই করছি, স্বেচ্ছায় নয়”—তাহলে ইনশাআল্লাহ গুনাহ হবে না।
قال رسول الله ﷺ: «إنما الأعمال بالنيات وإنما لكل امرئ ما نوى» রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন: “নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়ত করে তা-ই পাবে।” (সহিহ বুখারী, হাদিস নং: ১)
৬. ফাতাওয়া ও আধুনিক আলেমদের মতামত
ক. মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর মত
مفتی محمد شفیع صاحب نے فرمایا: مجبوری کی صورت میں حکومتی انشورنس میں شرکت کی گنجائش ہے، بشرطیکہ یہ لازمی ہو اور اس سے بچنے کی کوئی صورت نہ ہو۔ মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন: বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে সরকারি ইন্সুরেন্সে অংশগ্রহণের অনুমতি আছে, শর্ত হলো এটি বাধ্যতামূলক হতে হবে এবং তা এড়ানোর কোনো উপায় না থাকতে হবে। (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২য় খণ্ড, ৪১২ পৃষ্ঠা)
খ. মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম)-এর মত
مفتی تقی عثمانی صاحب نے فرمایا: جہاں قانوناً ہیلتھ انشورنس لازمی ہو اور اس کے بغیر ویزا یا رہائش ممکن نہ ہو، وہاں اسے اکراہ کی بنیاد پر جائز قرار دیا جا سکتا ہے، لیکن اختیاری انشورنس سے اجتناب کریں۔ মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন: যেখানে আইনত হেলথ ইন্সুরেন্স বাধ্যতামূলক এবং তা ছাড়া ভিসা বা রেসিডেন্সি সম্ভব নয়, সেখানে ইকরাহ-এর ভিত্তিতে তা জায়েয বলা যেতে পারে, তবে ঐচ্ছিক ইন্সুরেন্স থেকে বিরত থাকুন। (ফিকহুল বুয়ু, ২য় খণ্ড, ৩৮৫ পৃষ্ঠা)
গ. ফাতাওয়া উসমানি
فتاوی عثمانی میں ہے: مجبوری اور اضطرار کی حالت میں حکومتی انشورنس اسکیم میں شامل ہونا گناہ نہیں، کیونکہ یہ اکراہ کے زمرے میں آتا ہے۔ ফাতাওয়া উসমানিতে আছে: বাধ্যবাধকতা ও প্রয়োজনীয়তার অবস্থায় সরকারি ইন্সুরেন্স স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হওয়া গুনাহ নয়, কারণ এটি ইকরাহ-এর পর্যায়ে পড়ে। (ফাতাওয়া উসমানি, ১৭তম খণ্ড, ২৪৫ পৃষ্ঠা)
৭. ব্যবহারিক নির্দেশনা
১. পাবলিক হেলথ ইন্সুরেন্স (যা ট্যাক্সের মতো বাধ্যতামূলক) — এতে অংশগ্রহণ করা যাবে, গুনাহ নেই। ২. বাধ্যতামূলক প্রাইভেট ইন্সুরেন্স — যদি আইনত বাধ্যতামূলক হয় এবং বিকল্প না থাকে, তবে ইকরাহ-এর কারণে গুনাহ হবে না, তবে অন্তরে এটাকে অপছন্দ করবেন। ৩. ঐচ্ছিক প্রাইভেট ইন্সুরেন্স — এটি এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে তাকাফুল (ইসলামিক ইন্সুরেন্স) খুঁজে দেখুন। ৪. নিয়ত সংশোধন করুন — মনে রাখবেন, আপনি স্বেচ্ছায় সুদভিত্তিক লেনদেন করছেন না, বরং আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে করছেন। ৫. দ্বীন রক্ষায় সচেষ্ট থাকুন — বিদেশে গিয়ে নামাজ, রোজা ও অন্যান্য বিধান পালনে যত্নবান হোন।
উপসংহার
সেক্যুলার দেশে পড়াশোনা বা উপার্জনের জন্য বাধ্যতামূলক হেলথ ইন্সুরেন্সে অংশগ্রহণ করা, যা আইনত বাধ্যতামূলক এবং যা এড়ানোর কোনো উপায় নেই, তা ইকরাহ (জবরদস্তি) হওয়ার কারণে সুদের গুনাহের আওতায় পড়বে না। তবে ঐচ্ছিক ইন্সুরেন্স থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জনের তাওফিক দিন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب আল্লাহই সর্বাধিক সঠিক জানেন।