মোবাইলে গেমস খেলা কি গুনাহ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
মোবাইলে গেমস খেলা কি গুনাহ?
ভূমিকা
মোবাইলে গেমস খেলা সম্পর্কে ইসলামী বিধান জানার আগে আমাদের বুঝতে হবে যে, গেমস খেলা নিজেই হারাম নয়, বরং এর সাথে জড়িত কিছু বিষয়ের কারণে তা হারাম বা গুনাহ হতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিটি কাজের বিধান নির্ভর করে তার উদ্দেশ্য, প্রকৃতি এবং ফলাফলের উপর।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
وَذَرِ الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَهُمْ لَعِبًا وَلَهْوًا "আর আপনি তাদেরকে ছেড়ে দিন যারা নিজেদের দ্বীনকে খেল-তামাশা ও ক্রীড়া-কৌতুকরূপে গ্রহণ করেছে।" (সূরা আল-আনআম: ৭০)
এই আয়াতে খেল-তামাশাকে নিন্দা করা হয়েছে যখন তা দ্বীনকে উপহাসের মাধ্যম হয়। তবে সাধারণ খেলাধুলা নিষিদ্ধ নয়।
হাদীসের নির্দেশনা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
كُلُّ شَيْءٍ يَلْهُو بِهِ الرَّجُلُ بَاطِلٌ إِلَّا رَمْيَهُ بِقَوْسِهِ وَتَأْدِيبَهُ فَرَسَهُ وَمُلَاعَبَتَهُ أَهْلَهُ "মানুষ যে সকল খেলায় লিপ্ত হয় তা বাতিল (নিষ্ফল), তবে তিনটি বিষয় ব্যতীত—তীর নিক্ষেপ, ঘোড়া প্রশিক্ষণ এবং স্ত্রীর সাথে ক্রীড়া।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২৫১৩; সুনানে নাসাঈ)
মোবাইল গেমসের বিধান সম্পর্কে হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
সাধারণ নীতি
হানাফী মাযহাবের ফিকহের মূলনীতি হলো—যে খেলায় কোনো শরয়ী নিষেধাজ্ঞা নেই এবং যা সময় নষ্ট ও ফরজ ইবাদত থেকে গাফেল হওয়ার কারণ না হয়, তা জায়েয। কিন্তু নিম্নলিখিত শর্তগুলো থাকলে তা হারাম বা মাকরূহ হবে:
১. সময় নষ্ট করা
যদি গেমস খেলায় অতিরিক্ত সময় নষ্ট হয় এবং ফরজ নামাজ, জিকির ইত্যাদি থেকে বিরত রাখে, তবে তা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ "হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে।" (সূরা আল-মুনাফিকুন: ৯)
২. ছবি ও মূর্তি সংবলিত গেমস
যেসব গেমসে প্রাণী বা মানুষের ছবি থাকে এবং তা পর্দায় প্রদর্শিত হয়, সেগুলো সম্পর্কে হানাফী ফকীহগণ বলেন—যদি ছবিগুলো এমন হয় যা দেখে ফিতনার আশঙ্কা থাকে বা যা শির্কী বিশ্বাসের সাথে জড়িত, তবে তা হারাম। তবে সাধারণ খেলার ছবি যদি ফিতনার কারণ না হয়, তাহলে অনেক উলামা সেটাকে মাকরূহ বলেছেন।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)(রদ্দুল মুহতার)এ বলেন,:
"لَا يَحْرُمُ اللَّعِبُ بِالشِّطْرَنْجِ إِذَا خَلَا عَنِ الْقِمَارِ وَكَانَ لِتَدْرِيبِ الْحَرْبِ أَوْ لِتَفْرِيحِ النَّفْسِ" "দুই ব্যক্তির মধ্যে জুয়া না থাকলে এবং যুদ্ধের কৌশল শেখার বা মন বিনোদনের উদ্দেশ্যে দাবা খেলা হারাম নয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৫)
৩. জুয়া বা বাজি সংবলিত গেমস
যেসব মোবাইল গেমসে টাকা বা পয়সার বাজি থাকে, তা স্পষ্টতই হারাম। কারণ এটি জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ "হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী এবং ভাগ্য-নির্ধারক তীর—এসব ঘৃণিত শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা এসব থেকে বিরত থাক।" (সূরা আল-মায়িদা: ৯০)
৪. অশ্লীলতা ও গান-বাজনা সংবলিত গেমস
যেসব গেমসে অশ্লীল ছবি, গান-বাজনা বা নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক প্রদর্শন করা হয়, সেগুলো হারাম। কারণ এতে অশ্লীলতার প্রচার রয়েছে।
৫. শির্কী বিশ্বাস সংবলিত গেমস
যেসব গেমসে শির্ক, কুফর বা ভাগ্য-গণনার মতো বিষয় থাকে (যেমন—লটারি, ভাগ্য পরীক্ষা ইত্যাদি), সেগুলো হারাম।
হানাফী ফকীহগণের বক্তব্য
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.)
তিনি বলেন: "খেলাধুলা নিজেই হারাম নয়, কিন্তু যদি তা ফরজ ইবাদত থেকে বিরত রাখে, সময় নষ্ট করে এবং অলসতা সৃষ্টি করে, তাহলে তা মাকরূহ বা হারাম হয়ে যায়।"
মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম)
তিনি বলেন: "যেসব গেমসে কোনো শরয়ী নিষেধাজ্ঞা নেই, সেগুলো জায়েয। কিন্তু যদি গেমসে এমন কিছু থাকে যা শরীয়ত নিষিদ্ধ করেছে—যেমন জুয়া, অশ্লীলতা, শির্ক—তাহলে তা হারাম। আর যদি গেমস খেলায় নামাজ কাযা হয়, তবে তা গুনাহ।"
মোবাইল গেমসের বিশেষ বিবেচনা
মোবাইল গেমসের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিশেষ বিষয় লক্ষণীয়:
১. আসক্তি: মোবাইল গেমসে আসক্তি তৈরি হয় এবং মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করে। এটি নিঃসন্দেহে গুনাহ।
২. নামাজে গাফেলি: অনেক সময় গেমস খেলতে খেলতে নামাজের সময় পার হয়ে যায়। এটি বড় গুনাহ।
৩. পর্দা ও শব্দ: অনেক গেমসে অশ্লীল পোশাক ও গান থাকে যা দেখতে ও শুনতে হারাম।
৪. অর্থ অপচয়: অনেক গেমসে টাকা খরচ করতে হয় (ইন-অ্যাপ পারচেজ), যা অপচয়।
ফতোয়া
ফতোয়ায়ে উসমানী
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.)-এর ফতোয়ায় উল্লেখ আছে:
"খেলাধুলা যদি শরীর চর্চার জন্য হয় এবং তাতে শরয়ী কোনো নিষেধ না থাকে, তবে তা জায়েয। কিন্তু যদি তা অলসতা ও সময় নষ্টের কারণ হয়, তবে তা মাকরূহ।"
ইমদাদুল ফতোয়া
মুফতী কেফায়াতুল্লাহ (রহ.) বলেন:
"যে খেলায় কোনো শরয়ী নিষেধ নেই এবং যা ফরজ থেকে বিরত রাখে না, তা জায়েয। কিন্তু যে খেলায় হারাম জিনিস থাকে (যেমন—জুয়া, অশ্লীলতা), তা হারাম।"
সারসংক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত
মোবাইলে গেমস খেলা নিজে নিজে গুনাহ নয়, তবে নিম্নলিখিত শর্তগুলো থাকলে তা গুনাহ হবে:
১. গেমসে জুয়া বা বাজি থাকলে — হারাম ২. গেমসে অশ্লীল ছবি বা গান থাকলে — হারাম ৩. গেমসে শির্কী বিশ্বাস বা ভাগ্য-গণনা থাকলে — হারাম ৪. গেমস খেলায় নামাজ কাযা হলে — গুনাহ ৫. গেমসে অতিরিক্ত সময় নষ্ট হলে এবং আসক্তি তৈরি হলে — মাকরূহ/গুনাহ ৬. গেমসে অর্থ অপচয় হলে — গুনাহ
যদি এসব কিছু না থাকে এবং গেমসটি শুধুমাত্র মন বিনোদনের জন্য অল্প সময় খেলা হয়, তবে তা জায়েয। তবে মুমিনের উচিত সময়ের মূল্য দেওয়া এবং গেমসের পরিবর্তে উপকারী কাজে সময় ব্যয় করা।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ "আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।"