মজি যদি কাপড়ে লাগে, সেই কাপড় কি পাক? প্রস্রাবের পর পানি দিয়ে প
Taharah Purity · Hanafi
Question
১. মজি যদি কাপড়ে লাগে, সেই কাপড় কি পাক?
২. প্রস্রাবের পর পানি দিয়ে পরিষ্কারের সময় যদি ছিটা পড়ে হাতে, কিন্তু আমার যদি মনে হয় যে এতো পরিমাণ পানি গোপণাঙ্গে ঢেলেছি যে পানির ছিটা নাপাক হওয়ার কথা না, সেক্ষেত্রে কি পানির ছিটা পাক ধরে নিবো?
৩. প্রস্রাবের পর পানি ব্যবহারের সময় যদি মনে হয় যে পানি কমোডের পানিতে ছিটা পরে আবার উপরে শরীরে লেগেছে, কিন্তু আমি নিশ্চিত না হই ( কারণ আমি তো দেখতে পারছি না) যে আদৌ এটা সেই পানি কিনা, নাকি আমি যে পানি দিয়ে পরিষ্কার করছি সেই পানি, তখন আমার কি করা উচিত? আমি কি নিজেকে পাক ধরে নিবো? নাকি শরীরের যে জায়গায় ওই পানি লেগেছে তা হাতে নিয়ে দেখবো রং, গন্ধ ইত্যাদি আছে কিনা।
আর যদি ফোঁটা এমন ভাবে পড়ে যে খুব নিশ্চিত মনে হচ্ছে যে কমোডের পানির থেকে ছিটা এসে পড়েছে, কিন্তু দেখি নাই, তখন কি করবো?
৪. প্রস্রাবের পর পরিষ্কারের সময় পানি যদি হাতে লাগে, কিন্তু আমার মনে পড়ছে না যে এটি কি ছিটা পড়া নাপাক পানি, নাকি পরিষ্কার পানির ছিটা যা যথেষ্ট পরিমাণে ধোয়ার পর তারপর পড়েছে। তখন আমি কি এই পানি পাক বলে ধরে নিবো?
৫. নাপাক পানির ছিটা যদি শরীরের লাগে, কিন্তু চেক (check) করা হয়নি যে শরীরে লাগা পানি কি আসলে পাক ছিল কি নাপাক, তখন শরীর কি নাপাক বলে ধরে নিবো?
৬. মজি বের হলো কি প্রস্রাব, তা যদি নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় না থাকে, মানে প্যান্ট এ কোনো চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে না, আর লিঙ্গ দেখেও বোঝা যাচ্ছে না (গন্ধ পাওয়া তো সম্ভব না) , তখন কি নিজেকে পাক ধরে নিবো? প্যান্ট দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আর গন্ধ পাচ্ছি না, কারণ মজির গন্ধ তো সহজে মনে হয় পাওয়া যাবে না।
৭. চেয়ারের কুশন যদি লেদার অথবা কাপড়ের তৈরি হয়, তাতে নাপাকি লাগে আগে, কিন্তু বর্তমানে নাপাকীর গন্ধ নেই, আর চিহ্ন থাকলেও আদৌ কি নাপাকীর চিহ্ন কিনা বোঝা যাচ্ছে না, এক্ষেত্রে কি চেয়ার পাক থাকবে?
৮. নাপাকি প্রমাণের জন্য কি গন্ধ ও রং দুইটির লাগবে, নাকি যেকোনো একটি থাকলেই চলবে? যেমন শুধু গন্ধ থাকলেই নাপাকি প্রমাণিত হবে? অথবা শুধু রং/চিহ্ন থাকলেই নাপাক হবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্ন করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নগুলো পবিত্রতা ও নাপাকি সংক্রান্ত সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে। নিচে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে দেওয়া হলো।
১. মজি কাপড়ে লাগলে পবিত্রতার হুকুম: মজি (Madhi/Prostatic fluid) হলো নাজাাসাতে গলীযা বা ভারী নাপাকি । এটি কাপড়ে লাগলে ওই কাপড় নাপাক হয়ে যাবে। যদি নাপাকির পরিমাণ এক দিরহামের (হাতের তালুর গভীরতা বা ২.৫ সে.মি. ব্যাস) চেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ে, তবে ওই কাপড় পরিধান করে নামায আদায় করা জায়েয হবে না ।
- উৎস: নূরুল ঈযাহ: পৃষ্ঠা-৩৪ (ওজু ভঙ্গের কারণ অধ্যায়); ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা-৬৮ (নাজাসাতে গলীযা ও খফীফা পরিচ্ছেদ)।
২, ৩, ৪ ও ৫. প্রস্রাবের পর পানির ছিটা ও অহেতুক সন্দেহ (ওয়াসওয়াসা): শরীয়তের একটি মৌলিক মূলনীতি হলো— "নিশ্চিত বিষয় محض সন্দেহের কারণে বাতিল হয় না" (الشك لا يزيل اليقين)।
- ছিটা পড়ার হুকুম: প্রস্রাব করার পর পানি ব্যবহারের সময় যদি সামান্য পানির ছিটা শরীরে বা হাতে লাগে এবং আপনি নিশ্চিত না হন যে সেটি নাপাক পানি নাকি পবিত্র পানি, তবে তাকে পবিত্র হিসেবেই গণ্য করা হবে।
- কমোড বা ড্রেনের ছিটা: কমোডের পানির ছিটা শরীরে লেগেছে বলে যদি কেবল সন্দেহ হয় কিন্তু আপনি নিজ চোখে তা দেখেননি, তবে সেই সন্দেহকে গুরুত্ব দেওয়া যাবে না এবং নিজেকে পাক ধরতে হবে। বিশেষ করে পানি ঢেলে ধোয়ার সময় যে ছিটা পড়ে, তা 'উমূমে বালওয়া' (ব্যাপক সমস্যা) হিসেবে ক্ষমাযোগ্য ও পবিত্র গণ্য হয়। সুতরাং হাত দিয়ে রং বা গন্ধ চেক করার কোনো প্রয়োজন নেই।
- উৎস: কাওয়াইদুল ফিক্বহ (হাশিয়া সহ): পৃষ্ঠা-১১১; দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা-৭৬ (তহারত ও নাজাসাত দূরীকরণের মূলনীতি) ও পৃষ্ঠা-৮৬-৮৭।
৬. মজি নাকি প্রস্রাব—সন্দেহের হুকুম: যদি প্রস্রাব বা মজি বের হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত না হওয়া যায় এবং প্যান্ট বা শরীরে কোনো আলামত (ভিজা ভাব বা চিহ্ন) পাওয়া না যায়, তবে আপনার ওজু ভাঙবে না এবং আপনি সম্পূর্ণ পবিত্র থাকবেন। শরীয়তে অমূলক সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে কোনো হুকুম আরোপিত হয় না ।
- উৎস: ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা-৬৮; কাওয়াইদুল ফিক্বহ: পৃষ্ঠা-১১১।
৭. কুশন বা লেদারের চেয়ারে পুরাতন নাপাকির হুকুম: যদি চেয়ারের কুশনে আগে নাপাকি লেগে থাকে এবং বর্তমানে নাপাকির কোনো শারীরিক অস্তিত্ব (যেমন শুকিয়ে যাওয়া ময়লা) না থাকে এবং এর রং বা গন্ধও অনুভূত না হয়, তবে সাধারণ ব্যবহারের জন্য তাকে পাক ধরা যাবে। ফিকহী মূলনীতি হলো, নাপাকির মূল অস্তিত্ব (Ayn) দূর হয়ে গেলেই বস্তু পবিত্র হয়ে যায়।
- উৎস: দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা-৮৮-৮৯ (ড্রাইক্লিন ও পবিত্রতা); নূরুল ঈযাহ: পৃষ্ঠা-৫১ (নাজাসাত দূর করার পদ্ধতি)।
৮. নাপাকি প্রমাণের আলামত: নাপাকি প্রমাণের জন্য রং, স্বাদ ও গন্ধ—এই তিনটির যেকোনো একটি আলামত নিশ্চিতভাবে প্রকাশ পাওয়া যথেষ্ট।
- যদি নাপাকির মূল বস্তু ধোয়ার পর কেবল রং থেকে যায় যা দূর করা খুব কঠিন, তবে সেটি পবিত্র গণ্য হবে।
- আর যদি দুর্গন্ধ বা রং বিদ্যমান থাকে এবং তা নাপাকির কারণে হওয়া নিশ্চিত হয়, তবে সেখানে নাপাকি সাব্যস্ত হবে।
- তবে অহেতুক সন্দেহের ক্ষেত্রে নাপাকি সাব্যস্ত হয় না, যতক্ষণ না প্রবল ধারণা জন্মে।
- উৎস: ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা-১৮৬; দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা-৮৬; নূরুল ঈযাহ: পৃষ্ঠা-৫১।
আল্লাহ- ই ভালো জানেন।