একটি ছাত্রকে কেনাকাটার জন্য দেওয়া টাকা ও পরবর্তীতে সেই টাকা হারিয়ে যাওয়ার বিধান কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমি আমার এক ছাত্র কে কিছু টাকা দিয়েছিলাম আমার জন্য একটা জিনিস কিনে আনার জন্য।সে টাকা হারিয়ে ফেলার ভয়ে আমাকে বলেছিল টাকাটা আমি যেন আপাতত এখন আমার কাছে রাখি।সে টাকা পরে নিবে।আমি ভাবলাম টাকা হারাবে কেন ও তো ছোট না।ওর বয়স কিন্তু সম্ভবত ৩-৪ মাস পরে ১০ বছরে পড়বে।তো টাকা হারাবে না ভেবে আমি ওর থেকে টাকা আর নিইনি।কিন্তু ও সত্যি সত্যি টাকা হারিয়ে ফেলেছে।এখন ওর আম্মু আমার কাছে এসে দুঃখ প্রকাশ করে বলতেছে উনাদের ছেলে টাকা হারিয়ে ফেলেছে এজন্য উনারা এখন উনাদের কাছ সেই পরিমাণ টাকা আমার উক্ত টাকার ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে চাচ্ছে।এখন আমি কি উনাদের কাছ থেকে এই টাকা গ্রহণ করবো?যেহেতু উনাদের ছেলে টাকা হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে আমার কাছে টাকা রাখতে বলেছে এবং পরে নিবে জানিয়েছে।কিন্তু ভেবেছি ও যেহেতু বড় হয়েছে টাকা হারাবে না।এখন আমার কি তার বাবা মায়ের কাছ থেকে উক্ত টাকা গ্রহণ করা জায়েয হবে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
জবাবের শুরুতেই বলবো সে নাবালক ছাত্রকে কোন কিছু কিনতে দেওয়া আপনার জন্য উচিত হয়নি। আপনার যদি কোন কিছু ক্রয়ের প্রয়োজন হয়, সে ক্ষেত্রে নিজে ক্রয় করবেন অথবা বালেগ ছাত্রকে ক্রয় করতে দিতে পারেন।
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি হলো—আপনি ছাত্রকে যে টাকা দিয়েছিলেন জিনিস কেনার জন্য, তা ছিল আমানত (গচ্ছিত সম্পদ) হিসেবে তার কাছে। কিন্তু ছাত্রটি আপনার অনুমতি ছাড়াই টাকাটি আপনার কাছে রেখে দিয়েছিল এবং আপনি তা গ্রহণ করেননি। ফলে টাকাটি তার দায়িত্বেই ছিল। এখন সে টাকা হারিয়ে ফেলেছে—এতে সে দায়ী (দায়িত্বপ্রাপ্ত) হবে, কারণ সে নিজেই টাকাটি রাখার দায়িত্ব নিয়েছিল এবং আপনার কাছে তা জমা রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু আপনি তা গ্রহণ করেননি।
হানাফি ফিকহের নিয়ম:
১. আমানতদারের দায়িত্ব: যে ব্যক্তি আমানত গ্রহণ করে, সে যদি তা হারায় বা নষ্ট করে, তবে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না, যদি সে অবহেলা না করে থাকে। কিন্তু এখানে ছাত্রটি আমানত গ্রহণ করেনি, বরং সে নিজেই টাকাটি রাখার দায়িত্বে ছিল। তাই টাকা হারানো তার অবহেলার কারণে ঘটেছে, ফলে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
(সূত্র: আল-হিদায়াহ, রদ্দুল মুহতার - كتاب الوديعة)
২. ক্ষতিপূরণ গ্রহণ: যেহেতু ছাত্রটি টাকা হারিয়েছে এবং সে এখন নাবালক (১০ বছরের কম), তাই তার পিতামাতা বা অভিভাবক তার পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দিতে পারেন। আপনি তার পিতামাতার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে পারেন, কারণ এটি আপনার প্রাপ্য। তবে যদি তারা স্বেচ্ছায় দিতে চায়, তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েয।
৩. আপনার দায়িত্ব: আপনি টাকাটি গ্রহণ না করে ছাত্রের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু আপনি তাকে টাকাটি নিজে রাখতে বলেননি। বরং সে নিজেই আপনার কাছে রাখতে চেয়েছিল, কিন্তু আপনি তা গ্রহণ করেননি। তাই টাকা হারানোর দায়িত্ব আপনার উপর নয়, বরং ছাত্রের উপর।
সিদ্ধান্ত:
আপনি তার পিতামাতার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে টাকা গ্রহণ করতে পারেন। এটি জায়েয এবং বৈধ। তবে মনে রাখবেন, যদি ছাত্রটি সত্যিই অসহায় হয় এবং তার পিতামাতার পক্ষে টাকা দেওয়া কষ্টকর হয়, তবে আপনি ক্ষমা করে দিলে তা সওয়াবের কাজ হবে। কিন্তু আইনত আপনি তা গ্রহণে সম্পূর্ণ অধিকারী।
দলিল:
- কুরআন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমানত তার প্রাপককে ফিরিয়ে দিতে আদেশ করেন।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
- হাদিস: "আমানতদারের উপর আমানত নষ্ট হলে ক্ষতিপূরণ নেই, কিন্তু যদি সে অবহেলা করে, তবে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৬১)
উপসংহার:
আপনি তার পিতামাতার কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করতে পারেন, কারণ এটি আপনার প্রাপ্য। তবে উত্তম হলো যদি তারা অস্বচ্ছল হয়, তবে আপনি তাদের ছাড় দিতে পারেন বা ক্ষমা করে দিতে পারেন, যা আপনার জন্য অধিক সওয়াবের কারণ হবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।